
শেষ আপডেট: 3 October 2023 18:45
সাম্প্রতিক অতীতে সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা এই উপমহাদেশ জুড়েই যে আক্রান্ত তার একটি হাতে গরম প্রমাণ পাওয়া গেল বাংলাদেশে। দুই দুষ্কৃতীর প্রহারে ভয়ঙ্করভাবে জখম হয়েছেন কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার স্বভাব কবি রাধাপদ রায়। তাঁর বয়স ৮০ বছর। মানুষ কতখানি নির্মম হলে এক অশীতিপর ব্যক্তিকে শারীরিক নিগ্রহ করতে পারে তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। অবাক লাগে এটি ভাবলেও যে, আশি বছরের এক বৃদ্ধ আক্রান্ত, কিন্তু এখনও পর্যন্ত দুই অপরাধীর কেউই গ্রেফতার হয়নি। এ সত্যিই দুর্ভাগ্যের।
যেটুকু জানা গেছে তাতে ছ-মাস আগে একটি সালিশি সভায় রাধাপদ রায়ের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল কদুর আলির। সেই বাকবিতণ্ডার জেরেই ছ-মাস পরে রাধাপদ রায়কে আক্রমণ করে কদুর আলি এবং তার ভাই রফিকুল ইসলাম। এ যেন ভারতবর্ষের একটি গ্রামেরই ছবির উল্টোপিঠ মাত্র! এ দেশেও ছোটোখাটো সমস্যা মেটাতে আজও গ্রামে বসে সালিশি সভা। সরকারি বিচারব্যবস্থার সমান্তরালভাবে চলতে থাকে আর এক বিচার ব্যবস্থা। মানুষ হামেশাই আইন তুলে নেয় নিজেদের হাতে। ঝামেলাঝঞ্জাট সালিশি সভা পার করেও চলতেই থাকে।
বলা যেতেই পারে যে, রাধাপদ রায়ের ওপর আক্রমণের ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সে কথা বলতে গিয়েও থমকে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশের ২৫জন বিশিষ্ট নাগরিকের স্বাক্ষর সম্মিলিত একটি বিবৃতি পাঠ করে। এই ঘটনার অব্যবহিত পরে সংবাদমাধ্যমের হাতে তুলে দেওয়া সেই বিবৃতিতে যাঁরা সই করেছেন তাঁরা বলেছেন, 'প্রতিটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা এ ধরনের ঘটনা বৃদ্ধির জন্য দায়ী।' বিবৃতিটিতে আরও বলা হয়েছে, 'সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ করে দেওয়ার যে আয়োজন দেশব্যাপী চলছে, তার সাথে এই ঘটনাকে পৃথক করে দেখার কোনও সুযোগ নেই। যে কোনও কারণ বা প্রকারেই এ ধরনের ঘটনা ঘটুক না কেন, এর পেছনে একটি বৃহৎ শক্তি রয়েছে, যারা দেশ থেকে সংস্কৃতিচর্চা নির্বাসনে পাঠাতে চায়, যারা রাধাপদ রায়ের মতো সংস্কৃতিসেবীদের একের পর এক আক্রমণ করে চলেছে।
সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষপোষণকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দিন দিন যত বাড়ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকর্মী কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন বাড়েনি। বরং জাতীয় সংস্কৃতিক আয়োজনকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে।'
এইরকম একটি বিবৃতি সত্যিই আশঙ্কা জাগায়। আমরা যারা দূর থেকে বাংলাদেশের সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকি, মৌলবাদের বিরুদ্ধে সেই সরকারের অবস্থানকে আপোসহীন মনে করে সাধুবাদ জানাই, এইরকম একটি বিবৃতি তাঁদের বিচলিত করবার জন্য যথেষ্ট।
বিবৃতিটি পড়লে বোঝা যায় যে, পড়শি দেশটিতে মৌলবাদীরা আবারও যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে উঠেছে, মৌলবাদ দমনেও প্রশাসনের পক্ষে গাফিলতি রয়েছে। হতেই পারে যে, রাধাপদ রায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি সত্যিই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তাঁকে যারা আক্রমণ করেছে তারা আদৌ মনে রাখেনি যে, তিনি একজন কবি। এটিও হওয়া খুবই সম্ভব যে, পুরনো শত্রুতার জেরেই আক্রান্ত হয়েছেন রাধাকান্ত রায়। তিনি নিজে এবং তাঁর পুত্র দুজনেই ওই আক্রমণের জন্য সালিশি সভার বাকবিতণ্ডাটিকেই কারণ হিসেবে দর্শিয়েছেন।
এটাও ঠিক যে, এই ধরনের একটি ঘটনার গায়ে ধর্মের রং লাগানো উচিত নয়। কিন্তু যা উচিত সেই কাজ মানুষ সব সময় করে কি? ইতিমধ্যেই এদেশের হিন্দু বাঙালিদের একটি অংশ ঘটনাটির গায়ে সাম্প্রদায়িকতার রং লাগিয়ে প্রচার করতে শুরু করে দিয়েছেন। রাধাকান্ত রায়কে আক্রমণ করেছে যে দুই দুষ্কৃতী, তাদের গ্রেফতার করতে যত দেরি হবে, তত এই ধরনের প্রচার বেগবান হবে। এর কারণ এই যে, এই ঘটনাটিতে দুষ্কৃতীদমনে বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি ইতিমধ্যেই প্রমাণিত, তদুপরি ধর্মপরিচয়ে আক্রান্ত হিন্দু এবং আক্রমণকারীরা মুসলিম।
ভুলে গেলে চলবে না যে, একটি দেশে সংখ্যালঘু নিগৃহীত হলে তাকে নিরাপত্তা ও সুবিচার দেওয়ার বাড়তি দায়িত্ব থাকে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় এবং সরকারের ওপর। আশা করি, বাংলাদেশের সুস্থচেতনাসম্পন্ন মানুষ ও প্রধানমন্ত্রী এই কর্তব্যটির গুরুত্ব বিস্মৃত হবেন না৷ একটি কথা তো ঠিকই যে, মৌলবাদের মোকাবিলায় সংস্কৃতিই প্রকৃত কার্তুজ।