সোমা ব্যানার্জি
soma.b512@gmail.com
করোনা আতঙ্কে, সরকারি আদেশে লকডাউনে। অবশ্য আজ সকালে ঘরের লক খুলে মাস্ক পরে হাত স্যানিটাইজ করে মেয়েকে নিয়ে বাজার করে এসেছি। ভাঁড়ার যে খালির দিকে। অন্তত খাওয়াটা তো চলুক। রিকশা করে ফিরছি যখন, তখন হঠাৎ সামনে পুলিশভ্যান থেকে নামলেন অফিসার। পেছনে বাইক আরোহী দুই তরুণ। ঘুরেফিরে দেখছিল লকডাউনের বাহার। পুলিশ দেখে পেছনের জন নিমেষে হাওয়া। চালক আমতা আমতা করে বলল, ‘মুরগির মাংস কিনতে যাচ্ছি স্যার।’ পুলিশ অফিসার বললেন, ‘কেএমসির বাইকে চড়ে মুরগির মাংস, না রাস্তায় ঘুরে রঙ্গ দেখা হচ্ছে?’ বলেই সপাটে চড় মারতে গেলেন।
জীবনের অভিজ্ঞতা বটে! চব্বিশ ঘণ্টা বাড়ির চৌহদ্দিতে। সময়ে রান্না, টিফিন, বাড়ি পরিষ্কার, দুপুরে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া। এ তো গেল গতানুগতিক। সবাই করছে, সারা পশ্চিমবঙ্গবাসী তথা ভারতবাসী, মায় বিশ্ববাসী। এ কি আমার একা সমস্যা? সবার। তার সঙ্গে জল্পনা-কল্পনা, Covid 19-এর বিস্তৃতি, সংক্রমণ, মৃত্যুসংখ্যা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা, রাজ্য ও রাষ্ট্রের পালনীয় কর্তব্য নিয়ে আলোচনা।
মরমে মরে যাই, যখন দেখি নীচুতলার দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর ভোগান্তি। ওবেলা মুখে কী তুলবে, সেই চিন্তায় ক্লিষ্ট মুখগুলো। কর্মহীনতা, রুটিরুজির টান, সংসারের ভরণপোষণ তাদের বদ্ধ, স্বল্প পরিসরের ঘরে আটকাতে পারছে না। বিভিন্ন জায়গায় তাই সম্ভবত লকডাউন ফেলিওর। প্রাণহানির শঙ্কাও প্রাণে ভয় আনে না।
সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া এই মারাত্মক অজানা ভাইরাস মানবসভ্যতাকে এক চরম প্রশ্নের সামনে এনে ফেলেছে। বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাগারগুলোতে চলছে পরীক্ষানিরীক্ষা, করোনাকে প্রতিহত করার লড়াই। হাসপাতালগুলোতে চলছে মারণরোগের হাত থেকে বাঁচার সংগ্রাম। অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে আপামর স্বাস্থ্যকর্মীর কী ভীষণ যুদ্ধ! যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সমগ্র মানবজাতিকে সচেতন করার আপ্রাণ প্রয়াস।
আমার আবেগ আমায় সামান্য কর্তব্য সচেতন করল। আমি ও পরিবার (স্বামী ও মেয়ে) ঠিক করলাম, পাড়ার পরিচিত কয়েকজন রিকশাচালকের পাশে থাকব। মেয়ে তার স্বল্পসঞ্চয়ের বাক্স থেকে, আমি আমার উপার্জন থেকে সামান্য অর্থ তুলে দিলাম তাদের হাতে। এ কাজ কিছু নয়, একচিমটে সামাজিক দায়িত্ব নেওয়া। ওদের কাছে টেনে নেওয়ার প্রচেষ্টা। মনোবল বাড়াতে ঘরবন্দি মেয়ে আমার গাইল, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা।’ রবি কবি যে সবেতেই আমাদের সহায়। আমি ভিডিও করে সোশাল মিডিয়াতে ছাড়লাম গানটা।
যা করছি না তা হল, চিকিৎসক স্বামীর সঙ্গে এখন কোনও ঝগড়াঝাটি নয়, কারণ দেশের প্রাণভোমরা যে এখন তাদেরই হাতে। নানা খাবারের পদের ছবি সোশাল মিডিয়াতে ছাড়ছি না। যারা এই স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের জন্য মনটা খারাপ হয়ে আছে।
ঘরবন্দি অখণ্ড অবসরে পড়লাম কিছু বই। দক্ষিণের বারান্দা (মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়), কাদম্বরীর সুইসাইড সোট, মল্লিকা সেনগুপ্তর গদ্যসমগ্র আর পূর্বপশ্চিম (পুনর্পঠিত)। করোনাকে দূরে রাখতে এই করে চলেছি এ যাবৎ।
এখন শুধু অপেক্ষা; ছকে বাঁধা জীবনে ফেরার
জয়দীপ গাঙ্গুলী
(joydeepganguly29@gmail.com)
পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে চলতে বদলে যাচ্ছি। দিনের অধিকাংশ সময়ই যেখানে সহযাত্রী, সহকর্মী, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি, কথায়, আড্ডায় কাটত, সেখানে আজ সমস্ত চিন্তা জুড়ে শুধু একটি ভাইরাস। প্রথম দিককার রাত্রিগুলো কাটছিল হয় বিনিদ্র, নয় দুঃস্বপ্নময়। তারপর নিজের মনকে বুঝিয়ে, গুছিয়ে এখন আগের থেকে বেশ ভাল। বাড়ির টুকিটাকি কাজ, মেয়ের সঙ্গে খেলা, পড়ন্ত বিকেলে ছাদে আড্ডা আর রাতের আকাশে শুকতারা, সপ্তর্ষিমণ্ডল খোঁজা-- চোখ যেন ফিরে দেখছে অনেক আগের হারিয়ে যাওয়া সময়।
কষ্ট, উদ্বেগ, আশা, আনন্দ মিলেমিশে গেছে, যাচ্ছে বারবার; সে রাস্তাঘাটে মানুষজনের আড্ডাই হোক বা আনন্দ বিহার টার্মিনালে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিড়ই হোক। আবার কোনও দেশের ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়ালই হোক বা আমার দেশে একসঙ্গে একসময়ে মোমবাতি জ্বালানোই হোক। তর্কবিতর্ক আপনাদের ব্যাপার; আমি কোনও বিশেষজ্ঞও নই, না কোনও বুদ্ধিজীবী। শুধু এইটুকুই জানি যে, আমি-আপনি, নিজামুদ্দিন, পরিযায়ী শ্রমিক, দেশের প্রান্তিক মানুষজন, মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী সবাই 'ভারতবর্ষ'। অস্বীকার করার উপায় নেই, 'ভারতবর্ষ' নিজের মতন করে ভাবতে শুরু করেছে।
এখন শুধু অপেক্ষা; ছকে বাঁধা জীবনে ফেরার অপেক্ষা, ভিডিও কলের বাইরে কাছের মানুষগুলোকে স্পর্শ করার অপেক্ষা, বন্ধুদের সঙ্গে উল্লাসের অপেক্ষা, মসজিদগোড়ায় চাচার দোকানে চা-বিস্কুট নিয়ে গল্পে মাত হওয়ার অপেক্ষা, সহযাত্রীদের পেছনে লাগার অপেক্ষা... এরকম প্রচুর অপেক্ষা এখন আমার ভাবনায়।
আমরা যে 'নশ্বর', এইটুকুও উপলব্ধি যদি এই ভাইরাসের দৌলতে সবার হয়, তাহলেই মঙ্গল। ভালবাসা আর সংযমই ফিরিয়ে দিতে পারে দেশের সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন। তাই দেশের এই বিপর্যয়ে সাধ্যমতো সামিল হোন, সাহায্য করুন আর নিজেকে খুঁজুন নিজের মধ্যে আর অপেক্ষা করুন সুস্থ জীবনের।