শনিবার রাত প্রায় ১২ টা। গাড়িতে চড়ে ই এম বাইপাস ধরে ফিরছিলেন এক দম্পতি। তাঁরা হলেন নীলাঞ্জনা চট্টোপাধ্যায় ও দীপ শতপথি। সঙ্গে ছিল তাঁদের মেয়ে। তাঁদের গাড়ি যখন রুবি হাসপাতালের কাছে, তখন কানে এল একটি মেয়ের চিৎকার। বোঝা গেল, কাছেই কেউ বিপদে পড়েছে। তাঁরা দেখেন, তাঁদের মারুতি অলটো গাড়ির পিছনেই আসছে একটি হন্ডা সিটি। তার ভিতর থেকেই চিৎকার ভেসে আসছে।
নিঝুম রাতে বাইপাসে অমন চিৎকার শুনলে হয়তো অনেকেই ঝামেলায় জড়াতে চাইতেন না। না শোনার ভান করে চলে যেতেন। কিন্তু নীলাঞ্জনারা তা করেননি।
দীপ শতপথি তখন পথে তাঁদের মারুতি অলটো গাড়িটি এমনভাবে দাঁড় করান যাতে হন্ডা সিটি গাড়িটিও থামতে বাধ্য হয়। তখনই গাড়ির দরজা খুলে এক তরুণীকে ঠেলে ফেলে দেন চালক। নীলাঞ্জনা গাড়ি থেকে নেমে দেখতে যান তরুণীর কী হল। হন্ডা সিটি গাড়িটি ইউ টার্ন করে পালাতে চেষ্টা করে। তখন গাড়ির একটি চাকা নীলাঞ্জনার পায়ের ওপর দিয়ে চলে যেয়। তাঁর মাথাতেও আঘাত লাগে।
যে তরুণীকে গাড়ি থেকে ঠেলে ফেলা হয়েছিল, তিনিও আঘাত পেয়েছেন। নীলাঞ্জনারা সাহায্যে এগিয়ে না এলে তাঁর ভাগ্যে নিশ্চয় আরও খারাপ কিছু ঘটত।
আমাদের দেশে যৌননিগ্রহ ও ধর্ষণের সংখ্যা যথেষ্ট বেশি। একটি হিসাবে দেখা যায়, ভারতে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন মহিলা ধর্ষিতা হন। শ্লীলতাহানির হার এর চেয়ে কম নয়। হয়তো বেশিই। বহু ক্ষেত্রে যৌন নিগ্রহের শিকার মেয়েটি নিজেই অপরাধের কথা গোপন করে। কারণ জানাজানি হলে অনেক সময় মেয়েটিকেই দোষ দেওয়া হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাকে হীন চোখে দেখে।
আমাদের দেশে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ও মেয়েদের বিরুদ্ধে ঘটে চলা অন্যান্য হিংসার বিরুদ্ধে কড়া আইন আছে। কিন্তু তাতেও ওই ধরনের অপরাধ কমেছে বলে প্রমাণ নেই। আসলে শুধু আইন করে এই সমস্যার সমাধান করা যায় না। নারীনিগ্রহ ঠেকাতে পুলিশকে নিশ্চয় আরও তৎপর হতে হবে। সেই সঙ্গে তৎপর হতে হবে সাধারণ মানুষকেও।
একটি মেয়ে যে কোনও জায়গাতেই বিপদে পড়তে পারে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষায়তনে, যানবাহনে, কর্মস্থলে এমনকি বাড়িতেও সে যৌন নিগ্রহের শিকার হতে পারে। অনেক ঘটনার বীভৎসতায় সবাই চমকে ওঠে। পথে নেমে আন্দোলন হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে সব স্তিমিত হয়ে আসে। এমন হলে চলবে না। নারী নিগ্রহ ঠেকানো কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। প্রত্যেক নাগরিককেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ যে কোনও পরিবারের মেয়েই বিপদে পড়তে পারে।
পথেঘাটে, অফিসে বা অন্যত্র কোনও মেয়ে বিপদে পড়েছে দেখলেই তাকে সাহায্য করতে হবে। আক্রমণকারীকে ঠেকাতে হবে। দ্রুত পুলিশকে খবর দিতে হবে। নীলাঞ্জনা চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্বামী এই কাজটিই করেছেন। নিশুতি রাতে বাইপাসের মতো নির্জন জায়গায় তাঁদের আরও বড় বিপদ হতে পারত। কিন্তু তাঁরা ভয় পাননি। তাঁদের উদাহরণই সকলকে অনুসরণ করতে হবে।