
শেষ আপডেট: 28 May 2023 15:09
মাস কয়েক আগে ইন্দোনেশিয়া থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতাদের আসন্ন জি-২০ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠকে ডেকেছিলেন। সবাই একবাক্যে প্রধানমন্ত্রীকে পাশে থাকার আশ্বাস দেন সেদিন। বৈঠকের যে ছবি সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল তাতেও ফুটে উঠেছিল আলোচনার টেবিলের সৌহাদ্যের পরিবেশ। শোনা যায় বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সেদিন বিরোধী নেতাদের সঙ্গে খানিক মজামস্করাও করেন। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত ওই সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে কোনও বিরোধ-বিতর্ক শোনা যায়নি। কারণ, জি-২০’র

গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন, সংশয় যাই থাক না কেন বিরোধী নেতারাও জানেন, ভারতের ওই গোষ্ঠীর সভাপতির পদ পাওয়া এবং সম্মেলনের আয়োজনের সঙ্গে দেশের সম্মান জড়িত।
আজ সেই দেশের নয়া সংসদ ভবনের (New Parliament Building) উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। আজ কিংবা কাল নতুন সংসদ ভবন হয়তো প্রয়োজন হতই। আইনত ২০২৫ পর্যন্ত সংসদ এবং বিধানসভার আসন সংখ্যার পরিবর্তন করা যাবে না। সংখ্যা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বড়জোর ২০২৬ নাগাদ। সেই কাজ শেষ হতে হতেও চার-পাঁচ বছর লেগে যাবে। ফলে নতুন সংসদ ভবনের প্রয়োজন কোনও অবস্থাতেই ২০২৯-’৩০-এর আগে হওয়ার কথা নয়।
নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) বিগত নয় বছরের শাসন চাক্ষুষ করার পর এটা কারও অজানা থাকার কথা নয় যে তিনি পূর্বসূরিদের মতো স্রেফ সরকার প্রধান নন। তিনি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কে ‘মোদী সাম্রাজ্য’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাই করোনা মহামারীর মতো সঙ্কটময় সময়েও তিনি নতুন সংসদ ভবন নির্মাণ-সহ সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার মতো অনাবশ্যক সিদ্ধান্ত নেন।

অধুনা গণতান্ত্রিক পথে নির্বাচিত কোনও সরকারের এমন তুঘলকি সিদ্ধান্তের কথা জানা নেই। যে কারণে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়ে এসেও এ দেশে ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ শব্দ যুগল বহুল ব্যবহৃত শব্দ তালিকায় ঢুকে পড়েছে।
অদূরে মায়ানমারে অল্পদিনের জন্য সু চি’র নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও সেনা বাহিনী টিকতে দেয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি সেনা শাসনাধীনে। বছর কয়েক আগে সে দেশে দেখেছি চরম দারিদ্রপীড়িত এলাকাতেও মাথা তুলেছে সুবিশাল চোখ ধাঁধানো বৌদ্ধ মন্দির। সেগুলি এক একটি এক একজন জেনারেলের কৃতিত্ব। যিনি যখন শাসন করেছেন, বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করে নিজের রাজত্বকে ইতিহাসে গেঁথে দিয়ে গিয়েছেন। সেনা শাসনের প্রতীক হিসাবেই গড়ে উঠেছে দেশটি বর্তমান রাজধানী।
গণতন্ত্রের মন্দির নতুন সংসদ ভবন নির্মাণ ঘিরে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সেই মানসিকতাই ফুটে উঠেছে। তিনি চাননি ইতিহাসের পাতায় এমন কোনও ছবি স্থান পাক যে তাঁর পাশে বিরোধী দলের কেউ থাকুন। তাই ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাড়াহুড়ো করার পাশাপাশি তিনি শিলান্যাসের সময় হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন করোনা মহামারী পর্বকে। আবার সেই সংসদকে এড়িয়ে নতুন তিন কৃষি আইন চালু করতে অর্ডিন্যান্স জারি করে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিলেন। করোনা মহামারী পর্বকে গণতন্ত্রের কবর দেওয়ার কাজে মোদীর মতো আর কেউ ব্যবহার করেছেন বলে জানা নেই।
প্রধানমন্ত্রী জানতেন, ২০২০-র ১০ ডিসেম্বর মহামারীর মধ্যে কোনও সচেতন, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক বিরোধী নেতা তাঁর পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে নিজের কবর খুঁড়বেন না। আজ সংসদ ভবন উদ্বোধনেও প্রধানমন্ত্রী সেই একই কৌশল নিয়েছেন।
এই নিবন্ধ শুরু করেছিলাম জি-২০ সম্মেলনের প্রসঙ্গ দিয়ে। বিদেশি নেতাদের কাছে প্রধানমন্ত্রী মুখ রক্ষা হয়েছে বিরোধীদের সঙ্গে গ্রুপ ছবির সুবাদে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর অন্ধ অনুচরেরা ছাড়া একজনও কি মনে করেন, জি-২০’র সম্মেলনের তুলনায় নয়া সংসদ ভবনের উদ্বোধন কম গুরুত্বপূর্ণ? সেই অনুষ্ঠানে বিরোধীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ডাক যোগে চিঠি পাঠিয়ে। লোকসভার নেতা হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর কি উচিৎ ছিল না নয়া সংসদ ভবন উদ্বোধনের মতো ঐতিহাসিক পর্বটি নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এমন একটি বৈঠক ডাকার পরামর্শ তিনি লোকসভার স্পিকারকেও দিতে পারতেন।
নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী, অন্দরে বসল সেঙ্গোল
মোদী সে পথে হাঁটেননি। কারণ তিনি চান না নয়া সংসদ ভবন উদ্বোধনের ছবির ফ্রেমেও তাঁর পাশে প্রধান বিরোধীরা কেউ থাকুক। তাতে তাঁর কৃতিত্ব ঘা খাবে। রাজনীতির কী পরিহাস, অন্তত এই অনুষ্ঠানটির জন্য স্বয়ং রাষ্ট্রপতিকেও তিনি কার্যত বিরোধীদের দলেই রেখেছেন। শিলান্যাসেও ডাক পাননি তখনকার রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। উদ্বোধনে ডাক পেলেন না দ্রৌপদী মুর্মু।
অতীতে খুঁড়ে কেউ কেউ পাল্টা দাবি করছে, সংসদের অ্যানেক্স ভবনের উদ্বোধন করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। নয়া গ্রন্থাগারের উদ্বোধন করেন রাজীব। যে তথ্যটি চেপে যাওয়া হচ্ছে, দুই ক্ষেত্রেই ভবন দুটির শিলান্যাস করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতিরা, যথাক্রমে ভিভি গিরি ও কেআর নারায়ণন। তাছাড়া, অ্যানেক্স বিল্ডিং, লাইব্রেরির সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ নয়া সংসদ ভবনকে এক করে দেখাও হাস্যকর যুক্তি।
এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। নয়া সংসদ ভবন উদ্বোধনের অনুষ্ঠান ২০টি বিরোধী দল বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে, কুড়িয়ে বাড়িয়ে সরকারের পাশেও আজ সমান সংখ্যায়, এমনকী বিরোধীদের তুলনায় এক দুটি পার্টির বেশি হাজির থাকাও অসম্ভব নয়।
কিন্তু যদি উল্টোটা হত? অর্থাৎ নয়া সংসদ ভবন উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে মোদী সরকার তথা বিজেপি সম্পূর্ণ একা। অন্যদিকে, বিরোধীরা সব এককাট্টা। বয়কটের সিদ্ধান্তে যৌথ বিবৃতিতে সই করল সব দল। কী হত তাতে?
আজকের বিরোধীদের ছেলেমানুষী কার্যকলাপ, অবং দেখে বলা যায়, বিজেপি বা মোদীর তাতেও কিছু আসত যেত না। তা শুধু পদ্ম-শিবিরের অগণতান্ত্রিক মনোবৃত্তির কারণে নয়। বিপদ অন্য জায়গায়। লোকসভায় বিজেপি একাই তিনশোর বেশি আসনের অধিকারী। যে কারণে তারা এখন আর শরিকদের নিয়ে ভাবে না, বাজপেয়ী, আদবানীদের এনডিএ-কে ভুলে থেকে নিজেরই অতীতকে অস্বীকার করে। তেমন একটি প্রবল ক্ষমতাধর গণতন্ত্র-বিমুখ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় বিরোধী দলগুলির বিরোধিতা ততধিক হাস্যকর। তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে না তারা। এমনকী মোদী তথা বিজেপির বিরোধিতায় অগ্রবর্তী সেনানি সাজতে গিয়ে বিরোধী শিবিরের বোঝাপড়ার দেওয়াল তৈরির আগেই তাতে ফাটল ধরানোর পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে কোনও কোনও দল।
সংসদ ভবন উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতিকে না ডাকা নিয়ে গত রবিবার থেকে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বিরোধী দলগুলির যৌথ বিবৃতির প্রস্তুতির মধ্যেই বেশ কিছু দল আলাদা করে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। বিবৃতিটি প্রচারের আগে দু’দিন ধরে বারে বারে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও তাতে সই করতে রাজি হননি। কারণ, কংগ্রেসের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে সই করলে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দলের নাকি ক্ষতি হবে। আসলে রাজ্যবাসীকে তিনি এতটাই বোকা ভাবেন যে তাঁর কৌশল তারা বুঝি তার বুঝবে না। আসলে কেসিআর বুঝতে পারছেন না তাঁর বিজেপি বিরোধিতা কতটা প্রশ্নবিদ্ধ।
যৌথ বিবৃতির প্রধান উদ্যোক্তা কংগ্রেস কর্নাটকে তাদের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে প্রথমসারির বিরোধী দলগুলিকে আমন্ত্রণ জানালেও ডাক পাননি অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কারণ, দিল্লি প্রদেশ কংগ্রেসের আপত্তি। তাদের আপত্তিতেই কেজরিওয়ালের আর্জিতে এক কথায় সাড়া দেননি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে। দিল্লির সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনতাই করে নিয়ে মোদী সরকারের জারি করা অর্ডিন্যান্স রাজ্যসভায় আটকে দিতে সব বিরোধীদলকে পাশে চাইছেন আপ সুপ্রিমো। তৃণমূল-সহ বেশিরভাগ আঞ্চলিক দল তাঁর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও মোদী হটাও অভিযানের ক্যাপ্টেন হওয়ার দৌড়ে থাকা কংগ্রেস রা কাড়ছে না। খাড়্গে সিদ্ধান্ত নেবেন দিল্লি প্রদেশ কংগ্রেসের মতামত শুনে। কংগ্রেস বোধহয় মনে করছে ’২৪ শে তাদের দেশের কুর্সি দখল নিশ্চিত। তখন কেন্দ্রে সরকার চালাতে গেলে তাদের সরকারের হাতেও দিল্লির অফিসারদের ট্রান্সফার-পোস্টিংয়ের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন হবে।
কর্নাটকের ভোটের ফলাফল নিয়ে তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া বিচিত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির পরাজয়ে রাজ্যবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কিন্তু শুভেচ্ছা জানানো দূরের কথা কংগ্রেসের নাম পর্যন্ত মুখে আনেননি। অনেকে সঠিকভাবেই তৃণমূলের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, তা হল, বাংলায় কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই কর্নাটকে হাত চিহ্নের জয়ে তৃণমূল নেত্রী নিষ্পৃহ। কিন্তু বাংলার মানুষ কি রাজনীতির পাটিগণিতে এতটাই মুর্খ।
শপথ অনুষ্ঠানে নিজে যেতে না পারলেও তৃণমূল নেত্রী দলের প্রতিনিধি হিসাবে সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে পাঠিয়েছিলেন। প্রবীণ এই সাংসদ কলকাতায় ফিরে দলের মুখপত্রে কর্নাটকে বিজেপির বিরুদ্ধে তুঙ্গে ওঠা জনজোয়ারের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। তাতে সিদ্দারামাইয়া সরকারের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে উন্মাদনা, অনুষ্ঠান মঞ্চে তাঁর আন্তরিক আপ্যায়ন পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা সানন্দে লিখেছেন। শুধু দীর্ঘ সেই নিবন্ধে ‘কংগ্রেস’ শব্দটি নেই।
এই যখন পরিস্থিতি তখন যৌথ বিবৃতি দিয়ে সংসদ ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠান বর্জনের নিট ফল শূন্য হওয়া অসম্ভব নয়। তাছাড়া, যৌথ বিবৃতির পাতায় বিরোধী ঐক্য আমরা সেই ২০১৪ সাল থেকে দেখছি। মোদীর জমি অর্ডিন্যান্স, তিন কৃষি আইন, নাগরিকত্ব আইন, ঘৃণা ভাষণের নিন্দা, স্ট্যান স্বামীর জেল হেফাজতে মর্মান্তিক মৃত্যু, বিরোধীরে বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআইয়ের ব্যবহার, তালিকা আরও দীর্ঘ করা চলে।
কিন্তু ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে না কোনও দল। অথচ, যে বিজেপির বিরুদ্ধে আজ গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াইয়ের কথা বলা হচ্ছে, তাদের পূর্বসূরি জনসংঘের তৎকালীন নেতা বাজপেয়ী, আডবানীরা জরুরি অবস্থা পরবতী নির্বাচনে ইন্দিরার তানাশাহীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দলটিকেই জনতা পার্টির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন।