
শেষ আপডেট: 13 December 2022 14:20
'স্টেবল বাট আনপ্রেডিকটেবল'। গত নভেম্বরে চিন সীমান্ত নিয়ে এই মন্তব্য করেছিলেন সেনাপ্রধান মনোজ পাণ্ডে। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বরাবর পরিস্থিতি আপাতত স্থিতিশীল। কিন্তু চিনারা কখন কী করবে কিছুই বলা যায় না। তাঁর কথা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে (India China Clash)।
গত ৯ ডিসেম্বর সকালে পিপলস লিবারেশন আর্মির তিন-চারশো সৈনিক অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াংয়ে ঢুকে পড়ে। ভারতীয় সেনার সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। সেনা সূত্রের খবর, চিনারা 'পুরোদস্তুর প্রস্তুতি' নিয়েই ঢুকেছিল। কিন্তু ভারতীয় সেনাও যে তাদের মোকাবিলা করার জন্য তৈরি থাকবে তা ভাবতে পারেনি। দু'পক্ষের হাতাহাতি হয়েছে। শেষপর্যন্ত প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে চিনারা।

অরুণাচলের ঘটনা নিয়ে মঙ্গলবার বিরোধীরা সংসদে সরকারকে চেপে ধরেছিলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, চিনাদের 'দৃঢ়ভাবে' প্রতিরোধ করা হয়েছে। কোনও ভারতীয় সৈনিক নিহত হননি। তাঁদের কারও আঘাতও গুরুতর নয়।
চিনের দাবি, অরুণাচল প্রদেশ দক্ষিণ তিব্বতের অংশ। সুতরাং ওই জায়গাটা তাঁদের। কিন্তু প্রশ্ন হল, তিব্বত কি আদৌ চিনের অংশ। এই বিতর্কের মীমাংসা আজও হয়নি। ১৯৪৯ সালে চিনে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করে। তখনও পর্যন্ত তিব্বত ছিল হিমালয়ের ওপরে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট একটি দেশ। সেখানকার শাসক ছিলেন দলাই লামা। তিব্বতীরা তাঁকে ভগবানের মতো ভক্তিশ্রদ্ধা করত।
পাঁচের দশকের শুরু থেকেই চিন সরকার তিব্বতের ওপরে নজর দিতে থাকে। একসময় পিপলস লিবারেশন আর্মি সেই দেশে ঢুকে পড়ে। তার পরে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন সরকার ক্রমশ তিব্বতের প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামো আমূল বদলে দিতে চেষ্টা করে। তাতে তিব্বতীদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়। ১৯৫৯ সালে তারা চিনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করে। কথিত আছে, অভ্যুত্থানের পিছনে আমেরিকার মদত ছিল।
চিন সরকার নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে। তারা দলাই লামাকেও বন্দি করতে চেয়েছিল। কিন্তু দলাই লামা ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে আসেন। পাহাড় ও অরণ্যের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পৌছান ভারতে। তৎকালীন নেহরু সরকার তাঁকে আশ্রয় দেয়। সেই থেকে ভারতের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। তিব্বতীদের অনেকে আজও বিশ্বাস করেন, তাঁদের দেশ একদিন চিনের কবল থেকে মুক্তি পাবে। দলাই লামা ফের লাসায় পোতালা রাজপ্রাসাদে ফিরে আসবেন।
তিব্বতের ওপরেই চিনের দাবি এখনও আন্তর্জাতিক মহলে সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি। এর মধ্যে চিন আবার তিব্বতের অংশ হিসাবে ভারতের জমি দখল করতে চাইছে। সেজন্য তারা আগেও চেষ্টা করেছে। বর্তমানে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বরাবর কী ঘটছে তা এখনও দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার নয়। ৯ ডিসেম্বর অরুণাচল সংঘর্ষ হল, কিন্তু দেশের মানুষ জানতে পারল চারদিন পরে। কেন এমন হবে? চিন সীমান্ত নিয়ে সরকারের অবস্থান অবিলম্বে স্পষ্ট করে বলা উচিত। সীমান্তে নজরদারির কাজে ড্রোন ব্যবহার করা হয়। সেই ড্রোনের ছবিও সাধারণ দেশবাসীকে দেখানো প্রয়োজন। তাহলে সবাই বুঝতে পারবে তাওয়াং-এর ইয়াংৎসে অঞ্চলে ঠিক কী ঘটেছিল।
এর আগে ২০২০ সালের ১৫ জুন লাদাখের গালওয়ানে চিনাদের সঙ্গে আর একদফা সংঘর্ষ হয়। ২০ জন ভারতীয় সৈনিক নিহত হন। তারপরে বহুবার দুই দেশের সেনাকর্তারা বৈঠকে বসেছেন। সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও চিনারা সংযত হয়নি। মনে হয়, তারা তাওয়াং-এ সেনা ঢুকিয়ে পরখ করতে চেয়েছিল, ভারতীয় সেনা কতদূর প্রস্তুত আছে। সামান্য সুযোগ পেলেই পিএলএ-র আরও সৈনিক হু হু করে ঢুকে পড়ত।
বর্তমানে সীমান্তে গুরুতর বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে চিন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, সীমান্তে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর তৎপরতা নিয়ে যত আলোচনা হয়, চিনাদের নিয়ে তা হয় না। কোনও অজ্ঞাত কারণে সরকার এব্যাপারে দেশবাসীকে বেশি কিছু জানাতে চায় না। ফলে বিরোধীরা রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে যায়।
রাহুল গান্ধী প্রায়ই বলেন, লাদাখে চিনারা জমি দখল করে রেখেছে, অরুণাচলে জমি দখল করে রেখেছে। কীসের ভিত্তিতে তিনি ওই কথা বলেন তা স্পষ্ট নয়। চিনা অনুপ্রবেশ নিয়ে যদি বিরোধীদের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য থাকে তাহলে তাঁরা প্রকাশ করুন। কিন্তু এই নিয়ে সস্তা রাজনীতি করা উচিত নয়।