
শেষ আপডেট: 3 January 2020 18:30
আচ্ছা, আপনি কি একটা স্বাধীন দেশে বসবাস করেন? আপনি কি নাগরিক একটা গণতান্ত্রিক দেশের? উত্তরে নিশ্চয় আসবে অবশ্যই, আমি ভোট দিই, আমি ট্যাক্স দিই, ভারত আমার পূর্ব-পূর্ব-পূর্ব পুরুষের দেশ। এ দেশেই আমি বড় হয়েছি, বুড়ো হব, মরেও যাব। তাহলে এ দেশ যদি আমার না হয়, তবে কার? এ দেশের আমি যদি স্বাধীন নাগরিক না হই, তবে কোন দেশের স্বাধীন নাগরিক? কিন্তু আপনি স্বাধীন কি? এই ধরুন, একটা সময় তো ইংরেজরা ছিল, আপনি তখন পরাধীন ছিলেন। কেন পরাধীন ছিলেন বলে মনে হত? ইংরেজ একটা বিদেশী শক্তি, তাদের দেখতে আমাদের মতো নয়, তারা অত্যাচার করে ছিনিয়ে নিয়ে যেত আমাদের দেশের সম্পদ, তারা নির্বিচারে হত্যা করত ভারতীয়দের, অধিকার ছাড়াই। মানে, তাদের কোনও অধিকার ছিল না আমাদের উপরে শাসনের। কিন্তু তারা শাসন করত আর সেই শাসনে লাখে লাখে ভারতীয় মারা যেত। তো, তারা তো চলে গেল। কিন্তু তারপর যারা এল, আমরা কি স্বাধীন ছিলাম? ইতিহাসে কি কোনওদিন নাগরিকরা স্বাধীন হয়? না কি, নাগরিকদের শাসকরা স্বাধীন হয়?
বিদেশী দেখতে শাসকদের বদলে নেমে আসে এ দেশের পরিচিত মুখের শাসকরা। আর আজ?
একটা জিনিস মনে হয়, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আমরা হয়তো শত দিকে পরাধীন ছিলাম, কিন্তু একটা দিকে স্বাধীন ছিলাম। আর তা হল চেতনার জায়গায়। ঔপনিবেশিক শাসকরাও চায়নি আমাদের চেতনার জায়গায় পরাধীন করে রাখতে। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর কুড়ি সালে এসে, যখন একদিকে প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের বিস্ফোরণ আমাদের প্রকৃতই বিগত কুড়ি বছরে কমপক্ষে একশো বছর এগিয়ে নিয়ে গেছে, সেখানে, আমাদের ঘিরে ধরছে কুসংস্কার ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের চোখরাঙানি। চেতনাটাই যদি এভাবে পরাধীন হয়ে গেল, তাহলে আর আমরা স্বাধীন রইলাম কীসে? রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে একজন সাধারণ নাগরিক কী করবে? অথচ মোদী, শাহ, যোগীর মতো উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দু ফ্যাসিস্টরা সেই রাজনৈতিক কাঁটাতার তো বটেই, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে গেঁথে ফেলছে ধর্মের কাঁটাতার।
[caption id="attachment_173985" align="aligncenter" width="406"]
১৯৮১ সালে ফৈয়াজ আহমেদ ফৈয়াজ কে স্বাগত জানাচ্ছেন অটলবিহারী বাজপেয়ী[/caption]
আপনি ভাবতে পারেন, ফৈয়াজের লেখা একটি কবিতা 'অ্যান্টি-হিন্দু' কিনা তা দেখার জন্য আইআইটি কানপুরের অধ্যাপকেরা প্যানেল বসিয়েছেন! আইআইটি, যাকে ধরাই হয় ভারতের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম, যা আমাদের দেশকে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান সমস্ত ক্ষেত্রেই নিয়ে যায় বিশ্বের দরবারে। আমাদের দেশের মুখ বলা চলে। তো, সেই মুখ কীভাবে ফ্যাসিস্টদের মতো হয়ে গেল, শাসকদের মতো হয়ে গেল যে, একটি কবিতাকে বিচার করতে হচ্ছে তা 'অ্যান্টি-হিন্দু' কিনা? তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, 'অ্যান্টি-হিন্দু'। তাতে হল কী? আপনারা আইআইটি'র অধ্যাপক। জানি, এ সময়ে আমরা কথা বলার স্বাধীনতা হারিয়েছি, প্রতিবাদের স্বাধীনতা হারিয়েছি, চাকরি চাওয়ার স্বাধীনতা হারিয়েছি, বিজ্ঞানমনস্ক ভাবে ভাবার স্বাধীনতা হারিয়েছি। একটি কবিতা, তা কবিতা কিনা, তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে, কিন্তু তা হিন্দুবিরোধী কিনা, তা নিয়ে যখন প্যানেল বসে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, তখন বুঝে নিতেই হয়, আমরা হিন্দুরাষ্ট্রেই বসবাস করছি। যা আদতে ঘৃণা এবং লজ্জার।
ইতিহাসকে বিকৃত করা, বিজ্ঞানকে বিকৃত করা চলছিল। আর আজ, হিন্দুরাষ্ট্রের গো-সন্তানরা আরও বেশি উগ্র ফ্যাসিস্ট হয়ে যাওয়ার পরে, সেই সব কাজগুলি প্রকাশ্যে চলছে। মোদী-শাহরা যখন ক্ষমতায় এসেছিল, তখনও তারা কিছু রেখে ঢেকেই ফ্যাসিবাদ চালাতেন। কিন্তু এখন বলে বলে, রীতিমতো ঘোষণা করে, ফ্যাসিবাদী প্রতিশোধের, বদলার কথা বুক ফুলিয়ে বলছেন। আর তাদের পুলিশ মিলিটারিকে সম্ভবত মগজ ধোলাই মেশিন থেকে ঘুরিয়ে আনা হয়েছে। ফলে, তারা আচরণ করছে সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো।
তো, এনআরসি, সিএএ – তে, মুসলমান ছাড়াও যে সব সম্প্রদায়ের মানুষজনের অবস্থাই দুর্বিষহ হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আসল কথা হল, ইন্টারনেট, এনআরসি, সিএএ, 'অ্যান্টি-হিন্দু' কিনা তার জন্য প্যানেল বসানো, সব কিছুই প্রমাণ করে একটিই বিষয়। আর তা হল, ভারতীয় নাগরিকদের স্বাধীনতা বলে আর কিছু নেই। না হলে, দিলীপ ঘোষ, যোগীরা বলে, যারা বিরোধিতা করছে, তাদের লাশের উপর দিয়ে এনআরসি হবে? মানুষকে অপমান করার, নাগরিকদের অপমান করার অধিকার তোদের কে দিল?
ফ্যাসিস্টদের এই অধিকার আর কেই বা কাকে দেয়? তারা নিয়ে নেয়। আজ যে আমাদের প্রত্যেকের অস্তিত্ব বিপন্ন, দিকে দিকে মুসলমানদের বেছে বেছে অত্যাচার করা হচ্ছে, আমাদের কি মনে পড়ে যাচ্ছে না জার্মানির কথা?
আমরা এই শাসকদের হাত থেকে স্বাধীনতা চাই। হিন্দুরাষ্ট্রের হাত থেকে স্বাধীনতা চাই। প্রতি মুহূর্তে মানুষ হিসেবে আমাদের যে ফ্যাসিস্ট শাসক অপমান করে যাচ্ছে, তার হাত থেকে স্বাধীনতা চাই। আমাদের চেতনায় গুঁজে দিতে চাইছে বিকৃত ইতিহাস, কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তিবোধ। সেসবের হাত থেকে স্বাধীনতা চাই। ওদিকে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। যেগুলি আসলে ছদ্ম-কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। আজ যে কারণ দেখাচ্ছে, কাল তা বদলে গিয়ে হবে যে কোনও প্রতিরোধী কণ্ঠে। আমরা এই ডিটেনশন ক্যাম্পের হাত থেকে স্বাধীনতা চাই। স্বৈরাচারী এক শাসকের এবং তার দোসরের যে সব আচমকা ধেয়ে আসা পরিকল্পনা আমাদের জীবনকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে, আমরা সেই ধ্বংসস্তূপের হাত থেকে স্বাধীনতা চাই। একে অপরের প্রতি একধরনের বিদ্বেষ বিভেদ তৈরি করার এই সংস্কৃতির থেকে স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা চাই সব বিষয়ে ফ্যাসিস্টদের হিন্দুদর্শন গুঁজে দেওয়ার জঘন্য সংস্কৃতির থেকে। স্বাধীনতা চাই ফ্যাসিস্ট নেতাদের ক্রমাগত হুমকির রাজনীতির থেকে। স্বাধীনতা চাই, ক্রমাগত এই ধারণা থেকে যে আমরা অপমানিত পুতুল-নাগরিক, যাদের যেমন খুশি অপমানিত, শাসিত এবং লাঞ্ছিত করা যায়। স্বাধীনতা চাই ভারতীয় নাগরিকদের চেয়ে অনেক বেশি কম যোগ্যতাসম্পন্ন ফ্যাসিস্ট নেতাদের থেকে, যারা কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ভারতের মহান গণতন্ত্রের হাত ধরে এখন শাসকপদে আসীন। হিন্দু ফ্যাসিস্টরা যেভাবে সারা দেশে অর্থনীতিকে ভাঙচুর করে, মানুষে মানুষে সম্পর্কে ফাটল ধরিয়ে, উগ্র জাতীয়তাবাদের খুড়োর কল ঝুলিয়ে নেশায় উন্মত্ত করে বিষাক্ত করে দিচ্ছে ভারতীয় মানবাত্মাকে, আমরা সেই জঘন্য ফ্যাসিস্ট প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র থেকে স্বাধীনতা চাই।
[caption id="attachment_173990" align="aligncenter" width="361"]
ফৈয়াজ আহমেদ ফৈয়াজ–এর সেই বিতর্কিত কবিতা ও তার ইংরেজি অনুবাদ[/caption]
আর কতদিন আমরা এভাবে মেনে নিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করব একটা ভারতীয় হলোকাস্টের জন্য? কেন মেনে নেব ফ্যাসিস্ট নেতাদের আমাদের উপর ছড়ি ঘোরাতে, একটা প্রতিশোধস্পৃহার রাজনীতি তৈরি করতে? কেন মেনে নেব ক্রমাগত শাসানি এবং হুমকি? কেন চোখের সামনে দেখব উত্তরপ্রদেশে গণহত্যা দেখেও চুপ করে থাকা ভারতবর্ষ? কেন আমাদের বাক স্বাধীনতা বারবার হরণ করা হবে? কী কবিতা লিখব, কী গদ্য লিখব, কী নাটক করব, কী সিনেমা করব, কী স্টেটাস আপডেট করব, কী পোশাক পরব, সমস্ত কিছুর উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আর চোখরাঙানি থেকে স্বাধীনতা চাই।
আমরা একটা হিন্দুরাষ্ট্রে জন্ম নিইনি। একটা হিন্দুরাষ্ট্রে মরব না। আমরা একটা স্বাধীন ভারতবর্ষ দেখতে চাই আবার। এই দেশ মানে কিছু কাঁটাতার নয়। এই দেশ মানে কিছু শাসকদের দেশ নয়। এই দেশ মানে ১২৫ কোটি ভারতবাসীর দেশ। তাঁদের স্বাধীন ভারতবর্ষ প্রয়োজন। বিদ্বেষ থেকে, ধর্মীয় সন্ত্রাস থেকে, মৌলবাদ থেকে, বেকারত্ব থেকে, শিশুমৃত্যু থেকে, ধর্ষণ থেকে, দাঙ্গা থেকে, ধর্মীয় হানাহানি থেকে, কুসংস্কার থেকে, অন্ধ উগ্র দেশপ্রেম থেকে স্বাধীন একটা ভারতবর্ষ প্রয়োজন। যেখানে কারও কবিতাকে প্রমাণ করতে হবে না যে তা 'অ্যান্টি হিন্দু' নয়। বরং সে সোচ্চারে বলতে পারবে, আমি মানবতাবিরোধী নই। সোচ্চারে বলতে পারবে আমার কোনও ধর্ম নেই। আমার ঈশ্বরের কোনও মন্দির বা মসজিদ নেই।
এই স্বাধীনতার জন্য যদি আবার যুদ্ধ হয়, তো হোক।
মতামত লেখকের নিজস্ব
হিন্দোল ভট্টাচার্য কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক। 'জগৎগৌরী কাব্য'-এর জন্য পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার (২০০৯) এবং 'যে গান রাতের' কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন বাংলা অকাদেমী পুরস্কার (২০১৮)