
শেষ আপডেট: 27 August 2023 09:30
'কেয়া নাম হ্যায় তেরা? মহম্মদ! আধার কার্ড নিকাল। নিকাল আধার কার্ড।’
মিনিট খানেকের ভিডিওয় দেখা গিয়েছিল এক পৌঢ়কে এই কথা বলে চড়-থাপ্পড় মারছে এক যুবক (Hate Crime)। পরে সেই প্রৌঢ় মারা যান। নিজের নাম বলার সুযোগ পেলে হয়তো মরতে হত না ভাঁওয়ারলাল জৈনকে। কিন্তু তিনি যে মানসিক ভারসাম্যহীন!

তবে মরার আগে আসল পরিচয় জানা গেলে ভবঘুরে মানুষটাকে হয়তো পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হত। যে লোকটা ‘আধার কার্ড নিকাল। নিকাল আধার কার্ড’-- বলে চড়-থাপ্পড় মারছিল, সেই-ই হয়তো সদয় হয়ে প্রৌঢ়ের পকেটে কিছু টাকাপয়সা গুঁজে দিত। আফটার অল লোকটা তো ‘হিন্দু’। সেই ধর্মপরিচয় নিশ্চিত করা গেল না বলেই মরতে হয় মধ্যপ্রদেশের ভাঁওয়ারলাল জৈনকে। ঘটনাটি গত বছর মে মাসের।
আসলে মৃত্যুর মতো অন্তিম কিছু ঘটে না গেলে আমরা খুব একটা নড়েচড়ে বসি না। দেশের বড় অংশের মানুষ, আপাত নিরীহ সাধারণ নাগরিক, তারাও কিন্তু মধ্যপ্রদেশের ওই বিজেপি কর্মকর্তার মতো এই প্রশ্নটাই বয়ে বেড়ায়, লোকটা হিন্দু না মুসলিম?
মুজফ্ফরনগরের স্কুলের শিক্ষিকার দুধের শিশুটির ধর্ম পরিচয় নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাটি মুসলিম জেনেই শিক্ষিকা হুমকির সুরে বলে ওঠেন, ‘যত সংখ্যালঘু বাচ্চা আছে, তাদের সবাইকে আমি…’
দুধের শিশুটির গায়ে নিজে হাত তোলেননি সেই শিক্ষিকা। খুদে সহপাঠীরা শিক্ষিকার হুমুক তালিম করতে বন্ধুকে চড়-থাপ্পড় মারতে বাধ্য হয়। এই শিশুগুলির ভবিষ্যতে হিংসার কারবারি হয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। যেমন অসম্ভব নয় আক্রান্ত শিশুটির মনে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত হওয়া। বিজেপি নেত্রীর মুখে মহম্মদের অবমাননার ঘটনার পর হিন্দুদের উপর হামলার ঘটনাগুলি ইঙ্গিত করে কীভাবে প্রতিশোধের পাল্টা কর্মসূচি মাথা তুলছে।
আক্রান্ত শিশুটিকে তার বাবা স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে চান। কিন্তু শিক্ষিকার বিরুদ্ধে গোড়ায় থানায় নালিশ করতে চাননি। শিউরে ওঠা ঘটনাটি নিয়ে নিন্দার ঝড় বইলেও অবাক করেছে শিশুর বাবার মুখ বুজে থাকার সিদ্ধান্ত। আসলে ভীত, সন্ত্রস্ত সংখ্যালঘুরা জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ চান না। যোগীর মুসলিমদের ভোট পাওয়ার আসল রহস্যও সেখানে। ভোটের বুথ ভিত্তিক গণনার ফলাফলে উঠে আসে কোন মহল্লা কাকে ভোট দিয়েছে। গরিব, দিন আনি দিন খাই সংখ্যালঘুরা সেটা ভাল করেই জানেন। হিন্দুত্ববাদী এবং মিডিয়ার একাংশ সেই ফলাফলকেই পছমন্দা, অর্থাৎ পিছিয়ে থাকা মুসলিমদের বিজেপিকে সমর্থন বলে চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, নিন্দার ঝড়ের মুখেও মুজফ্ফরনগরের সেই শিক্ষিকা টিভি ক্যামেরার সামনে অবলীলায় বলেছেন, ছোট্ট ঘটনা নিয়ে অনর্থক জলঘোলা করা হচ্ছে। অনুতাপ, গ্রেফতারের আতঙ্ক লেশমাত্র নেই তাঁর কথায়। হতেই পারে কোনও মহল থেকে তাঁকে অভয় দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যা করেছো ঠিক করেছো, যা বলেছো, ঠিক বলেছো।’
একটু পিছনের দিকে যাওয়া যাক। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি।
এক সন্ধ্যার নৈহাটি লোকালের কামরায় একদল যুবক সহযাত্রী দুই তরুণীর উদ্দেশে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি আর কুমন্তব্য করছে। ঘটনাচক্রে সেই যুবকরা ছিল অবাঙালি, টিটাগড়ের বাসিন্দা। সহযাত্রীরা অনেককেই তাদের মুখ চিনতেন, গন্তব্য স্টেশন জানতেন। উশৃঙ্খলতা মাত্রা ছাড়ালে যাত্রীদের কয়েকজন প্রতিবাদ করলেন। ঘটনাচক্রে, প্রতিবাদকারীরা বাঙালি। তাদেরই একজনের মন্তব্য, ‘আর কতদিন এসব মুখ বুজে সহ্য করব আমরা? ঘাড়ধাক্কা দিয়ে এদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত।’
প্রতিবাদে গলা মেলান আরও কয়েকজন। কথা কাটাকাটি হাতাহাতিতে গড়ায়। শেষে প্রায় গণধোলাইয়ের শিকার হল সেই যুবকরা। এর পরে ট্রেন টিটাগড়ের কাছাকাছি পৌঁছতে সেই যুবকদেরই একজন গলা চড়িয়ে বলে উঠল, ‘আপলোগ কেয়া সোচতে হ্যায়? হামলোগ ভি হিন্দু হ্যায়।’
কথাটা যেন ট্রেনের গোটা কামরাকে মরমে বিঁধল। মুহূর্তে পরিস্থিতি গেল বদলে। যারা ওদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলছিলেন তাদেরই একজন হঠাৎ দরদী হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন, আর মারবেন না। এসব বয়সকালের অসুখ।’
ঘটনাটি ১৯৯৪ সালের। প্রায় তিন দশক আগের। ধর্মীয় বিদ্বেষ, বিভাজনের মনোজগতে উপনিবেশ নতুন নয়। তবে চলন্ত ট্রেনে বিচারশালা বসানো এবং সহযাত্রী মহিলাদের লাঞ্ছনার ঘটনায় অভিযুক্তদের ধর্ম পরিচয়কে মানদণ্ড করে তোলার মত বিভাজনের দৃষ্টান্ত বাবরি মসজিদ ধ্বংস পরবর্তী সময়ে অগুনতি।
ছেলেধরা, চোর, ডাকাত, ছিনতাইবাজ, এমনকী ডাইনি সন্দেহে খুনের কথা আমরা জানি। ওই সব চেনা অপরাধে অনেকটাই লাগাম দেওয়া গিয়েছে। কিন্তু স্রেফ সন্দেহ করে খুন করার তালিকায় যুক্ত করা হচ্ছে মুসলিমদের। চোর-ডাকাত-ডাইনির সঙ্গে এক বন্ধনীতে রাখা হচ্ছে একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে। মহারাষ্ট্রে ট্রেনে কর্তব্যরত রেল পুলিশের জওয়ানের বেছে বেছে তিন মুসলিম যাত্রীকে গুলি করে হত্যা কী ইঙ্গিত করে?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দুত্ববাদীদের র্যাগিং-বিরোধী প্রতিবাদ মিছিল থেকে ‘গোলি মারো সালোঁ কো’ স্লোগান শোনা গেল। এই স্লোগানের কপিরাইট মোদীর যে মন্ত্রীর তিনি এখন ভারত সরকারের মুখপাত্র। তাঁর কথায় অনুপ্রাণিত হয়েই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দিল্লিতে পথে নামা পড়ুয়াদের দিকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে গিয়েছিল রামভক্ত গোপাল নামে সেই তরুণ, এমন অনুমান অমূলক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের ‘আজাদি’ স্লোগানকে বিদ্রুপ করে সেই তরুণ পিস্তল হাতে এগিয়ে যাওয়ার সময় বলছিল, ‘নে মুক্তি নে’। রামভক্ত গোপাল জেলে। মন্ত্রীকে ছোয়নি পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ এফআইআর দায়ের করবে কিনা এই প্রশ্নে আদালতের রায় সাড়ে তিন বছর পরও অধরা।
মধ্যপ্রদেশের ঘটনাটির মতো মহম্মদ বা মুসলিম বলে অথবা সন্দেহে হত্যা, বাড়িতে গোমাংস রাখার অভিযাগে মহম্মদ আখলাককে পিটিয়ে মারার ঘটনার মতো হইচই সব ক্ষেত্রে হয় না। আবার ঘটনা তাতে থেমেও থাকে না। কেউ চাষের কাজের জন্য গরু কিনে ফেরার পথে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। কখনও পরিচিত গরু ব্যবসায়ীকে ছেলেধরা বলে মেরে দেওয়া হয়েছে। ফরিদাবাদের জুনেদ খানের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। ইদের বাজার করে ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথে মুসলিম পরিচিতির কারণে সাজানো জনরোষের শিকার হয়েছিলেন তিনি। ঘটনা হল, গুটিকয় রাজ্য বাদে বড় মুখ করে দাবি করতে পারবে না, অপরাধের এই নয়া প্রবণতা থেকে তারা মুক্ত।
ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব কিছুদিন আগে বলেছেন, ‘এই ধরনের অপরাধী লোকজন দেশে আগেও ছিল। এখন তারা নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে গণহত্যার ডাক দিতে পারছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মায়ানমারের মতো এদেশেও একটি জাতিগোষ্ঠীর লোককে নিকেশ করা, দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, আর আমরা বসে বসে দেখছি।’ উত্তরপ্রদেশের ঘটনায় ইঙ্গিত মেলে শিশুদের কোমল মনে হিংসা, বিদ্বেষ চাগিয়ে তুলতে কীভাবে স্কুলগুলিকেও ঘৃণার আঁতুড়ঘর করে তোলা হচ্ছে।
গত মার্চে কর্নাটকে বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্যের উপকূলীয় এলাকায় করা এক সমীক্ষার দেখা গিয়েছিল, নাগরিকদের ৯৬ শতাংশই ধর্মীয় মেরুকরণে আচ্ছন্ন। অর্থাৎ ভোটের বাক্সে জনরায়ের প্রতিফলনে নির্ধারক হবে ধর্মীয় বিভেদ, বিদ্বেষ। সমীক্ষায় আরও জানা গিয়েছিল, মৌলবাদী ভাবনায় আচ্ছন্ন সেখানকার ৯০ ভাগ নাগরিক।
অজান্তে জনমনে মেরুকরণের এই অভিযানে বড় ভূমিকা পালন করেছে সোশ্যাল মিডিয়া। কর্নাটকের হিজাব বিবাদে বোঝা গিয়েছে, কীভাবে তরুণ প্রজন্মের একাংশের মনে ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসার উপনিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে। হিংসা, বিদ্বেষের বেশিরভাগ ঘটনার নেতৃত্বে তরুণ সমাজ। সামাজিক মাধ্যমে গড়ে তোলা ঘৃণার নরকেও কমবয়সিদের উপস্থিতি বেশি। একটা প্রজন্মকে শুধু এই লক্ষ্যে তৈরি করে নেওয়া হয়েছে, হচ্ছে।
রাজনীতিতে মেরুকরণ নতুন নয়। বরং রাজনীতি মানেই মেরুকরণ। সেটা অবশ্যই নীতি-আদর্শের। গেরুয়া শিবিরের কর্মসূচি আঁকড়ে বিজেপি মেরুকরণে হাতিয়ার করেছে ধর্মকে। তাদের রাজনীতির নির্বাচনী সাফল্য স্বীকার করে নিয়েও তাই বলতে হয়, এই লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে চমক এবং বাহাদুরি, কোনওটাই নেই।
তবে বিগত কয়েক বছরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম এবং খ্রিস্টানদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের যে ঘটনাগুলি ঘটছে তা নিছক ভোটের লক্ষ্যপূরণে মেরুকরণের রাজনীতি বলে ধরে নিলে ভুল হবে। বরং নানাভাবে সংখ্যালঘুদের পেশা, স্বাধীন জীবনযাপনকে টার্গেট করা হচ্ছে। বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে তাদের অস্তিত্ব। পয়লা লক্ষ্য মুসলিমরা। তাই কেরলে বিদ্বেষের রাজনীতির নয়া ল্যাবরেটরি করে তোলা হচ্ছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের খেপিয়ে তুলে। অন্যদিকে, কখনও হরিদ্বার, কখনও দিল্লির ধর্ম সংসদ থেকে মুসলিমদের হত্যা, নিকেষ করার ডাক দেওয়া হচ্ছে। অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন সাধুসন্তরা।
আর এসবের মধ্যে আশ্চর্য নীরব রাষ্ট্র। সংখ্যালঘুদের প্রতি সংগঠিত হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা বর্ষণের ঘটনায় সরকারি মহল থেকে অনুশোচনা, নিন্দা, সমালোচনা কিছুই শোনা যাচ্ছে না। এইভাবে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না তো? সেই দিন ডেকে আনা হচ্ছে না তো, যেদিন জুনেদ খান এবং ভাঁওয়ারলাল জৈন— কেউই রক্ষা পাবেন না!
প্রধানমন্ত্রী ২০৪৭-এ স্বাধীনতার শতবর্ষে এক নতুন ভারতের স্বপ্ন ফেরি করছেন। সেই ভারতে হয়তো বিমানের গতিতে ট্রেন ছুটবে, ট্রেনের গতিতে বাস। কিন্তু ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসার কথা এখনই হাওয়ার গতিতে ছুটছে। ২০২৪-এর জন্য আমরা কোন ভারত নির্মাণ করছি?