
শেষ আপডেট: 10 May 2020 08:30
এই সময়ে একজন নার্স হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার সুবাদে যে অভিজ্ঞতা, অনুভূতির সম্মুখীন হয়েছি সেই অভিজ্ঞতা আজ শেয়ার করতে চাই সবার সঙ্গে। ডিউটি শেষে হস্টেলের ঘরে যখন একা, তখন মাঝে মাঝে হাসপাতালের ফোন ছাড়া তেমন কোনও কাজ নেই। এর মধ্যেই একদিন সুরজিৎ ও বন্ধুরা-র ফেসবুক পেজে সুরজিৎদার ডাকে লাইভে ছিলাম গান নিয়ে আর একদিন অনলাইন গানের ক্লাস। এই খারাপ সময়েও গানই আমার ভাল থাকার টনিক। কাজহীন চুপচাপ বসে থাকলে এমনিতেই মাথায় আসে রাজ্যের চিন্তা, তার কোনওটা নেহাতই হাস্যকর, উদ্ভট বা কোনওটার অবস্থান আমার নাগালের এতটাই বাইরে যে, শুধুই অকূল ভেবে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
কোভিড-১৯ থাবা বসিয়েছে গোটা পৃথিবী জুড়েই। লকডাউনের কারণে বিশ্বের উন্নত দেশগুলির অর্থনীতিও নিম্নগামী, বিধস্ত। সেখানে আমাদের মতো এক গরিব দেশ যেখানে লক্ষ কোটি মানুষের দু’বেলা খাবার জোটে না, সেখানকার অবস্থা কত করুণ হয়ে উঠবে তা বোঝার জন্য অর্থনীতির এনসাইক্লোপিডিয়া হবার দরকার পড়ে না। অর্থনীতিবিদদের বিচার বলছে, বেসরকারি ক্ষেত্রে চাকরি হারাতে চলেছেন অন্তত ১৮ থেকে ১৯ কোটি মানুষ। আমরা আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে যেতে পারি প্রায় ৩ থেকে ৪ দশক। মহামারী বিদায় নিলেও, লকডাউন কেটে গেলেও কাজহীন মানুষ, অর্থহীন মানুষদের দু’বেলা অন্নের সংস্থান কী করে হবে সেটাই ভীষণ অনিশ্চিত। কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ এখন এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের সামনে দোদুল্যমান।
অথচ এর মধ্যেও অরাজকতার, অনৈতিকতার অবস্থান ভীষণরকম প্রকট। টেস্ট কিট PPE-র কোয়ালিটি, পর্যাপ্ত যোগান, কেন্দ্র-রাজ্য টানাপোড়েন ও নির্লজ্জ দ্বৈরথ চোখে আঙুল দেখিয়েছে বারবার। একই রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ব্যবস্থাপনায় ভিন্নতা সরকারি হাসপাতালগুলোয়। যে জায়গাটি শুধুমাত্র কোয়ারেন্টাইন সেন্টার হিসেবে শুরু হয়েছিল, মূলত রাখা হয়েছিল কেষ্টবিষ্টুদেরই, সেখানে রীতিমতো স্টারমার্কা হোটেলের আপ্যায়ন। এখন যদিও কোয়ারেন্টাইন নাম ছেড়ে সেটি পুরোপুরি কোভিড হসপিটাল, তবুও সেই রীতি চলে আসছে। যে দেশের অসংখ্য মানুষ পেটে পাথর চাপা দিয়ে খিদে ভুলতে চাইছে, সেই দেশেই একটি নির্দিষ্ট হাসপাতালে চলছে এলাহি খানা। এক বিশিষ্ট পরিবারের রোগীর জন্য পাঠাতে হচ্ছে ঘি মাখানো রুটি, খসখসে শুকনো খাবার তাদের গলায় নামে না। রোগী, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ভিটামিন সি ট্যাবলেটের (যার বাজার দর খুব সামান্যই) যোগান নেই, অথচ রোজ দু’বেলা পৌঁছে যাচ্ছে হারবাল চা (এর মূল্য নিশ্চয় অনেকেরই জানা)। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, অন্য হাসপাতালগুলোয় করোনা রোগীদের জন্য এই এলাহি আয়োজনের ব্যবস্থা কিন্তু নেই।
মাঝে মাঝেই উপরমহল থেকে ফোন আসছে, কোনও নির্দিষ্ট বিশিষ্ট রোগীর খবর জানতে চেয়ে। এত কাজের চাপের মধ্যেও সবাই তখন তটস্থ হয়ে যোগাড় করছি খবরাখবর। ক্ষমতার কী অপপ্রয়োগ! একটা হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা যারা একই অসুস্থতায় আক্রান্ত, যারা একই দেশের নাগরিক তাদের সকলের মানবিক অধিকার, বিশেষ সুযোগ কি একই রকম হওয়া উচিত নয়, অন্তত এই মহামারীর সময়ে? সেখানে কিছু নির্লজ্জ প্রভাবশালী কারণে-অকারণে দিন নেই রাত নেই ফোন করে বিরক্ত করছেন স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকদের আর তাঁরাও প্রয়োজন বা গুরুত্ব বিচার না করেই ব্যতিব্যস্ত করছেন হাসপাতালগুলোকে। এই অব্যবস্থা মনে হয় এদেশেই সম্ভব, কারণ ক্ষমতাধারীরা অনেকেই ক্ষমতা পেয়েছেন প্রভাবের করুণায়। তাই আসন ঠিক রাখতে খোশামোদ করতেই হবে, তা যেকোনও মূল্যেই হোক না কেন!
মহামারী ঠেকানোর বিপুল খরচের সামাল দিতে ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু পদক্ষেপ। ঘোষণা হয়েছে আগামী একবছর প্রত্যেকমাসে সরকারি কর্মচারীদের একদিনের মাইনের টাকা কেটে নেওয়া হবে, কেন্দ্র এই সময়ে বাড়াবে না কোনও ডিএ, রাজ্যও যে দেবে না সেটা ঘোষণার অপেক্ষা আর রাখে না। ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্ট, ফিক্সড ডিপোজিট, পিএফ সব কিছুতেই কমানো হয়েছে সুদের হার। অথচ যে মহামানবেরা লক্ষ কোটি টাকার ঋণখেলাপ করেছেন, তাদের সম্পত্তি রয়েছে সুরক্ষিত। যাদের হাজার হাজার কোটি টাকার ট্যাক্স মকুব করা হয়েছিল, এই দুর্দিনে তাদের থেকে সেই ট্যাক্সের টাকা ফেরত নিলে হয়তো মেরামত করা যেত অর্থনীতির ধস।
এইসব চিন্তা মাথায় এলে নিজেকে কেমন পাগল পাগল মনে হয়। অসহায়তায় কুঁকড়ে যেতে থাকি। না পারি চিন্তার জট থেকে বেরোতে, না পারি গলা ফাটানো চিৎকারে ক্ষমতায় আসীনদের কানে যন্ত্রণার কথা পৌঁছতে। মহামারীর সুযোগে অনেক জায়গাতেই দাম বেড়েছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের। সরকার যদিও দাম বেঁধে দিয়েছে, তবুও সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনেক জায়গাতেই চলছে কালোবাজারি। এরপর লকডাউন কেটে গেলে পরিস্থিতি কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে ভাবলেই শিউরে উঠি। তখনও অজস্র মানুষ দিন দিন আরও নিঃস্ব হবে আর কিছু মানুষ ফুলেফেঁপে উঠবে মুনাফায়।
কেউ কেউ করোনার সংক্রমণে গন্ধ পেয়েছিলেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের। না, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি। আরও অন্ধকার নেমে এলে, দুর্ভিক্ষের কবলে পড়া মানুষের পেটে জ্বলতে থাকা আগুন যদি তাদের মন, মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছয়, একত্রিত আন্দোলনে তারা কেড়ে নিতে চায় খাবারের অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার সেদিন শুরু হবে সত্যিকারের যুদ্ধ। জানি না ওই হতভাগ্য মানুষগুলো কোনওদিন শক্ত করে ধরে রাখা মুঠো আকাশে ছুড়ে গর্জে উঠবে কি না, জানি না দেশের সব মানুষের মুখে খিদের খাবার পৌঁছবে কি না। শুধু জানি, এই অসম্ভবের চিন্তায় জট পাকাতে পাকাতে অপারগ বসে আছি, গুনছি মৃত্যুর মুখ আর চোখের সামনে ভেসে উঠছে যুদ্ধ-পরবর্তী শ্মশানের স্তব্ধতা।
(নাসরিন নাজমা পেশায় সিস্টার টিউটর। গান ভালবেসে গান। মতামত ব্যক্তিগত।)