সাম্প্রতিক কালে তামিল সিনেমার অন্যতম বড় নাম, জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর ওরফে "থলপতি" বিজয়ও (Thalapathy Vijay) সেই পথ অনুসরণ করেই রাজনৈতিক দল গড়েছেন। যে দলের নাম, তামিলাগা ভেট্ট্রি কাজাগম (TVK)।
.jpeg.webp)
শেষ আপডেট: 4 October 2025 13:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তামিলনাড়ুতে সিনেমা আর রাজনীতির সম্পর্ক বহু পুরনো। এম.জি. রামচন্দ্রন (এমজিআর) থেকে জয়ললিতা, করুণানিধি থেকে আজকের যুগ পর্যন্ত—দক্ষিণী পর্দার নায়ক-নায়িকারা বহুবার সরাসরি রাজনীতির ময়দানে নেমেছেন এবং ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছেন। সাম্প্রতিক কালে তামিল সিনেমার অন্যতম বড় নাম, জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর ওরফে "থলপতি" বিজয়ও (Thalapathy Vijay) সেই পথ অনুসরণ করেই রাজনৈতিক দল গড়েছেন। যে দলের নাম, তামিলাগা ভেট্ট্রি কাজাগম (TVK)।
কিন্তু দল গঠনের কিছু মাস যেতে না যেতেই, সেই ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ বিজয় ও তাঁর দল এখন প্রবল চাপে। শুক্রবার চেন্নাই উচ্চ আদালত তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার তীব্র ভর্ৎসনাও করেছে। কারণ, গত ২৯ অগস্ট সন্ধেয় বাংলায় যখন সপ্তমী পুজোর উৎসব পাড়ায় পাড়ায়, সেই সময়ে তামিলনাড়ুর কারুর জেলায় ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। বিজয়ের সভায় পদপিষ্ট হয়ে মারা যান ৪১ জন। ভিড় সামলাতে না পেরেই ঘটে যায় এই বিপর্যয়। যে বিপর্যয় থলপতিকে সিংহাসন থেকে নামিয়ে এনে একেবারে কাঠগড়ায় তুলেছে। তামিল সিনেমার সর্বজনপ্রিয় তারকা ব্যাট হাতে রাজনীতির পিচে নেমেই ঘূর্ণি বলের মুখে পড়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে—তাঁর তারকা খ্যাতি কি আদৌ প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর জন্য যথেষ্ট?
তামিলনাড়ুতে সিনেমা কখনওই নিছক বিনোদন ছিল না। এমজিআর তাঁর পর্দার চরিত্রের নায়কোচিত গুণাবলীকে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁর সংলাপ, তাঁর গান—সবই রাজনীতির হাতিয়ার হয়েছিল। জয়ললিতা আবার নারীত্ব, রাজকীয় ব্যক্তিত্ব আর শাসনকৌশল দিয়ে গড়েছিলেন নিজের শক্ত ঘাঁটি।বিজয়ও সেই ধারা অনুসরণ করেছেন। তাঁর জনপ্রিয় চলচ্চিত্র যেমন মের্সাল, মাস্টার বা লিও—সব ছবিতেই তিনি দুর্নীতিবিরোধী নায়ক, শোষিত মানুষের রক্ষক, এবং সমাজের জন্য দাঁড়ানো এক "থলপতি"। ফলে, তাঁর ভক্তসমাজ স্বাভাবিক ভাবেই ভেবেছিল যে রাজনৈতিক মঞ্চে বিজয় তাঁদের মুক্তির নায়ক হয়ে উঠবেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দল গঠন করেন, তখন যুব সমাজ ও গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে প্রবল উচ্ছ্বাসও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজনীতি শুধুই হাততালি বা তারকার সংলাপে চলে না। কারুরের ঘটনায় যেন সাপ-লুডোর খেলায় সাপের মুখে পড়েছেন বিজয়। একদিকে শোকাহত পরিবারগুলোর আর্তনাদ, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর কড়া আক্রমণ—সব মিলিয়ে "তারকা রাজনীতি"র জৌলুস মুহূর্তে যেন ফিকে হয়ে গেছে।
ভারতে বহু সময়েই রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা মাপা হয় সমাবেশের ভিড় দেখে। যত বেশি মানুষ, প্রমাণিত হয় তিনি তত বেশি জনপ্রিয় নেতা বা নেত্রী। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি যে অনেক সময়েই বিপজ্জনক, কারুরের ট্র্যাজেডি আসলে সেই সংস্কৃতির নগ্ন উদাহরণ। সেখানে ভিড় ছিল তারকার প্রতি অন্ধ ভক্তির বহিঃপ্রকাশ। ভিড় সামলাতে না পারা ছিল প্রশাসনিক ব্যর্থতা। আর মহিলা ও শিশুসহ ৪১ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ছিল হলো এক বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন—তাহল রাজনীতিতে ভিড়ের মাপকাঠিকে মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। এমন ঘটনা কেবল তামিলনাড়ু নয়, ভারতের নানা প্রান্তে ঘটে। ধর্মীয় মেলা, রাজনৈতিক র্যালি কিংবা চলচ্চিত্র-তারকার অনুষ্ঠান—ভিড়ের নিরাপত্তা প্রায়শই অবহেলিত থাকে। বিজয়ের সভা তার নবতম উদাহরণ।
পর্দায় বিজয় ন্যায়বিচারের যোদ্ধা। দুর্নীতিবাজ নেতা, অত্যাচারী পুলিশ বা অপরাধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তাঁর সিনেমার নিত্য ঘটনা। কিন্তু বাস্তবে রাজনীতির ময়দানে তিনি একেবারেই নতুন। কারুরের ঘটনার পর তাঁর উদ্দেশে সরাসরিই প্রশ্ন উঠেছে—এমন ভিড়ই তো তিনি চেয়েছিলেন, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখেননি কেন? একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের মতো কি টিভিকে নিরাপত্তা প্রটোকল ঠিকঠাক মানছিল? তারকা হিসেবে ভক্তদের উত্তেজনা আগেই আন্দাজ করা উচিত ছিল না কি?
ভারতীয় সমাজে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, তারকাদের প্রতি ভক্তি অনেক সময়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের মতোই গভীর। সেই ভক্তিকে রাজনীতির কাজে লাগানো সহজ, কিন্তু বিপদও ঠিক ততটাই বড়। অনেকের মতে, কারুরের ঘটনা দেখিয়ে দিল—যখন ভক্তি উন্মাদনায় রূপ নেয়, তখন সমাজের দুর্বলতাই সামনে আসে। ভক্তরা নেতার (পড়ুন নায়কের) কথাকে প্রশ্ন না করেই অন্ধ অনুসরণ করেন। আর প্রশাসনও অনেক সময়ে তারকা-প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক শুধু নয় বিপজ্জনকও বটে। কারণ তা যুক্তি ও নীতির চেয়ে ব্যক্তিপুজোকেই দুধ জল দেয়।
পর্যবেক্ষকদার আর এক অংশ মনে করেন, অতীতে রাজনৈতিক নেতারা দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসতেন। এক দিনে রাতারাতি নেতা হয়ে যেতেন না। ফলে যে কোনও সভা আয়োজনের সময়ে সমর্থক বা সভায় আসা মানুষের সুবিধা অসুবিধার ব্যাপারটা তাঁদের নখদর্পণে থাকত। কিন্তু এখন সেই সহনশীলতা বা অধ্যাবসয় নেই। সবাই রাতারাতি নেতা হতে চায়। মাটির সংস্পর্শে না থাকা, বাস্তব সম্পর্কে সম্যক ধারণার অভাব আর ইভেন্ট কোম্পানি নির্ভর রাজনীতিই এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী।
কারুরের ট্র্যাজেডি তাই নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি বিজয়ের রাজনৈতিক জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। বিজয় যদি এই দুঃখজনক ঘটনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ন্যায়বিচার ও আর্থিক সাহায্য দেন এবং তাঁর দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ নেন—তাহলে তিনি রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবেন। কিন্তু যদি তিনি শুধুই তারকার মতো দূর থেকে বক্তব্য রাখেন, তবে জনগণ শীঘ্রই বুঝে যাবে যে থলপতি কেবল পর্দার নায়ক, বাস্তবে তিনি নেতা নন।
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, কারুর—এই তারিখটি শুধু টিভিকের নয়, তামিল রাজনীতির ইতিহাসে এক সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে। এটি শিখিয়ে দিল—নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধ ছাড়া রাজনীতি কেবল বিপদের কারণ। সমাজকে তারকা পূজা আর রাজনৈতিক শাসনের মধ্যে পার্থক্য শিখতে হবে।বিজয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো অমীমাংসিত। তিনি দক্ষিণী রাজনীতিতে নতুন এক শক্তি হবেন, নাকি শুধু এক তারকা-অভিযানের ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় হয়ে থাকবেন, তা নির্ভর করছে এই ট্র্যাজেডি সামলানোর উপর। একই সঙ্গে এটি আমাদের সমাজকেও প্রশ্ন করছে—আমরা কি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠান ও নীতির ভিত্তিতে গড়তে চাই, নাকি অন্ধ ভক্তির ঢেউয়ে ভেসে যেতে চাই?