
শেষ আপডেট: 15 August 2023 13:29
প্রধানমন্ত্রীরা যখন সরকারের সাফল্যের খতিয়ান দেন, তখন সাধারণত একটু বাড়িয়ে বলেন। ব্যর্থতার দিকগুলি কমিয়ে বলেন। অথবা বলেনই না। কিন্তু ৭৭তম স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লা থেকে যে ভাষণ (Modi Independence Day Speech) দিলেন, তাতে বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। তাঁর কথা শুনে মনে হচ্ছে, দেশে সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে। ভারত এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির শিখরে। সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। যুবক-যুবতীদের জন্য চাকরির অভাব নেই। জঙ্গিরা শায়েস্তা হয়েছে। মানুষের মন থেকে জাতিবিদ্বেষ মুছে গিয়েছে। সর্বত্র শান্তি বিরাজ করছে।

নরেন্দ্র মোদী মঙ্গলবার দেশের যে উজ্জ্বল ছবিটা তুলে ধরতে চেয়েছেন, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। সেকথা দেশবাসী হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আগুন। বেগুনের কেজি ৮০ টাকা, টম্যাটো ১৫০ টাকা, লঙ্কা ১৮০ টাকা, কুমড়ো ৪০ টাকা। মোটামুটি মানের চালের কেজি ৪০-৫০ টাকা। গরিব মানুষ তো বটেই, মধ্যবিত্তেরও নাভিশ্বাস উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষুধার সূচকে ১২১টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৭ নম্বরে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল এমনকি প্রতিবেশী বাংলাদেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে ভারত। এই অবস্থায় মোদী গর্ব করে বলছেন, ভারতের অর্থনীতি এখন বিশ্বে পঞ্চম স্থানে। শীঘ্রই তা তিন নম্বরে পৌঁছে যাবে। মানুষের ক্ষুধাই যদি না মেটে তাহলে অর্থনীতি তিন নম্বরে পৌঁছলে মানুষের কী যাবে আসবে। কতগুলো শুকনো পরিসংখ্যান দিয়ে মোদী কি মানুষের খিদে মেটাতে পারবেন?

প্রধানমন্ত্রী বড় মুখ করে বলেছেন, যুবসমাজই ভারতের শক্তি। তাদের জন্যই ভারত একদিন হয়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু বাস্তব হল, যুবক-যুবতীদের বেশিরভাগ এখন হতাশাগ্রস্ত। হতাশা অকারণ নয়। দেশে চাকরি নেই। ব্লুমবার্গের হিসাবমতো গত জুলাইতে ভারতে বেকারত্বের হার ছিল ৭.৯৫ শতাংশ। তাছাড়া যুবসমাজের এক বড় অংশ খুব কম বেতনের চাকরি করে। অর্থাৎ তারা আন্ডার এমপ্লয়েড। বেশিরভাগ যুবক-যুবতী তাদের দক্ষতা বা মেধাকে ব্যবহার করার সুযোগই পায় না। এই পরিস্থিতিতে দেশের যুবশক্তি নিয়ে গর্ব করা অনেকের কানে পরিহাসের মতো শোনাবে।
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে সাধারণত প্রধানমন্ত্রীরা দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বক্তব্য পেশ করেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বলেন। কিন্তু মোদী এদিন সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির বাইরে যেতে পারেননি। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ফের বিজেপিই জিতবে। পরের বছর স্বাধীনতা দিবসেও তিনি লালকেল্লা থেকে ভাষণ দেবেন। কার্যত লালকেল্লা থেকে তিনি ভোটের প্রচারই শুরু করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণ অনভিপ্রেত।
মণিপুর প্রসঙ্গও এদিন মোদীর বক্তৃতায় স্থান পেয়েছে। তিনি বলেছেন, উত্তর পূর্বের ওই রাজ্যে মহিলাদের ওপরে নির্যাতন হয়েছে। কিন্তু এখন সেখানে শান্তি ফিরে এসেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে ভিডিওতে যে বীভৎস ছবি দেখা গিয়েছিল, সেকথা মনে রাখলে বলতে হবে, মোদী নিতান্তই আন্ডার স্টেটমেন্ট করেছেন। সেখানে মহিলাদের ওপরে যা ঘটেছে, তাকে শুধু ‘নির্যাতন’ বললে অনেক কমিয়ে বলা হয়।

মণিপুরে শান্তি ফিরে আসার কথাটাও পুরোপুরি সত্যি নয়। একথা ঠিক যে গত সপ্তাহখানেক সেখানে বড় আকারের মারদাঙ্গা বা খুনোখুনি হয়নি। কিন্তু সেখানে এখনও ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ত্রাণশিবিরে রয়েছেন। পাছে ফের আক্রান্ত হন সেই ভয়ে তাঁরা বাড়ি ফিরতে পারছেন না। অনেকের বাড়িই আর নেই। দাঙ্গাবাজরা পুড়িয়ে দিয়েছে। রাজ্যের কয়েকটি জনজাতি এখনও রাগে ফুঁসছে। রবিবার মণিপুরে মহিলাদের এক বিরাট মিছিল বেরিয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য, অমিত শাহ যেভাবে গোলমালের জন্য ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ দায়ী করেছেন, তা অন্যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কীভাবে বলতে পারেন, মণিপুরে শান্তি ফিরে এসেছে?
মনে হয়, মোদী দেশের মানুষকে বোকা ভাবেন। তাঁর ধারণা, কেউ কিছু বোঝে না। তিনি যা বলবেন লোকে তাই বিশ্বাস করবে। আসলে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে নেতাদের মধ্যে একপ্রকার আত্মসন্তুষ্টি আসে। স্তাবকরা তাঁদের ঘিরে ফেলে। তাঁরা বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। মোদীর ক্ষেত্রেও সম্ভবত তাই হয়েছে।

সরাসরি: লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী, ‘মণিপুরে শান্তিপূর্ণ ভাবেই সমাধানের পথ বেরোবে’