
শেষ আপডেট: 24 April 2020 10:39
চিনের এমন ঘটনার পর জানা যায় যে, এথেন্স এবং স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুকাল পরেই, প্রায় ৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, একটি পাঁচ বছর ব্যাপী মহামারী এথেন্সের মানুষকে বিধ্বস্ত করেছিল। কারও কারও অনুমান মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ। স্পার্টার সেনাবাহিনী বেশি শক্তিশালী ছিল এবং এথেনিয়ানদের তাদের শহরে সুরক্ষিত ‘দীর্ঘ প্রাচীর’ নামে একটি ধারাবাহিক দুর্গের পিছনে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল। মহামারীটি সত্ত্বেও, যুদ্ধ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৪০৪ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, অবশেষে এথেন্স স্পার্টার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই মহামারী গ্রিসের মধ্যে এথেন্সের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্খলন ঘটায়। ফলত মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষের কাজকর্মে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছিল, ধর্ম হারিয়েছিল জনগণের আস্থা। নাগরিকদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের বিশাল পরিবর্তন ঘটেছিল কারণ ধনীদের মৃত্যুর কারণে তাদের দূরসম্পর্কের গরিব আত্মীয়রা কিংবা প্রতিবেশী গরিবরা সেই সম্পত্তি দখল করে নিয়েছিল। মহামারীর ফলে সামাজিক সাম্য কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে অনুমান ঐতিহাসিকদের।
পরবর্তীকালে রোমান সাম্রাজ্যের সূর্য কখনও অস্তমিত হত না সেখানেও দেখা গেল মহামারীর থাবা। রোমান সৈন্যরা যখন যুদ্ধশেষে সাম্রাজ্যে ফিরে আসে, তারা বিজয়ের লুণ্ঠনের সঙ্গে যেটা নিয়ে আসল সেটা হল রোগ। ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রোমান ইতিহাসের সিনিয়র গবেষক এপ্রিল পুডসে লিখেছিলেন, অ্যান্টোনাইন প্লেগ, সেনাবাহিনীকে নষ্ট করেছিল এবং রোমান সাম্রাজ্যের ৫০ লক্ষের বেশি লোককে হত্যা করেছিল। (‘প্রাচীনতার অক্ষমতা’, রাউটলেজ, ২০১৭)।
এই মহামারীটি পুরো রোমান সাম্রাজ্য জুড়ে মারাত্মক সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব ফেলেছিল। এই মহামারীর ফলে রোমান সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি কমে যায়, কৃষি ও নগর অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, এবং রাজ্যের অর্থভাণ্ডার প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে। অ্যান্টোনাইন প্লেগ প্রাচীন রোমান ঐতিহ্যগুলিকে প্রভাবিত করেছিল, এছাড়াও রোমানদের শৈল্পিক প্রকাশের ওপর একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল; আধ্যাত্মিকতা এবং ধর্মীয়ভাবনাকে নবজীবন দান করেছিল। এই ঘটনাগুলি মিথুত্রবাদ এবং খ্রিস্টধর্মের মতো একেশ্বরবাদী ধর্মগুলির প্রসারের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। এই সময়কালে, স্বাস্থ্য, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের ফলে পার্শ্ববর্তী বর্বর উপজাতির সাম্রাজ্যে অনুপ্রবেশ ঘটে এবং রোমান সেনাবাহিনীতে বর্বর সৈন্যদের নিয়োগের পথ সুগম করে; এই ঘটনাগুলি বিশেষত ওই জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বৃদ্ধির পক্ষে কাজ করে। অ্যান্টোনাইন প্লেগ সম্ভবত রোম সাম্রাজ্যের পতনের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
এরপর এল জাস্টিনিয়ান প্লেগ। প্লেগটির নাম বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের (৫২৭-৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ) নামানুসারে করা হয়েছে। তাঁর শাসনামলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সর্বাধিক সীমাতে পৌঁছেছিল। মিশর হয়ে ফিলিস্তিন ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই মহামারী। পরে পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই প্লেগ তাণ্ডব চালায়। সম্রাট জাস্টিনিয়ান ওই সময় রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাইজেন্টাইনকে একীভূত করার পরিকল্পনা করছিলেন। মহামারীতে সব ভেস্তে যায়। শুরু হয় অর্থনৈতিক সংকট। হাজার হাজার যুবকের মৃত্যু সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি হ্রাস করে, হাজার হাজার কৃষকদের মৃত্যু শস্য উৎপাদনে হ্রাস ঘটায় পরবর্তীতে দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে, ধ্বংস করে সাম্রাজ্যের কাঠামো। এই রোগ-পরবর্তী আরও দুই শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সময়ে মহামারী আকার নিয়েছিল। মারা গিয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ। তখনকার হিসাবে এটি ছিল পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ। সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানও প্লেগের সঙ্গে অসুস্থ হয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন; তবে, মহামারীটি আঘাত হানার পরে ধীরে ধীরে তার সাম্রাজ্য ভূখণ্ড হারাতে থাকে। এর ফলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, ইসলাম ধর্মের প্রভাব বাড়ে ও আধুনিক ইউরোপের জন্ম হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স-এর গবেষণায় অবশ্য এই প্লেগের প্রভাবকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
প্রায়শই ‘প্লেগ’ হিসাবে পরিচিত, ‘ব্ল্যাক ডেথ’ হল মানব ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক মহামারী। ১৩৪৪ থেকে ১৩৫০ সালের মধ্যে ইউরোপ মহাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা এই রোগের কবলে পড়েছিল। ঐতিহাসিকরা অনুমান করেছেন যে এটি বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ১০ কোটি কমিয়ে দিয়েছিল। ইউরোপের বেশিরভাগ অংশে, জনসংখ্যা পুনরুদ্ধার করতে প্রায় ৮০ বছর সময় লেগেছে, এবং কিছু অঞ্চলে ১৫০ বছরেরও বেশি সময় লেগেছে। ‘দ্য ব্ল্যাক ডেথ’ নামে খ্যাতি পাওয়া এই মহামারী প্রথমে এশিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে তা পশ্চিমে ছড়ায়।
মরক্কোর ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন লেখেন, ‘ধ্বংসাত্মক প্লেগ রোগের দ্বারা পূর্ব ও পশ্চিমের সভ্যতা আক্রান্ত হয়েছিল। এটি সভ্যতা ও জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন হওয়ার কারণ হয়ে উঠেছিল। মানবসভ্যতার পতনের সঙ্গে মনুষ্যত্বেরও পতন ঘটেছিল। শহর, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। বাড়িঘর জনশূন্য হয়ে যায়, বিভিন্ন গোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়ে। সামগ্রিকভাবে মানব অধ্যুষিত অঞ্চলের জীবনধারা একেবারে বদলে গিয়েছিল।’ এক পর্যায়ে পুরো ইউরোপ এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়। শুধু এই মহামারীর কারণে ওই সময়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যেকার যুদ্ধ থেমে যায়। এই প্লেগে জনমিতিগত ও অর্থনৈতিক ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ায় ধসে পড়েছিল ব্রিটিশ সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা। মহামারীটি ইউরোপের ইতিহাসের গতিপথ বদলেছে। এর পরিণতি বিশ্বজুড়ে জনগণের ওপর তাত্ক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উভয় প্রভাবই ফেলেছিল। আর. এইচ. হিলটন যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, যে ইংরেজ কৃষকরা বেঁচেছিলেন তারা তাদের অবস্থার অনেক উন্নতি করেছিলেন। অনেক ইউরোপীয়দের জন্য, পঞ্চদশ শতাব্দীটি সমৃদ্ধি এবং নতুন সুযোগের স্বর্ণযুগ ছিল। জমি ছিল প্রচুর পরিমাণে, মজুরি বেশি ছিল, এবং দাস প্রথা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। সস্তা শ্রমের অভাব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেও ভূমিকা রাখতে পারে। শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, অপরদিকে ধর্মীয় বিদ্বেষ বেড়ে গিয়েছিল সাংঘাতিকভাবে-- ফ্রান্সের স্ট্রসবার্গে একদিনে একসঙ্গে প্রায় ১ লক্ষ ইহুদিদের হত্যা করা হয়েছিল।
স্মল পক্স ও প্লেগ সম্পর্কে আমেরিকাবাসীদের কোনও পরিচিতি ছিল না। ইউরোপীয় নাবিকদের আগমনে তাদের সংস্পর্শে এসে, তারা সেই রোগের শিকার হয় ও দলে দলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ১৫১৫ সালে হার্নান কর্টেসের নেতৃত্বে একটি স্পেনীয় বাহিনী তেনোচিটলিনের অ্যাজটেক রাজধানী এবং ১৫৩২ সালে ফ্রান্সিসকো পিজারোর নেতৃত্বে আরেক স্প্যানিশ বাহিনী ইনকাগুলিকে জয় করে। স্প্যানিশরা উভয় সাম্রাজ্যের অঞ্চল দখল করেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই, অ্যাজটেক এবং ইনকান সেনাবাহিনী রোগ দ্বারা বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং স্প্যানিশ বাহিনীকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়। অ্যাজটেক ও ইনকা সভ্যতা ধংস হয়েছিল এর ফলশ্রুতিতে। “It is estimated that upwards of 80–95 percent of the Native American population was estimated to be decimated within the first 100–150 years following 1492” (Newson, 2001).
এরপর মৃত্যুর দূত হয়ে আসে কলেরা। কলেরা রোগের প্রথম মহামারীর শুরুটা হয়েছিল এই বাংলায়। দূষিত জলের মাধ্যমে এই রোগ পরে ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে ছড়ায়। পরে তা ভারতে ছড়ায়, যাতে ১০ লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতেও কলেরা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চিন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকাতেও কলেরা ছড়িয়ে পড়ে মহামারী আকারে। দ্রুত হারে নগরায়ন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খোলা নর্দমা আর উন্মুক্ত শৌচ ব্যবস্থা শ্রমিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছিল। এসব অঞ্চলে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ফলে সব মিলিয়ে ২২–২৩ লক্ষ লোক মারা যায়। এখানেই শেষ নয়, পরবর্তী আরও দেড়শো বছর ধরে কলেরা বিভিন্ন সময়ে কয়েক দফায় মহামারী আকারে দেখা দিয়েছিল। প্রতি বছর ১ লক্ষ ৪৩ হাজার লোক কলেরায় এখনও মারা যান। পরিস্রুত পানীয়জল ও সার্বিক স্বাস্থ্যবিধানের লক্ষ্যে সভ্যতাকে কাজ করতে প্রেরণা যোগায় এই মহামারী। সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যেও রাষ্ট্রের প্রকল্পগুলো চালিত হয়। বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এই মহামারীর শিকার।
প্রথম বৈশ্বিক ফ্লু ঘটিত মহামারী ছিল রাশিয়ান ফ্লু। সাইবেরিয়া ও কাজাখস্তানে এর সূত্রপাত। পরে মস্কো হয়ে ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ডে তা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ইউরোপেও দেখা দেয় মহামারী। সমুদ্র পেরিয়ে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল এই ফ্লু। ১৮৯০ সালের শেষ নাগাদ এই রোগে প্রায় ৩ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
বিশেষত, রাশিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নগরায়ন সম্পর্কে ভিক্টোরিয়ান সাংস্কৃতিক আশঙ্কা উজ্জীবিত ও শক্তিশালী করেছে, সামাজিক পরিবর্তনের দ্রুততা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা-- মহামন্দা সূচিত করেছে। এমন এক সময়ে যখন পুরুষদের গুরুত্ব অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সম্পর্কিত কাজকর্মের দ্বারা ক্রমশ সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছিল, তখন 'বিশৃঙ্খল' শহুরে পেশাগুলির সঙ্গে জড়িত 'অবসন্নতা' ইনফ্লুয়েঞ্জার উপসর্গ হয়ে উঠল— এমন একটি লক্ষণ যা নিউরোসথেনিয়া, হতাশা তৈরি করেছিল জনমনে। ফলত ইনফ্লুয়েঞ্জা-পরবর্তী সাইকোসিস সমাজ-মনের অঙ্গ হিসাবে রয়েই গেল। স্নায়বিক দুর্বলতা এবং অলসতা যা সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাথমিক লক্ষণ-- এবং শ্বাসকষ্টের জটিলতার আশঙ্কা-– এসব অতীত ভিক্টোরিয়ান আধুনিকীকরণের প্রবণতাগুলির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক এবং মানসিক উদ্বেগগুলির অংশ হয়ে উঠল এডওয়ার্ডিয়ান সমাজে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার ক্ষত দূর হতে না হতেই পৃথিবীজুড়ে শুরু হয়েছিল নতুন আরেক যুদ্ধ। পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করতে চাইল এক মারণব্যাধি। নতুন ধরনের সেই ইনফ্লুয়েঞ্জাকে প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল ১৯১৮ সালের মার্চ মাসে এক মার্কিন সৈনিকের শরীরে। ততদিনে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈন্যরা ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন। হেমন্ত কাল বা আগস্ট মাস আসতেই ঝড়ের গতিতে ছড়াতে শুরু করল সেই মহামারী। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে আক্রমণ হলেও পৃথিবীর কোনও দেশই রক্ষা পায়নি এ জ্বরের ছোবল থেকে। ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামে সেই মহামারীতে পরের দুই বছরে পুরো পৃথিবীতে পাঁচ কোটি মানুষ মারা যায়। কোনও কোনও গবেষকের মতে, মৃতের এ সংখ্যাটি কোনওভাবেই ১০ কোটির কম হবে না। স্প্যানিশ ফ্লুকেই মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারী বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক এবং বিধ্বংসীরূপে আবির্ভূত হয়েছিল H1N1 নামে এ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসটি। ধারণা করা হয়, স্প্যানিশ ফ্লুর উৎপত্তিস্থল ছিল চিনে। চিনা শ্রমিকদের মাধ্যমে তা কানাডা হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১৮ সালের শুরুর দিকে এই ফ্লু উত্তর আমেরিকায় দেখা দেয় এবং পরে ইউরোপে ছড়ায়। স্পেনের মাদ্রিদে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর এর নাম হয় ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। ১৯১৯ সালের গ্রীষ্মে এই রোগের প্রকোপ কমে আসে। সালফা ড্রাগস ও পেনিসিলিন তখনও আবিষ্কৃত না হওয়ায় স্প্যানিশ ফ্লু অত্যন্ত প্রাণঘাতীরূপে দেখা দিয়েছিল। ‘সেসময় যুদ্ধের কারণে মানুষ প্রচুর চলাচল করত। সৈন্য ও শ্রমিকরা যখন তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে গেল, তখন এই ফ্লু উত্তর ফ্রান্সের রণাঙ্গন থেকে তাদের নিজেদের দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ল।’ বিশ্বের অনেক দেশে, রেল যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণরূপে থেমে যায়। অনেক দেশেই বিদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। কিছু এলাকায় গির্জার মতো ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোও সারা বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। বলা হয়ে থাকে ১৯১৮ সালের শেষদিকে মহামারীতে প্রায় ৫৭ হাজার মার্কিন সৈন্য মারা যান, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মৃত্যুহারের চেয়ে দশগুণ বেশি ছিল। মহামারীর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের গড় আয়ুর সূচকে ১২ বছর কমে গিয়েছিল।
স্প্যানিশ ফ্লুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে আফ্রিকায়। এ মহাদেশে সবচেয়ে সঙ্গিন পরিস্থিতি হয়েছিল জাম্বিয়ার। দেশটির প্রায় ২১ শতাংশ মানুষই এ মহামারীতে প্রাণ হারিয়েছিল। মোট জনসংখ্যার ১০.২ শতাংশ মারা গিয়েছিল জিম্বাবুয়েতে। তানজানিয়ায় মারা গিয়েছিল ৮.১ শতাংশ মানুষ। আর আফ্রিকা মহাদেশে সবচেয়ে কম মানুষের মৃত্যু হয়েছিল মিশরে, মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশ। মার্ক হনিগবাউম বলছেন, এত মানুষের মৃত্যু হওয়ার পরেও স্প্যানিশ ফ্লু ইতিহাসে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি।
প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের প্রাণহন্তারক হিসেবে ১৯৫৭ সালে চিনে আবির্ভূত হয় ভাইরাস এইচ২এন২। এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ও হিউম্যান ইনফ্লুয়েঞ্জার একধরনের মিশ্র জাতের স্ট্রেইন থেকে এই ভাইরাসের উদ্ভব বলে জানা যায়। হংকং থেকে এই রোগ চিনে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা ছয় মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে ছড়ায়। এ কারণে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়ে। ১৯৫৮ সালের শুরুর দিকে এশিয়ান ফ্লু দ্বিতীয়বারের মতো মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় এশিয়ান ফ্লুতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গিয়েছিল ১ লক্ষ ১৬ হাজার মানুষ। পরে ভ্যাকসিন দিয়ে ওই মহামারী প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।