শেষ আপডেট: 22 April 2020 07:44
পণ্যবাহী গাড়ি থেকে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে কয়েক লিটার দুধ। চেটেপুটে খেতে ব্যস্ত কয়েকটি কুকুর। তাদের ঠিক পাশেই হাত দিয়ে কোনওরকমে কৌটোয় যতটা সম্ভব সেই দুধ ভরে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত এক হতদরিদ্র মানুষ। আগ্রার পাঁচ সেকেন্ডের এই দৃশ্য নিশ্চয়ই অনেকেই দেখেছেন। কিংবা দিল্লিতে যমুনা নদীর ব্রিজের তলায় খড়কুটো হারানো পরিযায়ী শ্রমিকদের অসহায় কুকুরছাগলদের মতো আশ্রয় নেওয়ার ছবি? অথবা গুরুগ্রামের পরিযায়ী বস্তির মুকেশ মণ্ডল? তাঁর গল্পও নিশ্চয় শুনেছেন? যিনি নিজের মোবাইল বেচে সেই টাকা দিয়ে স্ত্রী ও চার সন্তানের জন্য অল্প খাবার, একটি ফ্যান কিনে ও ধার মিটিয়ে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়লেন।
লকডাউনের ভারত এক নয়া নাগরিক বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে। সকল নাগরিকের সুরক্ষার কথা ভেবে এই লকডাউন চলছে ঠিকই। সকলের ওপর তা প্রযোজ্যও বটে। কিন্তু এই লকডাউনের প্রভাব সকলের ক্ষেত্রে সমান নয়। ধরুন, আপনি একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক। লকডাউন শুরু হতেই এক-দেড় মাসের খাবার, ওষুধ মজুত করে রেখেছেন। নিকটজনদের সঙ্গে লকডাউন দিনযাপন করছেন। সারাটা দিন কীভাবে কাটবে বুঝে পাচ্ছেন না। হয়তো অনলাইনে ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস নিচ্ছেন। অথবা ফেসবুকে নিজের সুপ্ত প্রতিভা জাহির করে বাহবা লুটছেন। আর বিশ্বের নানা দেশ করোনা-যুদ্ধে মোদীকেই তাদের নেতা করেছেন, এই বার্তা বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ফরোয়ার্ড করছেন। কিংবা ধরুন আপনি কোনও কর্পোরেট সংস্থার বড় পে-স্কেলে থাকা কোনও ব্যক্তি। দিব্বি ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করছেন। ফেসবুক-বন্ধুর রান্নার ছবি দেখে হিংসেয় পুড়ছেন। নিজে কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তাই ফেসবুকের পোস্টে ‘করোনা-জেহাদি’ মুসলমানদের ওপরে গালি পেড়েই ঝাল মেটাচ্ছেন। আর করোনা-ডিপ্রেশন কাটাতে সেলেবদের ফিটনেস ভিডিও পোস্ট করছেন।
উল্টো দিকে রয়েছেন ভিনরাজ্যে কাজে গিয়ে আটকে পড়া ৩০০ বর্গফুট রুমে ১৭ জন মিলে থাকা শ্রমিকরা কিংবা পাড়ার চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালানো বয়স্ক দম্পতি, পাথর খাদান-ক্রাশার-কলকারখানায় কাজ করে দিনমজুরি করে পেট চালানো মানুষগুলো কিংবা মাসিক ইএমআই দিয়ে সেডান গাড়ি কিনে দেশের বাড়ির দায়িত্ব নেওয়া ছাপড়া থেকে কলকাতায় আসা উবার ড্রাইভার। এঁদের ওপরে এই লকডাউনের প্রভাবের মাত্রা কিন্তু এক পূর্বসুরক্ষায় মোড়া শ্রেণিতে থাকা আপনার-আমার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এঁদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ নেই। আছে নিজের এবং পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে প্রবল অনিশ্চয়তা। বাড়িতে খাবার নেই। পকেটে নেই কানাকড়িও। এই ঘোর সংকটে পরিজনদের কাছে ফেরার সুযোগও কেড়েছে রাষ্ট্র। অথচ এই রাষ্ট্রই বিদেশে আটকে পড়া নাগরিকদের বিশেষ বিমানে দেশে ফিরিয়েছে। উত্তর ভারতে গিয়ে আটক পুণ্যার্থীদের ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাই হারানো, কাজ হারানো দিল্লি, মুম্বই, সুরাতে আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের রাষ্ট্র ফেরাতে নারাজ। তাই ২০০ কিলোমিটার হেঁটে মাঝপথেই লুটিয়ে পড়ে প্রাণ হারান ঘরে ফিরতে চাওয়া রণবীর সিংহেরা।
কেন্দ্রের ‘ডিজাস্টার মানেজমেন্ট’ বলুন বা রাজ্যের ‘এপিডেমিক’, যে আইনের বলে গোটা দেশজুড়ে এই লকডাউন চলছে, সেই আইন সামাজিক-অর্থনৈতিক শ্রেণি অবস্থান অনুসারে নাগরিকের ওপরে তার প্রভাব ফেলছে। যা নাগরিক সাম্যের অধিকারের প্রশ্নে আমাদের মাথা হেঁট করে দেওয়ার মতো এক সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। শুধু অসাম্য তৈরিই নয়, এমনিতেই নানা বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়া সমাজের সব থেকে দুর্বল অংশের ওপরে কয়েক ঘণ্টার নোটিসে নতুন এক অসাম্যের ভার চাপিয়ে দেওয়া হল। পাশাপাশি ছিনিয়ে নেওয়া হল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও জীবিকা অর্জনের মৌলিক অধিকারও। যমুনা নদীর পাড়ের নোংরায় শুয়ে থাকা দিনমজুর আর তার পাশে থাকা কুকুরটির বেঁচে থাকার মধ্যে কোনও ফারাক রইল না। রাষ্ট্র ঘোষিত লকডাউন সেই পশু ও নাগরিকের অস্তিত্বের ফারাক প্রায় মুছে দিল। আইন করে রাষ্ট্র দেশের সমস্ত নাগরিকের ওপরে সমানভাবে লকডাউন চালালেও সকল নাগরিকের ওপরে তার প্রভাব সমান নয়। যার ফলে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের চাপানো একটি আইন সরাসরি নাগরিক সাম্যের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে প্রতারণা করছে। সমস্ত নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়ার নামে একটা বড় অংশের নাগরিককে লকডাউনের ঘোষণামাত্র করোনার থেকেও আরও বড় বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই লকডাউন রাষ্ট্র-নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত সম্পর্ককেই প্রভাবিত করছে। যাঁরা সবচেয়ে দুর্বল তাঁদের ওপরেই সব থেকে বেশি দায়িত্বের বোঝা চাপাচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্বই বিশেষ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলোকে দূর করা। কিন্তু এখানে রাষ্ট্রের পদক্ষেপই সেই বৈষম্য বাড়িয়ে তুলছে।
এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, করোনা-যুদ্ধে লকডাউন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। আয়তনে এবং জনসংখ্যায় ভারতের মতো এত বিশাল একটি রাষ্ট্রে লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। কিন্তু শুধু লকডাউনের ওপর ভরসা করে থাকলে তো চলবে না। লকডাউন বড়জোর আমাদের হাতে কিছু বাড়তি সময় দেবে। তার বেশি কিছু নয়। করোনা-যুদ্ধে লকডাউনের পাশাপাশি চাই ব্যাপক হারে টেস্টিং এবং টেস্টিং। আর লকডাউন-পর্বে প্রতিটি নাগরিকের জন্য, বিশেষ করে দরিদ্র ও দুর্বল অংশের জন্য চাই পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক-সামাজিক রিলিফের ব্যবস্থা। আমরা চিন, ব্রিটেন বা কানাডার মডেলের দিকে তাকাতে পারি। ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’-এর কথা ভাবতে পারি। স্রেফ নৈতিকতার বোধ থেকে নয়, এই অভূতপূর্ব সঙ্কটে প্রতিটি নাগরিককে বাঁচিয়ে রাখার সাংবিধানিক অধিকারের আইনি দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্রকেই এই ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু দু'টাকা কিলো চাল বিনামূল্যে বিলিয়ে বা ১০০ দিনের কাজ দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বেহাল কোষাগারের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র তার এই সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে সরে আসতে পারে না।
মুশকিলটা হল, রাষ্ট্র তার সেই দায়িত্ব শুধু এড়িয়েই যাচ্ছে না, এই সমস্যার প্রতি তার মনোভাবও উদ্বেগজনক। যে ক’বার প্রধানমন্ত্রী দেশকে বার্তা দিয়েছেন, গরিব, দিনমজুর, সমাজের সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত অংশের জন্য কী কী পদক্ষেপ করছেন, তা নিয়ে প্রায় কোনও শব্দই খরচ করেননি। উল্টে, রাষ্ট্রের বদলে যাবতীয় দায়িত্বের ভার তিনি নাগরিকদের দিকে ঘুরিয়ে দিতেই ব্যস্ত। কেন্দ্র ও রাজ্য, দু’পক্ষই কিছু পদক্ষেপ করেছে ঠিকই কিন্তু তা কোনওভাবেই পর্যাপ্ত নয়। মনে রাখতে হবে, করোনা কেবল একটি স্বাস্থ্যসংক্রান্তই নয়, এক ব্যাপক অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থারও নাম। যার প্রভাবে বিপর্যস্ত গোটা বিশ্বের অর্থনীতি। তার জের বেশ কয়েক বছর থাকবেই। আর তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির ওপরেই। তাই আমাদের নজর যদি কেবল ‘করোনা হাসপাতাল’-এই থাকে, তা হলে অদূর ভবিষ্যতে সমাজ-অর্থনীতির আর যেখানে যেখানে এই ভাইরাস পৌঁছবে, সময় থাকতে সচেতন না হলে তারও অসুখ সারানো আমাদের মতো দেশের পক্ষে বড় মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।
সংসদ, বিধানসভা বন্ধ। বিভিন্ন মন্ত্রিসভা, সংসদীয় কমিটি সক্রিয় নেই। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কাজ ও কর্মপদ্ধতির মূল্যায়নের একমাত্র স্থান উচ্চ আদালত। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সুপ্রিম কোর্টের নিশ্চুপ থাকাটা বড় বেদনার। দিনমজুরদের মজুরি দেওয়ার দাবির মামলায় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আস্থা প্রদর্শন আমাদের সংশয় জাগায়। এই পরিস্থিতিতে সরকার এবং আদালত, দু’পক্ষই নাগরিক এবং তাঁদের অধিকারের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হবেন এটাই তো কাম্য। অথচ এখনও অবধি করোনা পরিস্থিতিতে নাগরিক অধিকারের এই বৈষম্য দূর করার প্রশ্নে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে কোনও সক্রিয়তা দেখা যায়নি।
লকডাউনে প্রথমেই ঘর পুড়েছে নিম্নবিত্তের। মধ্যবিত্ত কেবল তার আঁচ পেয়েছে। আত্মহত্যা, অনাহার, হেঁটে ফেরা, পুলিশের লাঠিচার্জ সব মিলিয়ে লকডাউনের জেরে এখনই মৃতের সংখ্যা ২০০ পার হয়েছে। একমাত্র উপার্জনশীল সদস্যকে হারিয়ে বিপর্যস্ত হয়েছেন তাঁদের পরিবারের আরও কত মানুষ। সাংবিধানিক ন্যূনতম দায়িত্বের প্রতি হাত তুলে নেওয়া এমন লকডাউন চলতে থাকলে গরিব ও দুর্বলের ঘরে লাগা সেই আগুন একদিন নিরাপদে থাকা মধ্যবিত্তের ঘরেও পৌঁছবে। বড় কৃষক, ব্যবসায়ী, বেসরকারি সেক্টরে চাকরিরত, ছোট বা মাঝারি স্টার্টআপের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, স্বাধীন শিল্পী— কেউই বাদ যাবেন না তার মার থেকে। ততদিনে এ দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত ৩৯ কোটি মানুষ এবং তাঁদের আরও কয়েক কোটি পরিজনকে কি এই লকডাউন সুরক্ষিত রাখতে পারবে?
যারা রাষ্ট্রের হিসেব ধরতে পারে না, যারা হিসেবের বাইরে রাষ্ট্রেরও, করোনাই হোক বা অনাহার— তাদের মরা ছাড়া গতি কী?
(লেখক ফলতা সাধনচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।)