
শেষ আপডেট: 2 April 2020 17:54
বড় বয়সে রোদ পোহানোর ইংরেজি যে ‘ট্যান’ এবং সেটা খুব স্বাস্থ্যসম্মত একটা ব্যাপার, এই সেদিন পর্যন্ত আমরা জানতামই না। বরং স্কুল-বয়সে, বহু ডন-বৈঠক দেবার পরেও চেহারা যখন খুলল না, বিল্টু আক্ষেপ করে বলেছিল, এর জন্য দায়ী আমার ঠাকুমা। দু’মাস বয়সে ন্যাংটো করে তেল মাখিয়ে উঠোনে ফেলে রাখত। শালা তখনই আচার হয়ে গেছি, জীবনে ফুলব না...।’
সাহেবদের দেখাদেখি কিছু করতে যাবার বিপদও কম নয়। কে যেন বলেছিল, সাহেবরা রিটায়ারের সময় যথেষ্ট ইয়ং থাকে। এবং অবসরের পর অ্যাডভেঞ্চারেও যায়।
আমাদের পাল সাহেবের সাধ হল তিনিও তাই করবেন। রিটায়ারমেন্টের মাসখানেক আগে ইয়ং হবার অভিলাষে মে মাসের সারাটা দুপুর অফিসের ছাদে পায়চারি করে ‘ট্যানড’ হলেন। ফল, সন্ধের মুখে বেদম গ্যাস।
সাহেবরা যা করে করুক, বাঙালিদের স্বাস্থ্যবিধি নিজের বুদ্ধি-নির্ভর। তিনু পিসির তিনতলার ভাড়াটে মধুদা ইংরেজির বিখ্যাত প্রাইভেট টিউটর। সেক্সপিয়র নাকি মুখস্থ। তবু তা একটানা বলে যেতে পারেন না, মাঝেমাঝেই চোঁয়া ঢেকুর ডিস্টার্ব করে। তার চা ও বিড়ি বাহিত জীবন, মাসকাবারিতে গ্যাসের ট্যাবলেট কেনেন। এবং রোগা শরীর হলে কী হবে, বাঘের গর্জনের মতো চোঁয়া ঢেকুর বের হয়।
সেদিন চায়ের দোকানে দেখি ভাঁড়ভর্তি চা নিয়ে এক কাস্টমারের হাত থরথর করে কাঁপছে। ঠিক সেই মুহূর্তে পাশ থেকে মধুদার গর্জনের মতো ঢেকুর ধেয়ে এল। ব্যাস, চা চলকে হাতে। এবং হাত থেকে ভাঁড় মাটিতে। ভাবছিলাম মারকাটারি ঝগড়া শুরু হল বলে! কিন্তু ভদ্রলোক কিছুই করলেন না। কেবল পাশ ফিরে কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘ওঃ আপনি... আমি ভাবলাম গোরু...।’
মধুদা হিংসে করতেন মিত্রবাবুকে। হাইসুগারের নির্বিরোধী মিত্রবাবু রাজ্য সরকারের করণিক। অফিস-ফেরত বাস থেকে নেমে পাড়ার মোড়ে গোপনে দুটো জিলিপি ডেলি মেরে নেন। তারপর দু’পা এগিয়ে চানাচুরের গুমটি থেকে একমুঠো ডালমুট কিনে চিবোতে চিবোতে বাড়ি ফেরেন।
মধুদার তো হিংসে হবেই। জিলিপির পর ডালমুট, অথচ একটাও চোঁয়া ঢেকুর নেই। কী স্ট্রং লিভার!
থাকতে না পেরে মিত্রবাবুর রাস্তা আটকে মধুদা জিজ্ঞেস করে বসলেন একদিন, ‘জিলিপির পর চানাচুর, অথচ কোনও প্রবলেম নেই। আপনার এই অপার যৌবনের রহস্যটা কী?’
থতমত খেয়ে খানিক চুপ মেরে গেলেন নির্বিরোধী মিত্রবাবু। তারপর একটা বিড়ি নিজে নিয়ে আর একটা মধুদাকে দিয়ে বললেন, এটা একটা সুদূরপ্রসারী চিন্তা...।’
‘মানে?’
মিত্রবাবু বললেন, ‘দেখুন... ডাল পিষে হয় জিলিপি। সেটা খেয়ে নিলাম। তারপর ডালমুট খেয়ে বাটা ডালকে ফের গোটা ডালে রিফর্ম করিয়ে নিচ্ছি। একটা বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা...।’
মধুদা কিছুক্ষণ হাঁ হয়ে থেকে বললেন, ‘কিন্তু... জিলিপি তো হয় বিউলির ডালে আর ডালমুট ছোলার ডালের...।’
কথাটা ফুৎকারে উড়িয়ে মিত্রবাবু জবাব দিলেন, ‘অত জাতপাত দেখলে চলে না মশাই, ডাল ইস ডাল...।’
মধুদার ঠিক নিচের তলার ভাড়াটে রাখহরি ভৌমিক। তিনি প্রমোশন পেয়ে করণিক হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কঠিন অ্যাপ্লিকেশন লিখতে এখনও অন্যের দ্বারস্থ হতে হয়। সেদিন সাতসকালে ভৌমিকবাবু পৌঁছে গেলেন মধুদার কাছে। বললেন, ‘একখানা ওয়ান ডে লিভ-এর অ্যাপ্লিকেশন লিখে দেন স্যার। কারুর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিই। আমাদের বড়বাবু ভীষণ রাগী মানুষ তো, ঠিক ঠিক কারণ না লিখলে খচে যায়...।’
মধুদা কাগজ-পেন টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কারণ কী লিখব?’
রাখহরি ভৌমিক খানিক মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বললেন, ‘কারণ... এই গা ম্যাজম্যাজ...।’
মধুদা থম মেরে গেলেন।
ভৌমিকবাবু কুণ্ঠিত হয়ে বললেন, ‘আপনাকে বিরক্ত করার ইচ্ছে ছিল না স্যার। পুরনো অ্যাপ্লিকেশনগুলো দেখে কাজ চালিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু ওই গা ম্যাজম্যাজের ইংরেজি ঠিক জানি না স্যার।’
মধুদা গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আমিও সেটাই ভাবছি। দুপুরবেলা ঘুমোলে বিকেলে গ্যাস-অম্বল হয়ে গা ম্যাজম্যাজ করে। সেটা হলে না হয় ‘ইল’ বা ‘সিকনেস’ লিখে দেওয়া যেত। কিন্তু এই সকাল ন’টায়...।’
ভৌমিকবাবু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘কোনও কঠিন অসুখ হল বলছেন?’
মধুদা আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘রোগটা কঠিন নয়, ইংরেজিটা শক্ত। চালু রোগ তো... চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই হয়। ওই... যখন ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে, স্কুলে-টুলে গেছে... সেক্সটা আছে অথচ নেই... নাঃ, ইংরেজিটা সত্যিই কঠিন।’
চিত্রকর: রাজ রায়
আরও বারোয়ারি নকশা... বিজ্ঞাপন লাইভ
আরও বারোয়ারি নকশা... সিনিয়র সিটিজেন
আরও বারোয়ারি নকশা... প্রেমপত্র