
শেষ আপডেট: 31 March 2020 10:53
এখন আর নেই যদিও, তবে একসময় ছিল-- বাঙালিজীবনে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রেমপত্র। প্রেম হয়েছে, অথচ প্রেমের চিঠি দেওয়া-নেওয়া হয়নি, এ ছিল অসম্ভব, অবাস্তব একটি ঘটনা।
স্বাধীনতার আগে, সেই বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ সালের একটা চিঠি দেখেছিলাম। দূর প্রবাস থেকে পিত্রালয়ে অবস্থানরত সদ্যলভিত স্ত্রীকে দেওয়া দেড় পাতার চিঠি। সাধু ও চলিতের মিশ্রণে একাকার। তাতে একটা লাইন, ‘আমি ডিম, তুমি আমার কুসুম। আমি বিদীর্ণ হইলে কেবল তুমি-ই তুমি।’ সে চিঠি পোস্টম্যানের কর্তব্যহীনতায় গিয়ে পড়ল বউয়ের বাপের হাতে। তিনি আদ্যোপান্ত পড়ে মেয়েকে চিঠিটি হ্যান্ডওভার করার সময় বলেছিলেন, ‘ডিম ফেটে বাচ্চা হয়, নয়তো অমলেট। শুধু খোলের আর কী দাম!’
ট্রেনের বাথরুমে, কলেজের দেওয়ালে, এমনকি মন্দিরের কাছাকাছি গাছ ও পাথরে ‘অমুক প্লাস অমুক’ দেখে দেখে চোখ অভ্যস্ত। সেদিন এক মদের দোকানে দেওয়ালে দেখলাম কোনও নিখাদ মদ্যপ্রেমী লিখে রেখেছে, ‘হুইস্কি প্লাস আমি, মাইনাস বউ।’
মদের প্রতি এত গভীর প্রেম নিবেদন আগে দেখিনি।
তবে পাথরে লেখা প্রেমপত্র দুটো দেখেছি। আমাদের শহরের পিকনিক স্পটে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া নদীর ধারে বড় বড় বোল্ডার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারই গায়ে, কোনও এক ডাকসাইটে সুন্দরী, যার বহু পাণিপ্রার্থী, তাকে লক্ষ্য করে জনৈক প্রেমিক-কবি লিখেছে, ‘আমি পাগল হয়েছি তোমার প্রেমে/ কেবল আটকে গিয়েছি ট্র্যাফিক জ্যামে।’
দ্বিতীয় পাথরের প্রেমপত্রটি দেখেছিলাম রেল কোয়ার্টার্সে। গ্যাংম্যান ভিখু ইয়া মোটা একটা শিল কিনে এনে ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে নিজেই সেটা কুটতে বসল। যখন কোটা শেষ হল দেখি লেখা হয়েছে, ‘কমলি মেরি বাঁহো মে।’
কিছুদিন আগে পর্যন্ত একটা জীবিকা ছিল মানি অর্ডারের ফর্ম ভরে দেওয়া। পোস্ট অফিসের সামনে তারা বসতেন। সেরকমই একজন ফর্ম লিখে দেবার পর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু লিখে দিতে হবে?’
কাস্টমার খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। লিখুন--।’
তারপর প্রায় মিনিট পাঁচ ধরে সে যা বলে গেল তার গোটাটাই প্রেম, মান এবং অভিমান। এবং লিখতে গেলে মিনিমাম দুটো ফুলস্কেপ পাতা লাগবে। লিখিয়ে ভদ্রলোক পুরোটা শুনে অসম্ভব দক্ষতায় মাত্র পাঁচ লাইনে সেটি লিখে দিলেন। প্রেমেরও যে সামারি হয়, এই মূল্যবান শিক্ষাটা সেদিন পেয়েছিলাম।
একটা নতুন ক্যাটাগরির প্রেম বছর পঁচিশ-তিরিশ হল চালু হয়েছে-- অফিস প্রেম। এর গভীরতা কম, দায়দায়িত্ব নেই বললেই হয়। নব্বইয়ের দশকে বিল্টু যে অফিসে কাজ করত সেটা চারতলা। প্রতি ফ্লোরে তার এক পিস করে প্রেমিকা। গভীরতা কম, তাই চিঠি নয়, চিরকুট চালাচালি বেশি হত।
বললাম, ‘এত সামলাস কী করে?’
বিল্টু জবাব দিল, ‘এ তো খুব সহজ। চিরকুটে কখনও ভালবাসার ডায়লগ লিখি না। মেয়েটার পাশের টেবলে যে আছে এবং মেয়েটার যে বস, স্রেফ এই দু’জনকে গালাগাল দিলেই প্রেম জমে ক্ষীর।’
ভদ্র এবং সেফ প্রেমিকরা প্রেমপত্র ফেরতও দেয়। প্রেমিকার বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পর পল্টু প্রায় দেড়শোখানা চিঠি কালো সুতোয় বেঁধে ফেরত দিয়ে এসেছিল। ফিরে এসে কেবল একবার অস্ফুটে আফশোস করেছিল, ‘যাঃ, রিসিভ কপি রাখলাম না...।’
ছাত্রী-শিক্ষকের প্রেমপত্র ভীষণ ক্রিটিক্যাল। সেখানে সাংকেতিক সব ল্যাঙ্গুয়েজ। সুমিত মাস্টার আমায় দেখিয়েছিলেন কয়েকখানা প্রেমপত্র। তাতে লেখা-- ‘৯, ১২, ১৫, ২২, ৫, ২৫, ১৫, ২১।’
‘এর মানে কী?’
সুমিত মাস্টার বললেন, ‘আই লাভ ইউ।’
আমার চোখ ছানাবড়া। তবে কিছুদিন পর সেই সুমিত মাস্টারই চায়ের দোকানে এসে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’
তিনি পকেট থেকে একটা প্রেমপত্র বের করলেন। তাতে লেখা, ‘এ প্লাস বি হোলস্কোয়ার।’
বললাম, ‘কে দিল? এর মানে কী?’
সুমিত মাস্টার কোনওরকমে জবাব দিলেন, ‘এক ছাত্রী দিয়েছে। এর মানে হল, আমি আর তুমি। আমাদের হবে দুটো বাচ্চা।’
চিত্রকর: রাজ রায়
আরও বারোয়ারি নকশা... বিজ্ঞাপন লাইভ
আরও বারোয়ারি নকশা... সিনিয়র সিটিজেন