
যুদ্ধ যেভাবে পরিবেশকে প্রাণঘাতী করে তুলছে
শেষ আপডেট: 5 June 2024 14:13
‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক দিবস। ১৯৭২ সালের স্টকহোম সম্মেলনের পর জাতিপুঞ্জের ইউনাইটেড নেশনস্ এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম-এর নেতৃত্বে ১৯৭৩ সাল থেকে এই দিবস প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের রাষ্ট্রসংঘের পরিবেশ বার্তা—‘আমাদের ভূমি, আমাদের ভবিষ্যৎ’।
এই পরিবেশ বার্তাগুলি ভাল করে লক্ষ করলে দেখা যায়, একই পরিবেশ বার্তা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরিবেশ সংকটের গভীরতার বিচারে একাধিকবার এসেছে। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ জাতিপুঞ্জের কাছ থেকে আজ অবধি
৫১টি পরিবেশ বার্তা পেলেও বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বা সন্ত্রাস বন্ধ করার কোনও বার্তা পায়নি। অথচ কে না জানে যুদ্ধে বা সন্ত্রাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ! এ বছর চন্দননগর পরিবেশ আকাদেমির তরফ থেকে জাতিপুঞ্জের কাছে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বিশ্ববাসীকে এক বার্তা দেবার আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু জাতিপুঞ্জ সে কথায় কান দেয়নি। কারণ পৃথিবীর শক্তিশালী দেশগুলি যুদ্ধ করে। এরাই এই গ্রহটির ওপর সুকৌশলে তাদের আধিপত্য কায়েম করতে চায়। জাতিপুঞ্জকেও তাদের মতো করে কথা বলতে বাধ্য করে। জাতিপুঞ্জ এদের হাতে খাঁচাবন্দি তোতা।
মানুষের ইতিহাসের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়েই রয়েছে সন্ত্রাস, যুদ্ধ ও আধিপত্যবাদ কায়েম। পৃথিবীতে মানুষ যেদিন অন্যান্য প্রাণীদের ওপর প্রভুত্ব করতে সফল হয়েছিল, তা-ও এসেছিল শক্তিশালী প্রাণীদের সঙ্গে লড়াই করে। তা সে লড়াই শক্তিরই হোক বা বুদ্ধির। সময় বদলেছে। মানুষ বর্তমানে প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রাণী ছাড়াও নিজেদের মধ্যেই সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিপর্যয়-- যুদ্ধ। ইতিহাস বলে, মানুষ বিগত প্রায় ৩০০০ বছর ধরে সশস্ত্র যুদ্ধ করছে। এর মধ্যে মাত্র ৩০০ বছর সশস্ত্র যুদ্ধ হয়নি। যুদ্ধ মাত্রই এক নিষ্ঠুর, অনৈতিক ব্যাপার। এটি একপ্রকার সন্ত্রাস।
উত্তর-আধুনিক কালের আতঙ্কবাদের উদ্দেশ্য হল এক ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে তাকে মানুষের সামাজিক, মানসিক ও রাজনৈতিক জগতে জিইয়ে রাখা। বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর এমন এক পুনর্বিন্যাস ঘটানো, যাতে আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কবাদী রাষ্ট্রে পুঁজিবাদের বুনিয়াদ আরও মজবুত হয়। সাধারণ নিরীহ মানুষই এদের আক্রমণের লক্ষ্য, যাতে জনজীবনে ভয়ের এক আবহ সৃষ্টি হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।
এখানে একটি জরুরি কথা বলা দরকার, বিশ্বায়নের প্রযুক্তিগত সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়েই আতঙ্কবাদীরা সারা পৃথিবীজুড়ে এক শক্তিশালী জাল বিছিয়েছে। এখন এরা এতটাই শক্তি ধরে যে, পৃথিবীর কোনও একটি রাষ্ট্রের পক্ষে এদের মোকাবিলা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাদের ধর্মই হল সনাতন সকল কিছু ভেঙে মানুষকে তার শিকড় থেকে উপড়ে এনে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। আজ আবিশ্ব আতঙ্কবাদীরা পুঁজিবাদের এই কাজটিই করার চেষ্টায় রত।
নিউ মেক্সিকো-র মরুভূমিতে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই সকাল সাড়ে পাঁচটায় পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে আতঙ্কবাদের এক নতুন চেহারা দেখা গেল। আর এর ঠিক ২১ দিনের মাথায় ৬ অগাস্ট সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে মার্কিন বিমান বি-২৯ এনোলা গে-র দরজা খুলে পরমাণু বোমা ‘লিটল বয়’ ফেলা হল জাপান-এর হিরোসিমা-য়। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষার বিভিন্ন পর্বে তেজস্ক্রিয়তার ফলে মানুষ সহ নানান জীবপ্রজাতির মারাত্মক স্বাস্থ্যসংকট দেখা দেয়। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্র মজুত ও তা পরীক্ষার সময়ে পরিবেশে ব্যাপকভাবে এর তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলে বিপর্যস্ত হয় বাস্তুতন্ত্র।
যুদ্ধের পরিণামে পৃথিবীর পরিবেশ ও প্রাণীজগৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ কথা ঠিক। কিন্তু বার-বার যুদ্ধের প্রস্তুতি, যুদ্ধের মহড়ায় তা বিপর্যস্ত হয় আরও বেশি। আর এই না-হওয়া যুদ্ধের বিপদটাই আরও বেশি। কারণ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর ক্ষয়ক্ষতির কোনও হিসেব কষা হয় না।
ঠিক দু’দশক আগে ২০০৪ সালের নভেম্বরে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে ফালুজা-য় মার্কিন সেনা ব্যবহার করেছিল ফসফরাস গোলা। এই গোলা যেখানে ফেলা হয়, তার দেড়শো মিটারের মধ্যে সকল প্রাণীর বিনাশ ঘটে। ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয় জীববৈচিত্র্য। পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর যুদ্ধের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের দিকটি মানুষ বিগত ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের আগে বড় একটা তলিয়ে দেখেনি। এই যুদ্ধে ইরাক পারস্য উপসাগরের জলে প্রায় এক কোটি ব্যারেল কুয়েতি তেল ঢেলে দিয়েছিল।
১৯ জানুয়ারি, ১৯৯১ সালে মিনা-আল-আহমাদি অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজে পাঁচটি প্রচণ্ড জোরালো বোমা বিস্ফোরণে চতুর্দিক তেলে ডুবে গিয়েছিল। ওই দিনেই কুয়েত-এ তেলের পাইপ লাইনও বোমার আঘাতে ভেঙে যাওয়ায় দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রায় ১৫০০ বর্গ কিলোমিটারের বেশি অঞ্চলজুড়ে এই দু’টি ঘটনায় তেল ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় ওই একই সময়ে ইরাকের মিনা আল-বক্স তৈলক্ষেত্রেও তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। এর ফলে ভয়ানক বিপর্যস্ত হয়েছিল সেখানকার জলজ বাস্তুতন্ত্র। সকল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সারা শরীরে তেল মাখা এক বিপন্ন পানকৌড়ি পাখির অসহায়তার ছবি আজও আমাদের কষ্ট দেয়।
উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাক ইচ্ছা করে কুয়েত-এর ৭৩২টি তৈলকূপ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তৈলকূপের দহনে ঘন ধোঁয়ায় ভয়াবহ বায়ুদূষণ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। আকাশ থেকে অম্লবৃষ্টি হয়েছিল। তৈলকূপের দহনজাত ধোঁয়ায় থাকে নানাপ্রকার বিষাক্ত পদার্থ, যেমন- কার্বন মনোক্সাইড, না-পোড়া হাইড্রোকার্বন, পলি অ্যারোম্যাটিক হাইড্রোকার্বন, পলিক্লোরিনেটেড ডাইবেনজো ডায়োক্সিন, ফিউরান, কার্বন ঝুল, সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, রেডন এবং কার্বন ডাই অক্সাইড। এদের মধ্যে প্রথম দুটি পদার্থের সংস্পর্শে অল্প সময়ের জন্য থাকলেও তার পরিণাম প্রাণঘাতী হতে পারে। কার্বন ঝুল এবং পলি অ্যারোম্যাটিক হাইড্রোকার্বনের প্রভাবে ক্যানসার রোগ ঘটতে পারে।
বিপক্ষ সেনাকে ছত্রখান করতে মাটিতে ভূমিবোমা পুঁতে রাখা হয়। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে ইওরোপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়াজুড়ে পুঁতে রাখা অনেক সক্রিয় ভূমিবোমার খোঁজ মিলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন মহাদেশে ভূমিবোমা ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। লিবিয়া-র এক-তৃতীয়াংশ স্থলভাগই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের না-ফাটা গোলাবারুদ ও ভূমিবোমায় ভর্তি।
এসব ভূমিবোমা ফাটলে শুধু যে মানুষ ও পশুপাখি মারা পড়বে তা নয়, বিপর্যস্ত হবে সেখানকার মাটির স্তর, ব্যাহত হবে নদীপ্রবাহ, বিপন্ন হবে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র। ভূমিবোমার হাত থেকে বাঁচতে মানুষ নিজের জায়গা ছেড়ে অনেক সময় প্রান্তিক অঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে জীবনধারণের জন্য সেই প্রান্তিক পরিবেশের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের ওপরেই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে ক্রমশ বিপন্ন হয় সেখানকার জীববৈচিত্র্য। সামরিক বাহিনীর নানান কার্যকলাপ, যেমন- সেনা যাতায়াত, বিমান থেকে বোমা ফেলা, সেনাবাহিনীর নানারকম ভারী যানবাহন ও সাঁজোয়া গাড়ি চলাচলের ফলে মাটির নিচের জমাটবদ্ধ স্তর ভেঙে যায়, মাটির ওপরের স্তর আলগা হয়ে পড়ে এবং বহু গাছপালা ধ্বংস হয়। এর ফলে মাটির ক্ষয় বাড়ে। এটিই চরম বিস্ময়ের যে, ২০২৪ সালের পরিবেশ দিবসের বিষয় ‘ভূমি পুনরুদ্ধার’ হলেও যুদ্ধজনিত ভূমিক্ষয়ের ব্যাপারে জাতিপুঞ্জের মুখে কুলুপ।
সম্প্রতি আমরা রাশিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখেছি। এই যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে নাকি আপাত-বিরতি, তা এখনও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। এখন রোজ সকালে সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে দেখা যায় ইজরায়েল এবং প্যালেস্টাইন-এর মধ্যে এক মারণযজ্ঞ চলছে। এই যুদ্ধে রোজই গুঁড়িয়ে যাচ্ছে নার্সারি স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, ঐতিহ্যময় স্থান সবই। বিধ্বংসী সব গোলাবারুদ আছড়ে পড়ছে শক্তিকেন্দ্র, জল-সরবরাহ কেন্দ্র, বাঁধ, জনস্বাস্থ্য পরিষেবাকেন্দ্র, জনবহুল নানান এলাকা ও বাজারে। জল-সরবরাহ কেন্দ্রগুলি ধ্বংস হওয়ায় পানীয় জলে টান পড়ছে। হাসপাতালগুলিতে দেখা দিচ্ছে প্রচণ্ড জলকষ্ট। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরিষেবা জলসংকটে বাধা পাওয়ায় দূষণের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। জনবহুল এলাকাতে চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের চিকিৎসাবর্জ্য, খাদ্যবর্জ্য এবং বিশেষ করে বোমায় ভেঙে পড়া বাড়িঘরদোরের টুকরো। ধোঁয়া-ধুলোয় ক্রমশ বিষিয়ে উঠছে বায়ু।
১৯৮৭ সালে মজবুত উন্নয়ন নিয়ে ব্রান্টল্যান্ড কমিশন ‘আওয়ার কমন ফিউচার’ নামে এক প্রতিবেদন পেশ করে। পৃথিবীর উত্তরের এবং দক্ষিণের ধনী ও গরিব দেশের পরিকাঠামোগত অসাম্যের কথা এখানে পরিষ্কার বলা আছে। সেই প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে যে, বিশ্ব পরিবেশের পক্ষে যে কোন প্রকার পরমাণু যুদ্ধ বা সমরবাদ বিপজ্জনক।
ব্রান্টল্যান্ড প্রতিবেদনে পরিষ্কার বলা হয়েছে, যুদ্ধের বদলে দেশের নিরাপত্তার কথা ভেবে আন্তর্জাতিক চুক্তি হোক। অস্ত্রের বোঝা কমানো হোক। বিভিন্ন জাতীয় সরকার অস্ত্রের উৎপাদন, আমদানি ও রপ্তানিতে উৎসাহ দেওয়া বন্ধ করুক।
পৃথিবীর পরিবেশ যুদ্ধের প্রস্তুতি, যুদ্ধের মহড়া এবং যুদ্ধের পরিণামে বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে। যুদ্ধনীতির অঙ্গ হিসেবে একে ধ্বংস করা হয়েছে। যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে একে ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও যুদ্ধের সঙ্গে পরিবেশের নিবিড় যোগাযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকেছে। টাকার অঙ্কে যুদ্ধের ফলে পরিবেশ ধ্বংসের মূল্য যে কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের থেকে অনেক বেশি। তবুও এই জরুরি বিষয়টিই চরম উপেক্ষিত।
যুদ্ধের কুপ্রভাব যে নির্দিষ্ট কোনও ভৌগোলিক সীমায় আটকে থাকে না, দেরিতে হলেও এ ব্যাপারে বিশ্বজোড়া সচেতনতা বাড়ছে। আমাদের প্রত্যেককে বুঝতে হবে যে, যুদ্ধের প্রভাবে পরিবেশ বিপর্যস্ত হওয়ায় আমরা কোনও না কোনও প্রকারে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত। আগামী দিনের যুদ্ধজনিত আরও বড় বিপর্যয়কে তাই যে কোনও মূল্যে ঠেকাতেই হবে। কবির সুরে সুর মিলিয়ে, আসুন, পৃথিবীর সকল শান্তিকামী মানুষ আমরা প্রত্যেকেই শপথ নিই*
‘যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সেই কেড়েছে ভয়,
আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।
হিংসাজয়ী যুদ্ধে যাব, আর হবে না ভুল
মেখলা-পরা বোন দিয়েছে একখানা তাম্বুল।’
ঋণ স্বীকার- বিহান, বইমেলা সংখ্যা, ২০০৬।
লেখকেরা পরিবেশ ও সমাজকর্মী