অরুণিমা পাল
(arunimapal175@gmail.com)
বেশ ভাল লাগছে এই বন্দিজীবন। নিজেকে নতুন করে খুঁজতে শুরু করছি। চারপাশটাও দেখছি নতুন করে শুরু করছে সবকিছু। চারিদিকটা বড় শান্ত লাগে। সকালে পাখিদের কলকাকলি শুনে মনে হচ্ছে, ওরাও উপভোগ করছে আমাদের এই বন্দিজীবন। ঠিকই তো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে আমরা তো চিরকালই ওদের অবহেলা করে গেছি।
ধর্মের বাড়াবাড়ি দেখে অভ্যস্ত আমরা আজ দেখছি সব ধর্মের উপাসনাস্থল তালাবন্ধ। মানুষের চোখে আজ শুধু ভয়। ‘শুধু ভয় করে দিল বিভেদহীন এক দেশ’। এটুকু যে জীবদ্দশায় দেখতে পাব, ভাবিনি।
মাছওলি, সবজিওলি রাস্তায় বের হচ্ছে পেটের তাগিদে। ওদের তো আর আমাদের মতো ঘরে বসে থাকলে চলে না। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই দেখছি সতর্কতা মানছেন। মানুষ যে দেরিতে হলেও বুঝছেন, এটাই অনেক।
রাস্তাঘাট বেশিরভাগ সময়ই ফাঁকা। মাঝেমধ্যে একটা-দুটো বাইক বা গাড়ি হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই নিস্তব্ধতা ভাল লাগছে। সকাল দশটার মধ্যে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা যে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, সেটাও মানুষ শিখছে।
সময় কাটাতে ঘরের কাজ করছি। লেখালিখি করছি, বই পড়ছি, আর ঘরের মানুষদের জন্য একটু সময় দিচ্ছি। যেটা এতদিন কাজের অজুহাতে দেওয়া হত না। বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইনে আড্ডা দেওয়াও চলছে মাঝেমাঝে। সব মিলিয়ে একটা দারুণ জীবন।
তবে এর মধ্যে কোথাও যেন একটা ভবিষ্যতের ভাবনা কুরে কুরে খাচ্ছে। জানি না কতটা কী ঠিক থাকবে! আমার দেশ, দেশের মানুষ কতটা ভাল থাকবেন ভবিষ্যতে, কিছুই জানি না। টিভি খুললেই সংখ্যাগুলো দেখে আঁতকে ওঠা ছাড়া আর কিছুই নেই আমাদের হাতে।
ওষুধ-টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই অপেক্ষা যেন শবরীর প্রতীক্ষা মনে হচ্ছে। তবু আশা-ভরসা রাখছি প্রকৃতির ওপরে আর আমাদের চিকিৎসা-গবেষক, বিজ্ঞানীদের ওপরে। তারা নিশ্চয়ই সফল হবেন। ভারতই পথ দেখাবে বিশ্বকে।

খাদ্যসংকট, আর্থিক সংকটের প্রহর গুনছি প্রায় সকলেই
দেবীমিতা বসু বেরা
(debimita.bera14@gmail.com)
নিশ্চিতভাবেই পজিটিভ আছি। কাজের চাপে হারিয়ে যাওয়া বা মুঠোফোনের বোতামে ব্যস্ত 'সেই আমি' আজ প্রশ্রয় দিচ্ছে 'সেই' ইচ্ছেগুলোকে, 'সেই' ভাল লাগাগুলোকে যেগুলো চাপা পড়ে ছিল ব্যস্ততার বহরে।
আজ অনেকদিন পর আকাশটাকে অনেক বেশি নীল লাগছিল...গাঢ় নীল। অনেকদিনের পর চৈতিরাতের নীলাকাশে ভেসে যাওয়া সাদা মেঘগুলোর বুক চিরে নক্ষত্রের চলন আর তারা খসা দেখলাম। নস্টালজিয়া ভর করল, কিছু চাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। ছোটকাল, ফেলে আসা দিন, পিছুটানে কী ভীষণ মায়া!
যখন লাখো লাখো শ্রমিকদের ঘরে ফেরার লড়াইয়ে করোনার প্রকোপ আরও প্রবল হওয়ার আশঙ্কায় প্রমাদ গুনছি, করোনা-যুদ্ধ পরবর্তী পর্বে চরম খাদ্যসংকট, আর্থিক সংকটের প্রহর গুনছি প্রায় সকলেই।
একই সময় সোশ্যাল সাইটে দেখতে পাচ্ছি, একশ্রেণির মানুষের পোস্টে বিরিয়ানি না পাওয়ার বিড়ম্বনা বা কপালজোড়া ভ্রূ-দ্বয়কে নিখুঁত আঁকতে না পারার বেদনার ইমোজি বা সুরাহীন শুকনো গলার হাহাকারের করুণ আর্তনাদ! কী বিচিত্র, কী ভয়ানক, শিউরে ওঠা সব আবদার! এ কোন সমাজের নাগরিক আমরা?
করোনার থাবায় বিপন্ন ‘বিশ্ব শ্রেষ্ঠ’ মানবজাতি। চার দেওয়ালের মধ্যে থাকাই আজ বাঁচার মূল অস্ত্র। ‘ভাল আছি’ বলব না। লকডাউনকে সমর্থন করছি ভাল থাকার জন্য, পরিজনদের করোনার ছোবল থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিতে হয়। জীবনের নানা মোড়ে আমরা সেই শিক্ষাই পেয়ে থাকি।
কবির কথায় তাই প্রার্থনা থাক, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’। প্রত্যাশা থাক, করোনা সংক্রমণকে রোধ করে সংক্রমিত হোক সাম্য, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, শ্রদ্ধাবোধ, মানবতা আর ভালবাসা।