
শ্রমিক দিবস
শেষ আপডেট: 1 May 2024 15:00
অমল সরকার
বঙ্গোদয়, বঙ্গোদয়, বঙ্গোদয়। বাস কন্ডাক্টরের সেই হাঁক এখনও কানে বাজে। বিটি রোড আর সোদপুর স্টেশন রোডের সংযোগস্থলের জনপ্রিয় বাস স্টপটি এই নামেই মুখে মুখে ফিরত। বছর তিরিশ-পঁয়ত্রিশ হল সেই বাস স্টপের নাম বদলে হয়েছে পিয়ারলেস।
সরকার বা পুরসভা বাস স্টপের নাম বদল করেনি। বঙ্গোদয় কটন মিল যখন রমরমিয়ে চলত, দু’বেলায় তিন সিফটে হাজার চারেক শ্রমিকের আনাগোনা ছিল, তখন ওই নামই বাস স্টপের জন্য যথার্থ ছিল। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আরও বছর কুড়ি ওই নামেই পরিচিত ছিল বাস স্টপটি। বয়স্করা রবি ঠাকুরের হাতে কারখানা উদ্বোধনের গল্প শোনাতেন। সেই বঙ্গোদয় নাম বদলে গেল কারখানার জমিতে পিয়ারলেস আবাসন মাথা তোলার পর।
পশ্চিমবঙ্গে বাস স্টপ, হাট-বাজার, বসত এলাকার নাম বদলের এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে। যেমন বঙ্গোদয়ের ডাইনে-বাঁয়ে বাসন্তী আর বঙ্গশ্রী কটন মিলের কথাই ধরা যাক। বহুকাল বন্ধ (Locked Factories) বাসন্তীর নামটাই লোকমুখ থেকে হারিয়ে গিয়েছে। বাস স্টপটিরও নাম বদলে গিয়েছে অজান্তে। বহু বছর বন্ধ থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল কেমিক্যাল নতুন করে উৎপাদন শুরু করায় বাস স্টপের নামটি এখনও বদলে যায়নি। কিন্তু বঙ্গশ্রী বাস স্টপ হয়ে গিয়েছে ‘গোদরেজ প্রকৃতি’ অর্থাৎ গোদরেজ কোম্পানির আবাসন প্রকল্প।

সত্যি কথা বলতে কী, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’—গানের এই লাইনটি পশ্চিমঙ্গের শিল্প ও শ্রমিক জীবনের ক্ষেত্রে এতটাই ঘোর বাস্তব যে পুরনো সেই দিনের কথা মনে পড়লে মন খারাপ হয়। বছর কয়েক আগেও টালা ব্রিজের পর থেকে গোটা বিটি রোড, তারপর ব্যারাকপুর হয়ে কাঁচরাপাড়া পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে বড় গাছ আর কলকারখানা বলতে গেলে সমান সমান ছিল। কয়েক পা অন্তর কারখানার চিমনি নজরে আসত। সেই রাস্তা এখন বেশ চওড়া এবং ততোধিক ঝকঝকে বন্ধ কারখানার জমিতে কারখানা আবাসন গড়ে ওঠায়। কারখানা চালু থাকার দিনগুলিতে ব্যারাকপুর, হাওড়া, হুগলি, আসানসোল, দুর্গাপুর, খড়্গপুরে মানুষ দুর্গাপুজোর থেকেও বেশি আনন্দ-উৎসবে মাততেন বিশ্বকর্মা পুজোয়। প্রতিমা দর্শন, ভালমন্দ খাওয়ার পাশাপাশি বাড়তি আকর্ষণ ছিল কারখানার বিস্ময়ভরা অন্দরমহল চাক্ষুষ করা। তুলো থেকে সুতো, তা থেকে কাপড় তৈরির রহস্য উন্মোচনের সুযোগ মিলত।
বছর চল্লিশ আগে জ্যোতি বসু ও তাঁর পুত্র চন্দনের নাম জড়িয়ে এক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে একদা ভারত জোড়া ব্যবসা করা বেঙ্গল ল্যাম্পের নাম আলোচনায় এসেছিল। কারখানার জমি বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে চর্চায় এসেছিল বেণী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নাম। কিন্তু লোক চক্ষুর আডালে থাকতে থাকতে ন্যাশনাল ট্যানারি, ইস্টার্ন পেপার মিল, কোলে বিস্কুট, মেটাল বক্স ইত্যাদি রেল স্টেশন, বাস স্টপের মতো মানুষের মুখে মুখে ঘোরা কারখানাগুলি কোথায় হারিয়ে গেল!

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, চিকিৎসক নীলরতন সরকারের প্রেরণা ও উদ্যোগে ১৯০৫-এ গড়ে উঠেছিল ন্যাশনাল ট্যানারি। একটা সময় বাটা এবং ন্যাশনাল ট্যানারিতেই শুধু মেশিনে জুতো তৈরির ব্যবস্থা ছিল। বাটার অনেক নামী ব্র্যান্ডের জুতো তৈরি হত ন্যাশনাল ট্যানারিতেই। বহুচর্চিত মেটাল বক্সের অনেক কর্মচারী বকেয়া বেতন না পেয়ে শেষে আত্মহত্যা করেন।
পূর্ব কলকাতার নামজাদা প্রতিষ্ঠান কোলে বিস্কুটের মালিক গোষ্ঠীই কোলে স্টিল এবং নফরচাঁদ জুট মিলের মালিক ছিলেন। আইনি বিবাদে সেই কোম্পানি শিল্পের মানচিত্র থেকে মুছে গিয়েছে। পূর্ব কলকাতাতেই অধুনা ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের পশ্চিমপ্রান্তে পর পর মাথা তুলেছিল টায়ার কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া, বেঙ্গল পটারি, ন্যাশনাল ট্যানারি, ভারত ব্রেকস অ্যান্ড ভালবস, ইএমসি, শূর এনামেল, সায়েন্টিফিক ইন্ডিয়া গ্লাস কোম্পানি ইত্যাদি। দমদম-লেকটাউন-পাতিপুকুর এলাকায় একটা সময় মুখে মুখে ফিরত অ্যাপলো জিপার, অ্যামকো, হিন্দুস্থান আয়রন, সিদ্ধেশ্বরী হোসিয়ারি, জেসপ, ইস্টার্ন পেপার মিল, ইস্টার্ন পেপার মিল ইত্যাদি।
যাদবপুর-টালিগঞ্জ এলাকায় ছিল বিখ্যাত ঊষা পাখার নির্মাতা জয় ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষ্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরি, অন্নপূর্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরি এবং বেঙ্গল ল্যাম্প ও সুলেখা কালির কারখানা। বন্দর এলাকায় ছিল কেসোরাম কটন, সিদ্ধার্থ অ্যাপারেলস, অ্যাঞ্জেল ইন্ডিয়া, অ্যাভেরি, গ্ল্যাকসো, পোদ্দার প্রজেক্টস ইত্যাদি। গঙ্গার অপারে হাওড়া হুগলিতে, বিশেষ করে জিটি রোডের সঙ্গে বিটি রোডের চেহারার মিল ছিল দু-হাত অন্তর কারখানার সুবাদেই। রাজ্যের প্রথম এবং একমাত্র গাড়ি তৈরির কারখানা হিন্দ মোটরসের জমিতে অনেক আগেই আবাসন মাথা তুলেছে। জিটি রোডের দু’ধারের রাস্তাতেও কারখানার জমিতে মাথা তুলেছে বহুতল।
শিল্পের এমন মন্দায় শ্রমিকের পেটে লাথি পড়াই স্বাভাবিক। এ রাজ্য তার ব্যতিক্রম নয়। পরিসংখ্যান দিয়ে সরকার দাবি করে থাকে, রাজ্যে শিল্পে শান্তি বিরাজমান। শ্রমিক-মালিক বিবাদ নেই। লকআউট, ধর্মঘট নেই বললেই চলে। বাস্তব হল, এই নিস্তরঙ্গ পরিবেশ আসলে শ্মশানের শান্তি। কলকারখানাই যদি না থাকে তবে কোথায় শ্রমিকেরা ধর্মঘট ডাকবে, আর মালিক করবে লকআউট, লে অফ।

তবে স্বস্তির বিষয় হল কয়েক বছর যাবৎ চটকলগুলি মোটের উপর চালু আছে। বেশ কয়েকটা বন্ধ চা বাগানও খুলেছে। তবু প্রদীপের নিচে অন্ধকারটি বড় তীব্র। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইএসআইয়ের হাজার হাজার কোটি টাকা মালিকরা মেটায়নি। পাওনা না পাওয়া বুভুক্ষু শ্রমিকের আতর্নাদ চাপা পড়ে গিয়েছে কারখানার জমিতে বহুতল মাথা তোলার পর। পাওনা আদায়ে আন্দোলন, অবরোধও এখন বলতে গেলে অতীত। সবাই ধরে নিয়েছে, লড়াই-সংগ্রামে আর কাজ হবে না। বাস স্টপ কারখানার বদলে আবাসনের নামে পরিচিত হওয়াই যেন ভবিতব্য। আজ সোমবার মে ডে (May Day in Bengal) বাংলায় শিল্প মহলে বাস্তবিকই শ্মশানের শান্তি উদযাপন দিবস।