
শেষ আপডেট: 30 April 2023 04:43
আজ ৩০ এপ্রিল, রবিবার। আজ ‘মন কি বাত’ (Mann ki Baat) দিবস। উদ্যোগ-আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে ১৪২ কোটি ভারতবাসী আজ প্রধানমন্ত্রীর (Narendra Modi) এই রেডিও অনুষ্ঠানটি মনযোগ দিয়ে শুনে পবিত্র রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সাধন করবে, সরকারের এমনটাই প্রত্যাশা। আগামী বছর থেকে দিনটি ‘মন কি বাত’ দিবস হিসাবে পালিত হওয়ার ঘোষণা শোনা গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
ভুলো মন লোকেদের স্মরণ করিয়ে দিই, ২০১৯ থেকে এই দিনটি আয়ুষ্মান ভারত দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। সে বছর ছিল প্রধানমন্ত্রীর চালু করা প্রকল্পটির বর্ষপূর্তি। সেই তুলনায় ‘মন কি বাত’-এর আজ সেঞ্চুরি।

তাই রাজ্যপালেরা আজকের জন্য রাজভবন বাছাই করা লোকজনের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আমন্ত্রিতদের মধ্যে আছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখে উচ্চারিত ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানের ভাগ্যবান শ্রোতারা। ৯৯টি পর্বে প্রধানমন্ত্রী কোন রাজ্যের কী কী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং ব্যক্তির কথা তুলে ধরেছেন, দিল্লির কর্তারা তার তালিকা প্রকাশ করেছেন। আগের পর্বগুলিতে প্রধানমন্ত্রী মুখে নাম উচ্চারিত পাঁচশোজনের মধ্যে দেড়শোজনের উপস্থিতিতে তিনদিন আগে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান হয়ে গিয়েছে দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে। উদ্বোধন করেন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড় যিনি ‘মন কা বাত’-এর সব ক’টি পর্ব মন দিয়ে শুনেছেন, জানিয়েছেন সগর্বে।
তবে কোনও সন্দেহ নেই, সেই অনুষ্ঠানকে সবচেয়ে বেশি আলো দিয়েছেন আমির খান। সংখ্যালঘু পীড়ন এবং ঘৃণা ভাষণের বিরুদ্ধে মুখ খুলে একদা হিন্দুত্ববাদীদের কু-নজরে পড়ে দেশত্যাগী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করা অভিনেতার কথায়, ‘প্রধানমন্ত্রী সত্যিই দেশবাসীর মন জয় করতে পেরেছেন।’ আমির সেদিন বোবা-কালা হয়ে থাকলেও কিছু যেত আসত না। এখন তাঁর উপস্থিতিই সরকারের জন্য বড় সার্টিফিকেট।
প্রধানমন্ত্রীর এই হিন্দি অনুষ্ঠানটি এখন ২৩টি ভারতীয় ভাষা ২৯টি উপভাষায় প্রচারিত হয়। ‘মন কি বাত’-এর শততম পর্ব উপলক্ষ্যে আকাশবাণীর অভিভাবক প্রসারভারতী একটি সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেটি তৈরি করেছে রোহতকের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট। ১০ হাজার মানুষের সঙ্গে কথার ভিত্তিতে অঙ্ক কষে তারা দাবি করেছে, অন্তত একশো কোটি দেশবাসী ৯৯টি পর্বের কোনও না কোনওটি শুনেছেন। আইআইএম রোহতকের অধিকর্তা ধীরাজ শর্মার দাবি, ২৩ কোটি ভারতীয় নিয়মিত অনুষ্ঠানটি শোনেন এবং ৯৬ ভাগ দেশবাসী ‘মন কি বাত’-এর বিষয়ে অবহিত। তাঁর দাবি, সমীক্ষায় ৭৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৩০০ জন বলেছেন, দেশের প্রগতি, অগ্রগতি নিয়ে তারা আশাবাদী। অর্ধেকের বেশি জানিয়েছেন, তারা সরকারের কাজে বেশ সন্তুষ্ট।
গোল বেঁধেছে অন্যখানে। প্রধানমন্ত্রীর এই অনুষ্ঠান নিয়েই সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র উঠে এসেছে দিল্লির নামজাদা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটিজের (সিএসডিএস) গত নভেম্বরে প্রকাশিত রিপোর্টে। ‘মিডিয়া ইন ইন্ডিয়া: অ্যাক্সেস, প্র্যাকটিসেস, কনসার্নস অ্যান্ড এফেক্টস’ শীর্ষক রিপোর্টে তারা দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রীর এই বহুল প্রচারিত মাসিক অনুষ্ঠানটির নিয়মিত শ্রোতা বড়জোর পাঁচ শতাংশ মানুষ। বেশিরভাগ মাসেই শুনে থাকেন আরও পাঁচ শতাংশ। কোনও কোনও মাসে শুনেছেন এমন মানুষেরা সাত শতাংশের মতো। ২১ শতাংশ মানুষ এক বা দু’বার শুনেছেন। আর কোনও দিনই শোনেননি বাকি ৬২ শতাংশ।
খেয়াল রাখা দরকার, প্রধানমন্ত্রীর এই রেডিও অনুষ্ঠানটি ভারত সরকারের যাবতীয় মন্ত্রক ছাড়াও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির সরকারি প্রচারমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়। এছাড়াও বিজেপির জাতীয় এবং রাজ্য শাখার ইউটিউব, ফেসবুক তো আছেই। মাসের শেষ রবিবার আসার সাতদিন আগে থাকতে মোবাইল বার্তায় মনে করিয়ে দেওয়া হয়, আসছে রবিবার প্রধানমন্ত্রীর মনের কথা শোনার দিন। তারপরও দিল্লির সংস্থাটির রিপোর্টে ‘মন কি বাত’ সরকারের জন্য এমন মন খারাপ করা হতাশ চিত্র উঠে আসাটা আশ্চর্যের বৈকি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, সিএসডিএস-এর রিপোর্টকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কী আছে। কেন ধরে নেওয়া হবে ওই সংস্থার রিপোর্টই সঠিক? এই প্রসঙ্গে সঠিক-বেঠিক বিতর্কে না ঢুকেও জানিয়ে রাখা ভাল দিল্লির সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত। কারও কাজে লাগতে পারে, তাই এটাও জানিয়ে রাখি, ‘মন কি বাত’ আম আদমির মনের অন্তরতম স্পর্শ করেছে বলে যে সংস্থার সার্টিফেকেট নিয়ে দিল্লির অনুগত আমলাকূল উদ্বাহু নৃত্যে মেতেছেন, সেই আইআইএম রোহতকের অধিকর্তা ধীরাজ শর্মার বিরুদ্ধে খোদ দেশের শিক্ষামন্ত্রক ডিগ্রি জালিয়াতির মামলা ঠুকেছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা গোপন করে ওই পদে বসেছেন বলে আদালতে জানিয়েছে খোদ শিক্ষামন্ত্রক।
আরও একটি তথ্য জানিয়ে রাখা ভাল, বছর ছয়েক আগে ধীরাজকে ওই পদে নিয়োগপত্র দেওয়ার সময় দেশের ২২টি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউশনের অধিকর্তার পদে নিয়োগে সবুজ সংকেত দিত প্রধানমন্ত্রীর দফতর। আইআইএম রোহতকের সেই অধিকর্তা কতটা ক্ষমতাশালী তা বোঝা গিয়েছে, কারচুপি ধরা পড়ার পরও তাঁকে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষাসন থেকে অপসারণ করা হয়নি। উল্টে, দ্বিতীয়বার নিয়োগের আগে শিক্ষাগত যোগ্যতার মানটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার তদন্ত গুটিয়ে ফেললে আদালতের নির্দেশে ফের তা শুরু করতে হয়েছে। ফলে ‘মন কি বাত’ নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টটি মনগড়া, জল মেশানো এবং কারও মন রাখার চেষ্টা কি না সে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আলবাৎ আছে।
প্রধানমন্ত্রী হলেন সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি যাঁকে প্রশ্নটি করা যায়। প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে সে সুযোগও থাকে। অবশ্যই নির্বাচিত প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন তো একটি নয়। তাই ‘মন কি বাত’-এর প্রকৃত শ্রোতা, দর্শক কত, এই নিয়ে বিতর্ক অনর্থক। যদি ১৪২ কোটি ভারতবাসীই নিয়ম করে ‘মন কি বাত’ শুনতেন, তাহলেও বা দেশের কী আসত যেত?
বিজ্ঞান ভবনের অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, ‘মন কি বাত’-এর একটি পর্বেও প্রধানমন্ত্রী রাজনীতি টানেননি। কথাটি মিথ্যে নয়। আবার এর থেকে চরম মিথ্যাচারও কিছু হতে পারে না। দল ও নিজের স্বার্থে মনগড়া মনের কথা বলে প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিতে জনসংযোগের এক নয়া মডেল হাজির করেছেন। তিনি অনবরত বলবেন, মাঝে মাঝে ততটুকু শুনবেন যে কথায় প্রশ্ন নেই, কিন্তু প্রশংসা আছে ভরপুর।
আমির খান প্রধানমন্ত্রীর এই জনসংযোগ মডেলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কেমন সে মডেল? গত পরশু সুপ্রিম কোর্ট সব রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলগুলিকে বলেছে, ঘৃণা ভাষণ আটকাতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা রুজু করে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ যেন আর অভিযোগের অপেক্ষায় বসে না থাকে।
গত আট-নয় যে যে বিষয়ে দেশবাসীর কাছে শীর্ষ আদালতই শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে তার একটি হল ঘৃণা ভাষণ, যার তুমুল বর্ষণের মুখে দেশ ছাড়ার কথা ভাবতে হয়েছিল আমিরকে। সুপ্রিম কোর্ট বারে বারে তা নিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও ‘মন কি বাত’-এ সেই অস্থির পরিস্থিতির প্রতিফলন মেলেনি। তাঁর মন্ত্রীর ‘গোলি মারো শালোকো’ হুমকি প্রধানমন্ত্রীর কানে নিশ্চয়ই পৌঁছেছিল, কিন্তু ‘মন কি বাত’-এ তা নিয়ে আপত্তি, ক্ষোভের আভাস, সতর্কবার্তা মেলেনি। খাবার, পোশাকআশাক নিয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে সংখ্যালঘুর জীবন অতিষ্ঠ করে তোলার ঘটনায় স্বঘোষিত চৌকিদারের মনের কথা ‘মন কি বাত’-এ জানা যায়নি। কেউ বলতেই পারেন, নীরবতা সম্মতির লক্ষণ। ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ স্লোগান দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর দলের সাংসদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগে রাজধানীতে ধর্ণায় বসেছেন দেশের প্রথমসারির মহিলা কুস্তিগিররা। তাঁদের প্রতিবাদের মুখেও প্রধানমন্ত্রী নীরবতায় তাঁর আসল মন কি বাতই ফুটে উঠেছে।
এই এপ্রিলেই জনসংখ্যায় আমরা চিনকে ছাপিয়ে গেলাম। এই বিপুল জনসংখ্যাই বোঝা না হয়ে আমাদের সম্পদ হতে পারে, আর্থিকভাবেও আমরা চিনকে ছাপিয়ে যেতে পারি, যদি কর্মক্ষম সব হাতে কাজ দেওয়া যায়। সেই সংখ্যাটা ১১০ কোটি, মোট জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ, চিন-সহ পৃথিবীর কোনও দেশে যা নেই।
প্রধানমন্ত্রী সুযোগ পেলেই পণ্ডিতমশাইয়ের মতো জ্ঞান বিতরণ করে থাকেন। ‘পরীক্ষা পে চর্চা’ অনুষ্ঠানে জীবনে সফল হওয়ার মন্ত্র শোনান। সেই ছেলেমেয়েগুলি ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি এই ১১০ কোটির অংশ। কোটি কোটি বেকারের হাতে কাজ দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা সামনে নেই। নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে বেকারির হার বিগত ৪৫ বছরের মধ্যে রেকর্ড করেছে। অন্যদিকে, আর্থিক বিকাশ তলানিতে এসে ঠেকেছে। ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-দুটিই যে ফাঁকা আওয়াজ সেটা প্রমাণিত।
তবু সব ভুলে আজ শততম ‘মন কি বাত’ শোনার বাড়তি আগ্রহ নেওয়াই যেত যদি ৩৬৫টা দিনই পয়লা এপ্রিল হয়ে না উঠত। দেখুন, আজ ৩০ এপ্রিল অন্য অভিজ্ঞতা হয় কিনা।
কলকাতায় বৃষ্টি-ঝোড়ো হাওয়ার পার্টনারশিপ চলবে! ভিজবে গোটা বাংলা, ক্ষতি হবে শিলাবৃষ্টিতে