.jpg)
শেষ আপডেট: 21 January 2024 14:47
অমল সরকার
সোমবার, ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অযোধ্যায় নতুন রাম মন্দিরের উদ্বোধন করবেন। সেই অনুষ্ঠান কভার করতে কয়েকদিন যাবৎ অযোধ্যায় আছি। যেমনটা ভাবা গিয়েছিল, মন্দির উদ্বোধন ঘিরে অযোধ্যা এখন পুরোদস্তুর রাম-নগর।
শ্রীরামচন্দ্রের পাশাপাশি নয়া অযোধ্যার রূপকার হিসাবে পোস্টার-ব্যানারে নজরকাড়া উপস্থিতি হিন্দুত্বের দুই শক্তিমান মুখ নরেন্দ্র মোদী ও যোগী আদিত্যনাথের।
বিজেপি-সহ গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের একাংশ ওই দিনটিকে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, এমনকী স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবসের সমান মর্যাদাপূর্ণ হিসাবে তুলে ধরতে তৎপর। প্রধানমন্ত্রী মন্দিরের শিলান্যাস করেছিলেন স্বাধীনতার মাস অগস্টে (৫, অগস্ট, ২০২০)। মন্দির উদ্বোধন করছেন সংবিধান চালুর মাস জানুয়ারিতে, যে সংবিধানের ঘোষণায় ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। যার অর্থ, রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকতে পারে না। তাই ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ অনাকাঙ্খিত।
অথচ, সেই রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী কেন মন্দিরের শিলান্যাস, উদ্বোধনে ধর্মগুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ সেই প্রশ্নের অনুপস্থিতি অবাক করে এবং গান্ধীর দেশের পরিবর্তনটি তাতে অনুধাবন করা যায়, বিরোধীরা যাকে 'মোদীর ভারত' বলছে।
বলতেই হয়, নরেন্দ্র মোদী এই ব্যাপারে একশো শতাংশ সৎ। তিনি তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য পূরণে কোনও কৌশল, কর্মসূচিই কখনও গোপন করেননি।
ফারাক হল, ৭৪ বছর আগে সংস্কার হওয়া গুজরাতের সোমনাথ মন্দিরের উদ্বোধন করতে না যেতে রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদকে পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। চিঠিতে লিখেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের রাষ্ট্রপতির এই কাজে যুক্ত হওয়া অনুচিত। সেই ঘটনার সাড়ে সাত দশক পর ভারতের রাজনীতির মূল অঙ্গন থেকে মোদীর উদ্দেশ্যে এমন কথা উচ্চারিত হল না, ধর্মীয় উপাসনস্থল শিলান্যাস, উদ্বোধন থেকে প্রধানমন্ত্রীর দূরে থাকা উচিত। সিপিএম-সহ বাম দলগুলি সরাসরি এবং তৃণমূল খানিক রাখঢাক করে সেই কথাটা বলার চেষ্টা করেছে বটে, যদিও তাতে আপত্তির ঝাঁজ নেই।
আসলে একটু তলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হবে, ধর্মকে রাজনীতির গায়ের চাদর করে তোলাতে শুধু গেরুয়াবাদীরাই নন, ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের তথাকথিত বহু নেতা-নেত্রীও একই বন্ধনীতে আছেন। ভারত জোড়ো আন্দোলনে ব্যস্ত রাহুল গান্ধীর কথাই ধরা যাক। বিজেপির কট্টর হিন্দুত্বের মোকাবিলায় তিনি নরম হিন্দুত্বের মডেল হাজির করে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে জুড়তে চেয়েছিলেন। আর আজ যেখানে রাম মন্দির তৈরি হয়েছে চার দশক আগে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাবরি মসজিদের দরজা খুলে দিয়ে হিন্দুদের পূজাপাঠের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন রাহুলের প্রয়াত পিতা রাজীব গান্ধী। সেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিনে দিল্লির মসনদে আসীন কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও। মসজিদ ধ্বংস রুখতে সামান্যতম পদক্ষেপ করেননি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী।
সেই কংগ্রেস মন্দির উদ্বোধন অনুষ্ঠান বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বিজেপি, আরএসএসের কর্মসূচি হয়ে ওঠায়। বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে তারা টুঁ শব্দটি করে না। জওহরলাল নেহরুর দল বরং প্রচার করে, রাম মন্দির নির্মাণের কৃতিত্ব বিজেপির নয়, হিন্দুত্বের প্রশ্নে কংগ্রেস মোটেই বিজেপির থেকে পিছিয়ে নেই ইত্যাদি। সদ্য বিদায় নেওয়া কংগ্রেস সরকারগুলির বাজেট পর্যালোচনা করলেও দেখা যাবে তারা মোটা টাকা মন্দির সংস্কার আর নির্মাণে ব্যয় করেছে।
পাঁচ রাজ্যের ভোটের আগে ‘দ্য ওয়াল’-এ আমি লিখেছিলাম, তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, ছত্তীসগড় এবং মধ্যপ্রদেশে লড়াই হতে যাচ্ছে মূলত বিজেপির হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে কংগ্রেস এবং বিআরএসের মন্দির রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষা। সেই কারণে বিধানসভার এই নির্বাচন ছিল অন্য সব ভোটের থেকে আলাদা।
নির্বাচনী ফল বলছে, বিরোধীদের মন্দির রাজনীতি বা নরম হিন্দুত্ব বিজেপির হিন্দুত্বের কর্মসূচির কাছে পরাজিত হয়েছে। কমলনাথ, বাঘেলদের দেখাদেখি রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধীরা যতই কপালে তিলক কেটে, অঙ্গবস্ত্র পরে মন্দিরে মাথা ঠুকুন না কেন, মানুষ মনে করেছে হিন্দুত্বের পেটেন্ট বিজেপির। হিন্দুত্বের প্রশ্নে বাছবিচারে তারা বিজেপি’কেই এখনও এগিয়ে রাখার পক্ষপাতী। কংগ্রেস পরিচালিত সরকারগুলি মন্দির নির্মাণ আর সংস্কার করে হিন্দুর ত্রাতা সাজতে চাইলেও তা মানুষ গ্রহণ করেনি। বরং দীর্ঘ মেয়াদে যা সংখ্যালঘুদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে, তাই-ই শুধু নয়, কংগ্রেসকে নিয়েও সংশয় দানা বেঁধেছে। কথাটা তৃণমূল কংগ্রেস-সহ বিজেপি ও কংগ্রেস বিরোধী অনেক দল সম্পর্কেও সত্যি।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কংগ্রেসের এই নরম হিন্দুত্ব বা মন্দির রাজনীতি আসলে বিজেপি তথা গেরুয়াবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ। বরং কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে বিজেপির রাজনীতির বিরোধিতায় সৎ থাকলে দেশবাসীর বড় অংশ তাদের পাশে এসে দাঁড়াত। সেই পথে না হেঁটে তাঁরা একদিকে মানুষকে বোঝাচ্ছেন হিন্দুত্বের প্রশ্নে বিজেপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে বর্তমানের আসমান-জমিন ফারাক, অন্যদিকে, তারাই ক্রমশ গায়ে গেরুয়া বস্ত্র চড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
হিন্দুত্বের প্রধান কর্মসূচি এখন মন্দির নির্মাণ ও সংস্কার। মোদীর হাত ধরে বদলে গিয়েছে কাশী বিশ্বনাথ-কেদারনাথ-বদ্রিনাথ-মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নীর মহাকাল মন্দির কমপ্লেক্স-গুজরাতের কালিমাতা মন্দিরের মতো প্রাচীন হিন্দু তীর্থ ক্ষেত্রের। দুর্গম পাহাড় কিংবা গভীর জঙ্গলে অনাদরে পড়ে থাকা মন্দিরকে তীর্থক্ষেত্র হিসাবে গড়ে দিয়েছেন। অযোধ্যায় বহু হোর্ডিং, ব্যানারে মোদীর সেই কৃতিত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বলাই বাহুল্য, তাতে মসজিদ, গির্জার স্থান হয়নি।
এই কর্মসূচির জন্য বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক দল বলা হলে আজকের ভারতে কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। বিজেপি বিরোধী দল শাসিত ১৬টি রাজ্য সরকারের কাজকর্ম পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে গেরুয়াবাদী শিবিরের সঙ্গে মৌলিক ফারাক কম। উল্টে মন্দির তৈরি ও সংস্কারে সহমত তৈরি হয়েছে বিজেপি ও বিজেপি বিরোধী শিবিরের বৃহত্তম অংশের মধ্যে।
প্রশ্ন হল, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সরকারি টাকায় উপাসনাস্থল নির্মাণ, সংস্কার কতটা গ্রহণযোগ্য। বিজেপি-অবিজেপি নির্বিশেষে কোনও রাজ্য এই কাজে পিছিয়ে নেই।
হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্য পরাজয়ের পর রাহুল গান্ধী এক্স হ্যান্ডেলে বলেছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে নীতির লড়াই চলবে। বাস্তবে আমরা কি সেই লড়াই দেখতে পাচ্ছি? দেশকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণার পথে আপোসহীন নরেন্দ্র মোদীর মোকাবিলায় কংগ্রেসের কৌশল এবং উদ্যম, দুইয়েরই অভাব।
১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বিগত তিন দশকে ভারতের রাজনীতির ডিএনএ বদলে গিয়েছে। বাবরি ধ্বংসের মধ্য দিয়েই সংবিধানের মূল ভাবনা এবং স্তম্ভটিতে বড় ফাটল ধরে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে তা চওড়া হতে হতে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।
বলতে গেলে সেদিন থেকেই হিন্দু রাষ্ট্র হওয়ার পথে যাত্রা শুরু এ দেশের। তিন দশক বলতেই হয়, ধর্মনিরপেক্ষতা এখন শুধুই সংবিধানের ঘোষণাপত্রে। এর কৃতিত্ব বা দায় কোনওটাই পুরোপুরি বিজেপির নয়। আসলে বেশিরভাগ দলই বিজেপি বিরোধিতায় গেরুয়া রাজনীতির সংস্কৃতিকেই আঁকড়ে ধরছে। ফলে নরেন্দ্র মোদীর দল আজ ১২টি রাজ্যে ক্ষমতাসীন হলেও তাদের রাজনীতির বিস্তার ঘটেছে অনেক বেশি। ভোটের বাক্সে বিজেপির সাফল্য দিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের প্রভাবকে মাপা যাবে না।
২০২৫-এ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের শতবর্ষ। তার আগে ভারত সরকারিভাবে হিন্দু রাষ্ট্র হবে কিনা তা নির্ভর করবে ২০২৪-এ নরেন্দ্র মোদীর ভাগ্যে কী লেখা আছে তার উপর। ‘বাবরি ধ্বংসের তিন দশক এবং ষড়যন্ত্র ও সুবিধাবাদের আখ্যান’ বইয়ে আমি বিস্তর নথিপত্র দিয়ে দেখিয়েছি, আরএসএস স্বাধীনতা পরবর্তী সব সরকারের সঙ্গেই সু-সম্পর্ক রেখে কাজ করার চেষ্টা করেছে। একমাত্র জওহরলাল নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী বাদে আর কোনও প্রধানমন্ত্রী এই সংগঠনের কাজকর্মে বড় কোনও বাধা হননি। এমনকী ইন্দিরা গান্ধীও নন, যিনি এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছিলেন।
লক্ষণীয়, সঙ্ঘ পরিবার সেই ইন্দিরার প্রধানমন্ত্রিত্বকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। আরএসএসের মতোই দেশে আজ বিজেপি বিরোধীদের একাংশ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চায়। রাজনৈতিক কারণে কাজটা তাদের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাঁরা চান মোদীর হাত ধরে বাকি কাজটা সারা হয়ে যাক। রাজনীতির এই নজিরবিহীন প্রতারণা বিরল ও ক্ষমাহীন।