বৃন্দা কারাত
সত্যিই বলিহারি যাই। এই সরকার কতটা স্পর্শকাতরতাহীন হতে পারে! ঠিক যে দিন ট্রাক দুর্ঘটনায় ২৬ জন পরিযায়ী শ্রমিকের বেঘোরে মৃত্যু হল, আহত হলেন আরও ৩০ জন, টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেল মৃত মায়ের পাশে বসে কাঁদছে শিশু এবং যা দেখে গোটা দেশ দুঃখে কাতর, ঠিক সেই দিন ভারতের অর্থমন্ত্রী কিনা মহাকাশ গবেষণা, পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রে গবেষণার দরজা বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে দিলেন। বাহ্ রে বোধ! বাহ্ রে সময়জ্ঞান! এটা শুধু অদ্ভুত নয়, বরং এটা দিয়েই বোঝা যায়, যে মানুষগুলি দেশের সম্পদ তৈরির জন্য সারাবছর লড়াই করেন, যাঁরা সব হারিয়ে স্ত্রী, সন্তান সংসার কাঁধে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন তাঁদের প্রতি এই সরকারের মনোভাব কেমন। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর তাঁদের জন্য ভাববারই সময় নেই। বরং তিনি যেন স্বপ্নজগতে বিরাজ করছেন। বাস্তবের সঙ্গে প্রবল বৈপরীত্য রেখে সেই অর্থমন্ত্রীকে যখন দেখলাম প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা করা বিশ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজের হিসেব দিচ্ছেন – দিব্য দেখতে পেলাম সব যেন বেমালুম হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। কিচ্ছু নেই! সবটাই ফাঁপা।
সুতরাং স্পষ্ট করে বুঝে নেওয়াই ভাল। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার যে অতিরিক্ত কুড়ি লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তাতে গরিব, আদিবাসী, শ্রমিক, মজুর, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের পকেটে ১ আনা পয়সাও ঢুকবে না। তাঁদের সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মতো কিছুই নেই এই ঘোষণায়। অথচ মনে পড়ছে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ঘোষণায় কীভাবে খেটেখাওয়া গরিব মানুষগুলির জীবিকা নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন! হকার, গেরস্তের কাজ করা পরিচারিকা, মৎস্যজীবী, রিকশাওয়ালা মায় অসংগঠিত ক্ষেত্রের সব শ্রমিক হঠাৎ যেন আনন্দিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা কী পেলেন? শুধু ঋণের প্রস্তাব। টাকা ধার নাও। আর সুদ গোনো। কাজ থাক বা না থাক। আর কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বিজ্ঞের মতো তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রাপ্যের কথা বলেননি, বলেছেন ক্ষমতায়ণের কথা। বলা বাহুল্য, প্রাপ্য কিন্তু বুঝে নিয়েছেন বন্ধুরা। সেই সব বন্ধু যাঁরা ব্যাঙ্কের টাকা নিয়ে ফেরত দেননি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সাড়ে ৭ লক্ষ কোটি টাকা অলাভজনক সম্পত্তিতে পরিণত হওয়ায় সেগুলি রাইট অফ করা হয়েছে।

আমি স্রেফ এটা ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছি, গত ২ মাস ধরে যে মানুষগুলোর কোনও কাজ নেই, টাকা ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে, তাঁদের আর ধার নেওয়ার ক্ষমতা আছে? ভুলে গেলে চলবে না, ভারতের ৪০ কোটি মেহনতি মানুষের মধ্যে ৯৩ শতাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী। তাঁদের রোজগারের কোনও স্থিরতা নেই। কখনও বেশি হয়, কখনও কম। লকডাউন তাঁদের জীবিকার উপায় কেড়ে নিয়েছে। কারও কাজ নেই। দু'পয়সা রোজগারও নেই। আর সেই কারণেই সব বিরোধী রাজনৈতিক দল তো বটেই, বিশ্বের প্রথিতযশা তামাম অর্থনীতিবিদও বলছিলেন, সরাসরি গরিবদের জনধন অ্যাকাউন্টে বা একশ দিনের কাজ প্রকল্পে তাঁদের মজুরির যে অ্যাকাউন্ট রয়েছে তাতে টাকা পাঠানো হোক। কেন টাকা পাঠানো জরুরি? কারণ তাতে তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। সেই টাকা দিয়ে তাঁরা দৈনন্দিনের জীবন শুরু করবেন। বাজারে চাহিদা বাড়বে। সেই সঙ্গে তাঁরা কাজেও নেমে পড়বেন। সেটাই প্রকৃতপক্ষে লোকালের জন্য ভোকাল হওয়ার পথ ছিল। কিন্তু সরকার সেই প্রস্তাব শুনল না।
উল্টে প্রধানমন্ত্রী ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করে কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে খেলা করার পথ বেছে নিলেন। যার হিসাব মেলাতে গিয়ে গোঁজামিল দিতে হল কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে। কারণ, প্রথমত এটা ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজই নয়। বাজারে অতিরিক্তি নগদের যোগান বাড়াতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে যে পদক্ষেপ করেছিল তার অর্থমূল্য হল ৮ লক্ষ কোটি টাকা। সেই হিসাব ২০ লক্ষ কোটির মধ্যে ধরা হয়েছে। তা ছাড়া লকডাউন শুরু হতেই সরকার যে ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল তাও এর মধ্যে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ এই প্যাকেজ ২০ লক্ষ কোটির অর্ধেক।
তবে গোঁজামিল এখানেও শেষ নয় কিন্তু। বরং টাকার অঙ্ক নিয়ে গালভরা কালোয়াতি আরও রয়েছে। এই ২০ লক্ষ কোটি টাকার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে সরকারের খরচ কত টাকা হচ্ছে সেটাই আসল প্রশ্ন। যেমন, শ্রমিকদের সরাসরি সুবিধা দেওয়ার জন্য সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করার কথা বলা হচ্ছে। এও বলা হয়েছে, ওই টাকা দিয়ে ৮ কোটি পরিযায়ী শ্রমিককে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়া হবে। কিন্তু ঘটনা হল, সরকার ইতিমধ্যেই ৩ কোটি রেশন কার্ড বাতিল করেছে। তার মধ্যে প্রকৃত গরিবের সংখ্যাই বেশি। এ জন্য কোনও ফিজিকাল ভেরিফিকেশনও করা হয়নি। শুধু বলে দেওয়া হয়েছে ভুয়ো রেশন কার্ড। কারণ, তা আধারের বায়োমেট্রিকের সঙ্গে মিলছে না। এখন সেই সরকারই বলছে যাঁদের রেশন কার্ড নেই তাঁদের এই টাকায় খাদ্যশস্য দেওয়া হবে। প্রশ্ন হল, রেশন কার্ড নেই কেন? তার মানে দেশে যত গরিব মানুষ রয়েছেন, তাঁদের সবার রেশন কার্ড নেই! ভাবা যায়!
এখানেও শেষ নয়। সরকার যেসব তহবিল থেকে টাকা খরচ করার কথা বলছে, তার উপর কেন্দ্রের কিন্তু কোনও অধিকারই নেই। যেমন, নির্মাণ কর্মীদের কল্যাণ তহবিল, জেলা খনিজ তহবিল, কিংবা কমপেনসেটরি অ্যাফরেস্টেশন ফান্ড তথা ক্যাম্পা ফান্ড। বিশেষ করে ক্যাম্পা ফান্ড তো এর মধ্যে আসতেই পারে না। সরকার প্রথমে কর্পোরেটদের অরণ্যের জমি অধিগ্রহণের অনুমতি দিচ্ছে। সেজন্য গাছ কাটা হচ্ছে। আদিবাসী মানুষ বাসস্থানন চ্যুত হচ্ছেন। তার পর তাদের আবার বনসৃজনের কাজে লাগানো হচ্ছে। ঘটনা হল, সেই কারণে বাজেটে যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, সেই টাকাই কোভিড মোকাবিলার আর্থিক প্যাকেজ হিসাবে দেখানো হচ্ছে। আবার যেমন, কৃষকদের এককালীন ২০০০ টাকা করে দেওয়ার কথা সরকার ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাজেটে ঘোষণা মোতাবেক মার্চ মাসে কৃষকদের সেই টাকা পাওয়ারই কথা ছিল। সবাই মিলে চেপে ধরার পর তা স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী।
বাস্তব হল, এই তীব্র সংকটের মধ্যেও কৃষকদের এক পয়সাও সুবিধা দেয়নি সরকার। কোভিডের জন্য যখন চাষিদের ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, খরচ বাড়ছে, সহায়ক মূল্যের কম দামে ফসল বেচে দিতে হচ্ছে তখন সরকার কৃষিঋণ মকুবের দাবি এককথায় খারিজ করে দিচ্ছে। খাদ্যশস্যের সহায়ক মূল্য বাড়ানোর ব্যাপারে কিছু বলছে না। বরং ক্ষতের উপর নুনের ছিটের মতো সরকার শুধু হিসেব দিয়ে যাচ্ছে— গ্রামের মানুষের জন্য লকডাউনের মধ্যে কী কী করেছে সরকার। এও বলা হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শ্রমদিবস বেড়েছে একশ দিনের কাজে। অথচ প্রকল্পের ওয়েবসাইট খুলে দেখা যাচ্ছে, এপ্রিল মাসে ৫৯ শতাংশ শ্রমদিবস কমেছে। আগের বছরের তুলনায় মাত্র ৪৬ শতাংশ হাউজহোল্ড অংশ নিয়েছে প্রকল্পে।
এমনকি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প ও উদ্যোগের জন্য যে ৫ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তাও ভিত্তিহীন। খুব বেশি হলে এ জন্য সরকারের খরচ হবে ২৫ হাজার কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান নিয়ে এমন চাতুর্য সরকার দেখালে ক্যাশ ফ্লো নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। সরকার প্যাকেজের জন্য এই টাকা কোথা থেকে যোগাবে? যার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, পৃথিবীতে কোনও সরকারই নাকি এভাবে ক্যাশ ফ্লো জানায় না। সত্যিই যদি তা হয়, তা হলেও বলব অস্বচ্ছ ব্যবস্থাকে অনুসরণ করব কেন আমরা?
সরকার কেন এই গোপনীয়তা রক্ষা করতে চাইছে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কারণ, এই আর্থিক প্যাকেজের বহর কোনওভাবেই ৪ লক্ষ কোটি টাকার বেশি নয়। ২০ লক্ষ কোটি টাকার ২০ শতাংশ মাত্র। বা হতে পারে সরকারের প্রকৃত খরচ হবে এরও কম। সরকার ৮ মে যে বিবৃতি দিয়েছিল তা থেকেই এর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, সে দিন কেন্দ্র ও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল যে, কোভিডের সংকট মোকাবিলার এ বছর আরও ৪.২ লক্ষ কোটি ধার করছে সরকার। সন্দেহ নেই ধারের টাকা দিয়ে কিছুটা রাজস্ব ঘাটতিও মেটানো হবে। ফলে কোভিডের সংকট মোকাবিলার জন্য কত টাকা আর পড়ে থাকছে!
প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো থেকে বিক্ষিপ্ত ভাবে যে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, সরকার ২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি খরচ করবে না। যা আসলে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১ শতাংশ মাত্র। আর যদি ধরা যায় ৪.২ লক্ষ কোটি টাকাই সরকার খরচ করবে তাও দাঁড়ায় জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। গোটা বিশ্বে কোনও দেশ কোভিড মোকাবিলায় এত কম খরচ করেনি। তা ছাড়া রাজ্যগুলিকে সরকার কীভাবে সাহায্য করবে সেই দিশাও এখনও দেখাতে পারেনি। এমনকি পণ্য পরিষেবা কর খাতে ক্ষতিপূরণের টাকা রাজ্যগুলিকে কবে মেটানো হবে তারও কোনও স্পষ্ট জবাব দেননি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী।
বরং পরপর পাঁচ দিনে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স থেকে সরকারের একটা অভিপ্রায় খুব প্রকট ভাবেই ধরা পড়েছে। তা হল, আর্থিক সংস্কারের নামে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী নিজে শর্করার প্রলেপ-সহ সেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, চারটি L অর্থাৎ ল্যান্ড, লেবর, ল এবং লিক্যুইডিটিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু আদতে লকডাউনের ঘোলা জলের মধ্যে দেশের সম্পদের উপর পুঁজিপতিদের অধিকার আরও বাড়িয়ে দেওয়ারই চেষ্টা হচ্ছে। ৯টি রাজ্য ইতিমধ্যে শ্রম আইন বদল করেছে। কাজের সময় বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টা করেছে। তিনটি বিজেপি শাসিত রাজ্য অনেকগুলি শ্রম সংক্রান্ত আইনকে তিন বছরের জন্য স্থগিত করেছে। যার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাসে পরিণত করা হচ্ছে। কয়লা খনি ও খনন কাজে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে গায়ের জোরে জমি অধিগ্রহণের পথও প্রশস্ত করা হচ্ছে। তা ছাড়া কৃষিক্ষেত্রে সংস্কারের নামে যে ব্যবস্থা কায়েম করতে চাইছে সরকার তাতে চাষিরা শোষণের শিকার হতে পারেন।
কেন্দ্রের এই প্যাকেজ তাই স্রেফ ভাঁওতা। দেশের শ্রমিক, মজদুররা খুব শিগগির বুঝতে পারবেন, রাজার গায়ে জামা নেই।
(লেখক সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য এবং রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ, মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।)