
শেষ আপডেট: 29 March 2020 07:26
আমাদের আবাসনটা নতুন এবং আবাসিকবৃন্দ সবাই নতুন নতুন। অথচ দেখা হলে এমনভাবে কথা হয় যেন কতকালের চেনা! পাড়ার বড় স্টেশনারি কাম গ্রসারি স্টোর্সের মালিক পান্নালাল ঘোষ এখানকার আবাসিক। এবং তিনিই আবাসনের সেক্রেটারি। ডাকাবুকো লোকটা চেপেছেন লিফটে। লিফট চলেছে আটতলায়, ভেতরে পান্না ঘোষ ও রায়গিন্নি। দু’জনেরই সেম ফ্লোর। সেক্রেটারি হাতে থাকলে একটু সুবিধে হয়। রায়গিন্নি গলাটা তরল করে বললেন, ‘যাই বলুন... আপনাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে আপনি সিনিয়র সিটিজেন... চমৎকার ফিটফাট থাকেন কিন্তু...।’
লিফট আটতলায় পৌঁছে গেল। লিফট থেকে বেরিয়ে এসে পান্নাবাবু বললেন, ‘আমার ওখান থেকেই তো আপনাদের মাসকাবারি মাল যায়...।’
রায়গিন্নি সোৎসাহে বলে উঠলেন, ‘আমার উনি একটু ভোঁদা টাইপ, কোনও স্কিম-টিম থাকলে আমাকে বলবেন, কসমেটিক্সের স্কিমগুলো জানতে না পারলে ফসকে যায়...।'
পান্নাবাবু অত্যন্ত বিনীতভাবে বললেন, ‘সে তো বলবই। তবে... আপনাদের মাসকাবারি যায় বলেই জানি...।’
‘কী বলুন তো?’
পান্নাবাবু জবাব দিলেন, ‘সেরকম কিছু নয়... ওই... সিনিয়র সিটিজেন হলে যে বস্তুটি মাস্ট, সেটার কথা বলছিলাম।’
‘মানে?’
পান্না ঘোষ আরও নম্র হয়ে বললেন, ‘ওই... আপনার আর আমার হেয়ার ডাই একই কোম্পানির...।’
হতভম্ব রায়গিন্নির দিকে তাকিয়ে তিনি বাক্যটা শেষ করলেন প্রায় অস্ফুটে, ‘মালটা ভাল...।’
তবে বিল্টুর মামারবাড়ির ছবিটা কিন্তু পুরো উল্টো। সেখানে সদর্পে বিরাজ করছেন তিন সিনিয়র সিটিজেন। নো অ্যাডাল্ট, নো মাইনর। অকৃতদার বড়মামা সিক্সটি ফাইভ, দিদা বিরাশি এবং দাদু প্রায় নব্বই ছুঁইছুঁই। ফল যা হবার তাই হয়েছে। পদে পদে সতর্কতা। লিকার চা। এবং চায়ে চিনি নেই। তরকারি থেকে নুন উধাও। শুকনো খটখটে না হওয়া পর্যন্ত বাথরুমে প্রবেশ নিষেধ। para) (শোনা যায় বিল্টুর ওল্ড গ্র্যান্ডমাদার ঘন ঘন লিকার চা-ই খেতেন। তিনি প্রায় নব্বই বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর শেষ ইচ্ছে ছিল, মরবার সময় মুখে যেন গঙ্গাজল দেওয়া না হয়। বদলে একটু চা ঢেলে দিলে তিনি শান্তিতে চোখ বুজবেন। ওল্ড গ্র্যান্ডমাদারের যখন শ্বাস উঠেছে, বিল্টুর অকৃতদার বড়মামা নাকি মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ঠাম্মা, চা যে দেব, চিনি না বিনা চিনি?’
জবাব না দিয়ে ফোকলা হাসিতে মুখ ভরিয়ে তিনি ঢলে পড়েছিলেন।
ট্রেন, বাস এবং অটোবাহিত হয়ে বিল্টুকে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করতে হয়।দীর্ঘ তিরিশ বছরের যাতায়াতের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন থিসিস সে ক’দিন আগে আড্ডায় পেশ করল। বলল, সিনিয়র সিটিজেন দুই প্রকার-- জুনিয়র সিনিয়র সিটিজেন এবং সিনিয়র সিনিয়র সিটিজেন। যারা সদ্য ষাট পেরিয়েছে, তারা ট্রেনে, বাসে, ব্যাঙ্কের লাইনে, এমনকি মদের দোকানেও গিয়ে প্রথমেই খোঁজ করে সিনিয়র সিটিজেনের সুবিধা আছে কিনা। এবং যারা সিনিয়র, তারা এসব পাত্তাই দেয় না।
সেদিন মেট্রো স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড়। বিল্টুর আশি ছুঁইছুঁই ঠাকুমাকে নিয়ে আমরা দু’জন দাঁড়িয়ে। গাড়ি আসার আগে বিল্টু ফিসফিস করে বলল,‘চিন্তা কোরো না ঠাম্মা, তোমাকে সিনিয়র সিটিজেনে বসিয়ে নিয়ে যাব।’
ঠাকুমা বললেন,‘না বাপু, আমি ট্রেনেই যাব।’
চিত্রকর: রাজ রায়
আরও বারোয়ারি নকশা-- বিজ্ঞাপন লাইভ