Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ইউরোপের আদালতে ‘গোপনীয়তা’ কবচ পেলেন নীরব মোদী, জটিল হচ্ছে পলাতক ব্যবসায়ীর প্রত্যর্পণ-লড়াইইরানের সঙ্গে সংঘাত এবার শেষের পথে? ইঙ্গিত ভ্যান্সের কথায়, দ্বিতীয় বৈঠকের আগে বড় দাবি ট্রাম্পেরওIPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?

শ্রমিকের অধিকার এখন সোনার পাথরবাটি

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রমিকদের উপর এমন আঘাত এবং ষড়যন্ত্র কোনও নির্বাচিত সরকার করেনি।

শ্রমিকের অধিকার এখন সোনার পাথরবাটি

শ্রমিক দিবস

শেষ আপডেট: 1 May 2024 14:50

নব দত্ত

আজ ঐতিহাসিক মে দিবস, যাকে আমরা শ্রমিক দিবস বলে থাকি। দিনটির এই নামকরণই এখন মস্তবড় চ্যালেঞ্জের মুখে। লাগাতার অটোমেশন অর্থাৎ মানুষের পরিবর্তে মেশিনকে উৎপাদন প্রক্রিয়ার মূল চালিকা শক্তি করে তোলায় শিল্পের সঙ্গে শ্রমিকের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক অনেক আগেই ধাক্কা খেয়েছে।

বিগত ৪০-৫০ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পে খরা চলছে। তার পিছনে দেশভাগ, তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের নীতি, মালিকদের ষড়যন্ত্র, তা নিয়ে কলকারখানায় শ্রমিকদের বিপথে চালিত করা, ইত্যাদি নানা বিষয় যুক্ত ছিল। আবার ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকে কলকারখানা গড়ার নামে জমি অধিগ্রহণে আয়লা-আমফানের মতো তাণ্ডব হাজির করে শিল্পায়নের প্রচেষ্টাকেও সন্দেহজনক করে তোলা হয়েছে। বর্তমান সরকার আবার এই ব্যাপারে খানিক জল মেপে চলার চেষ্টা করছে। যদিও তাদের বিরুদ্ধেও কিছু প্রকল্পে জোর করে জমি দখল এবং পরিবেশের তোয়াক্কা না করার জোরালো অভিযোগ উঠেছে।

ফলে কলকারখানা যতটুকু যা আছে, তাতে শ্রমিকরা কোনওরকমে টিকে আছেন। গোটা দেশের ক্ষেত্রেই এটা কম-বেশি সত্যি। কিন্তু তার থেকেও ভয়ঙ্কর হল বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু পদক্ষেপ যা শ্রমিকের সঙ্গে অধিকারের সম্পর্ককেই নিশানা করা হয়েছে। ছেদ ঘটানো হয়েছে এই সম্পর্কে। ফলে ১ মে, যে দিনটি শ্রমিকেরা অধিকার (Right of Labour) অর্জনকে উদযাপন করে আসছিলেন বিগত বেশ কিছু বছর যাবৎ তা হরণের বিলাপ দিবসে পরিণত হয়েছে।

নরেন্দ্র মোদীর সরকার অধিকারকে কী চোখে দেখে, তা শুধুমাত্র শ্রম ক্ষেত্রে তাদের তথাকথিত ঐতিহাসিক সংস্কারে চোখ বোলালেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। তারা দেশের ৪৪টি শ্রম আইনকে এক জায়গায় নিয়ে এসে চারটি লেবার কোড চালু করেছে। সেগুলি হল— এক. মজুরি সম্পর্কিত নিয়মাবলী। দুই. সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কাজ সম্পর্কিত নিয়মাবলি। তিন. সামাজিক নিরাপত্তা সম্পর্কিত নিয়মাবলি। চার. শিল্প-শ্রমিক সম্পর্কজনিত নিয়মাবলি।

স্বাধীন ভারতে ৭৫ বছরে ধাপে ধাপে শ্রম আইন অজস্রবার সংশোধন করা হয়েছে। একথা ঠিক যে, শ্রমিকরা সাধারণভাবে অনেক ক্ষেত্রেই বিগত সরকারগুলির থেকে সুবিচার পায়নি। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার শ্রম আইন পরিবর্তন করে লেবার কোড চালুর মাধ্যমে শ্রমিকদের মুখ্য অধিকারগুলি কেড়ে নিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রমিকদের উপর এমন আঘাত এবং ষড়যন্ত্র কোনও নির্বাচিত সরকার করেনি।

বেতন সংক্রান্ত শ্রম কোডে বলা হয়েছে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে যে চালু ব্যবস্থা রয়েছে তা তুলে দিয়ে টাইম রেট অর্থাৎ (সময় নির্ধারিত কাজ) ও ফুরনপ্রথায় কাজ (পিস রেট)-এর ভিত্তিতে করা হবে। তুলে দেওয়া হল দক্ষতার মাপকাঠি।

শ্রম কোড চালুর আগে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত মেনে চলা হত। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, সন্তান পালন, পেনশন, সঞ্চয় ইত্যাদি ধরে নির্ধারিত হত মজুরি। লেবার কোডের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের মজুরি সংক্রান্ত নির্দেশকে অমান্য করা হল।

জীবনযাপনের ন্যূনতম খরচকে বিবেচনায় রেখে মজুরি নির্ধারণ একটি ন্যায্য ব্যবস্থা ছিল। লেবার কোডে যা অস্বীকার করা হয়েছে। এছাড়া ন্যূনতম মজুরি হারের নির্দিষ্ট সময় অন্তর সংশোধন এখন আর বাধ্যতামূলক নয়। বলা হয়েছে, যে শ্রমিকরা ১৮ হাজার টাকার বেশি বেতন পাবেন তাদের শ্রমিক শ্রেণিভুক্ত না করে সুপারভাইজার করা হবে। অর্থাৎ যে টুকু যা অধিকার অবশিষ্ট রাখা হয়েছে তাও মুষ্টিমেয়র ক্ষেত্রে বলবৎ হবে। মোদ্দা কথা শ্রমিকের অধিকারের বিষয়টিতে যতভাবে সম্ভব তুচ্ছ করে তোলা হয়েছে।

যেমন মালিকদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তারা ইচ্ছামতো বেতন থেকে শ্রমিকদের টাকা কেটে নিতে পারবে। ৮ ঘণ্টা কাজের সময় তুলে দেওয়া হয়েছে। ওভারটাইম নেই। বাড়তি টাকা না দিয়ে শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো যাবে। মহিলা শ্রমিকদের সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে সকাল ছটা পর্যন্ত কাজ না করানোর যে আইন ছিল তা তুলে দেওয়া হয়েছে।

মজুরি কোডের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ফ্লোর লেভেল মজুরি নির্ধারণ করেছে ৪৬২৮ টাকা। অর্থাৎ দিনে ১৭৮ টাকা। বলা হয়েছে এর নীচে কোনও রাজ্যে মজুরি নির্ধারণ করা যাবে না। অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকার নির্ধারিত চালু মজুরি কোন শিল্প বা পেশাতেই এখন এর থেকে বেশি ছাড়া কম নয়।

মজুরি নিয়ে ভয়ঙ্কর এই অমানবিক সিদ্ধান্ত সমস্ত নিয়ম-নীতি আইন-কানুনকে অগ্রাহ্য করে কর্পোরেট পুঁজিপতিদের নির্লজ্জ স্বার্থরক্ষায় করা হয়েছে। অথচ মোদী সরকার নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ ছিল মজুরি হোক দৈনিক ৩৭৫ টাকা থেকে ৪৪৭ টাকা। মাসিক হিসেবে ১১ হাজার ৬২২ টাকা। এসব মানা হয়নি। তার বদলে ফ্লোর রেট করা হল দিনে ১৭৮ টাকা।

শ্রমিকদের জন্য বিপদজনক শিল্পকারখানা এবং স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা আছে এমন উৎপাদন প্রক্রিয়া চিহ্নিত করা ছিল। তা তুলে দেওয়া হয়েছে। কাজের জায়গায় স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টি স্থির করার অধিকার পুরোপুরি সরকারের। পানীয় জল, টয়লেট, ক্রেস, ক্যান্টিন, ইত্যাদি আবশ্যিক বিষয় আর মালিকদের উপর বাধ্যতামূলক নয়। এগুলি সরকারের সদিচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার লেবার কোড চালু করে স্থায়ী চাকরির ধারণাটাও বদলে দিয়েছে। সরকারি চাকরিও এর বাইরে নয়। ছয় মাসের মেয়াদে চাকরি হবে। শ্রম কোডে শ্রমিকদের দরকষাকষির কোনও সুযোগ রাখা হয়নি। ইউনিয়নের কর্মকর্তা ঠিক করবে মালিকেরা। কর্মী ছাটাইয়ে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে মালিকদের। ৩০০ জনের বেশি কর্মচারী আছে এমন সংস্থাতেই কর্মী ছাটাই, লে অফ ইত্যাদির আগে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। ঠিকা, চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরা এর আওতায় আসবেন না। তাদের যখন ইচ্ছে মালিক বসিয়ে দিতে পারবে।

ভারতে সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়নের বয়স শতবর্ষ পেরিয়ে গেল। আর এই সময়ই স্বাধীনতা পরবর্তী অর্জিত শ্রমিকের অধিকার আইন করে কেড়ে নেওয়া হল। লক্ষণীয় হল, দেশের প্রায় সব রাজ্য সরকার রুল তৈরি করলেও এপ্রিল মাসের গোড়ায় পশ্চিমবঙ্গের শ্রমমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন এই রাজ্যে লেবার কোড তাঁরা চালু করবেন না এবং রুল বানাবেন না।

অন্যদিকে, অধিকাংশ ট্রেড ইউনিয়নের আপত্তি অগ্রাহ্য করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি কেন্দ্রীয় সরকার প্রবর্তিত লেবার কোড চালু করেছে। এতে অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নেই। আশ্চয্যের হল, কংগ্রেস সহ অন্যান্য বিরোধী দল পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলিও শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী লেবার কোড চালু করতে রুলস তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে।

শ্রমিকের আট ঘণ্টা কাজ—যে ঐতিহাসিক অধিকার অর্জনকে সামনে রেখে মে ডে উদযাপন তা আজ সোনার পাথর বাটি বলা চলে। এ বারের মে দিবসে শ্রমিকের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ট্রেড ইউনিয়নের পাশাপাশি নাগরিক সমাজেরও সরব হওয়া তাই সময়ের দাবি।

(লেখক শ্রমিক ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত)


```