
শেষ আপডেট: 8 May 2020 11:25
“আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপমান মনে করি”। --সভ্যতার সংকট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ যখন কোভিডের প্রভাবে সারা বিশ্বের সঙ্গে ভারতেও বেড়ে চলেছে মৃত্যুমিছিল, যখন অতিমারী এবং অনাহার-- এই দুইয়ের প্রকোপেই ভারতে আসতে চলেছে এক প্রবল বিপর্যয়, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভ্যতার সংকটের এই আশাবাদ-ই এখনও আমাদের লড়াই করতে প্রেরণা দিতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়তো এই ভয়ঙ্কর অবস্থাকে দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তিনিও তো দেখেছেন বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বিউবোনিক প্লেগের মারণাত্মক প্রলয়, দেখেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক রূপ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক সামাজিক এবং ‘মানসিক’ জীবনে এক প্রবল অস্থিরতা। দেখেছেন ১৯১৮ সালের ভয়ানক স্প্যানিশ ফ্লু, যার জেরে সারা বিশ্বেই মারা গিয়েছিলেন দশ কোটিরও বেশি মানুষ। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে না দেখে যেতে পারলেও (ভাগ্যিস দেখেননি), অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এক মহাপ্রলয়ের কথাও। সভ্যতা যে তুলনাবিহীন সংকটের আবর্তে পড়ে গেছে, তা রবীন্দ্রনাথের কাছে অধরা অজানা ছিল না। তিনি এই সংকট থেকেই পরিত্রাণের উপায় খুঁজেছেন। কিন্তু তিনি এও জানতেন, এই পরিত্রাণের উপায় একা খোঁজা সম্ভব নয়। এ এক সমষ্টিগত অন্বেষণের বিষয়। তাই, যে জায়গা থেকে কাফকা দেখেন মানুষ একেকটি পোকা হয়ে গেছে, সেই জায়গা থেকে সংকটকে অনুধাবন করলেও তিনি এই পোকা-অস্তিত্বটিকে মেনে নিতে পারেননি। আসলে একটি কোনও বড় ধাক্কা মানুষকে কিছুটা হলেও প্রজ্ঞার কাছাকাছি নিয়ে আসে। এ কথা ঠিক, হয়তো সব মানুষকে সমানভাবে সেই প্রজ্ঞার আলো আলোকিত করে না। কিন্তু আশা করাই যায়, এই প্রজ্ঞার আলো অল্প সংখ্যক মানুষের আকাশকেও উন্মুক্ত করে। তাঁদের জীবন পালটে যায়।
যখন আমাদের জীবন আবর্তিত হচ্ছে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত ব্যক্তিদের পরিসংখ্যানে, কী করে বাঁচবে লোকে তার রাস্তা খোঁজার জন্য, যখন আমরা একই সঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে আছি যেমন, তেমনই দেশের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন, তাঁরা জানেনও না কীভাবে তাঁদের দিন কাটবে, তখন, অন্ধকারের এই কবরে শুয়ে পড়া খুব সহজ কাজ না হলেও সোজা কাজ। কিন্তু এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে অন্য পথে না হাঁটলে তো আমরা ভোরের আলো যখন ফুটবে, তাকেও যেমন দেখতে পাব না, তেমন নরকেও যে সূর্যোদয় হয়, তাকেও দেখতে পাব না। অন্ধকারকেও তো ভাল করে জানা জরুরি। আমরা এমন একধরনের ডিসটোপিয়ার মধ্যে দিয়ে চলেছি, যেখানে আমাদের প্রত্যেকের জীবনই খুব অনিশ্চিত। কিন্তু এই অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্কের পরিবেশ আমাদের ক্রমশ করে তুলছে অসুস্থ। আমরা সামাজিকভাবে যে ঘেরাটোপ এবং আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গেলাম, তা থেকে কবে বেরোতে পারব তা জানি না। কারণ করোনা শুধুমাত্র ভাইরাস ঘটিত অসুখ-মাত্র নয়, করোনা একধরনের ট্রমার নামও বটে। সভ্যতার নানাবিধ সংকট যখন আমাদের জীবনকে গ্রাস করেছিল, তখন আমরা যে জগতে এসে পড়লাম তা হল সংকটের সভ্যতা। এই সংকটের সভ্যতায় আমরা হয়ে উঠতে চলেছি আরও অনেক বিচ্ছিন্ন। অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। অনেক বেশি কুয়োর ব্যাঙ। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের এমনিতেই অনেক বেশি দূরত্ব ছিল। প্রকৃতি হাতে ধরে এই সময়ে আমাদের শিখিয়ে দিল প্রকৃতির ওপর নির্যাতন করলে প্রকৃতি কীভাবে নিজেকে বাঁচাতেই একধরনের ডিফেন্স মেকানিজম তৈরি করে ফেলে। কিন্তু এই ভাইরাস থেকে প্রতিটি মানুষ নিজেকে রক্ষা করার জন্য নিয়মকে যদি কুসংস্কারে পরিণত করে ফেলে, তাহলে আগামীদিনে প্রকৃতির থেকেও আমাদের দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে। মানুষের সঙ্গে তো বটেই। তাহলে প্রশ্ন আসে, একজন ব্যক্তিমানুষের জীবন কী কী নিয়ে আবর্তিত হবে? তার জীবনকে অনুভব করার বিষয় হিসেবে কী কী পড়ে থাকবে? সোশ্যাল মিডিয়া? ইন্টারনেট? ডিজিটাল দুনিয়া? কোথায় আশ্রয় নেবে মানুষ? কোথাও আশ্রয় পাবে না। এই ডিজিটাল জঙ্গলে মানুষ একা একা ঘুরে বেড়াবে। অর্থহীন অবান্তর কথা বলে যাবে নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণার জন্য। আর এই সমস্ত কিছুই তাকে আরও বেশি অপ্রাসঙ্গিক এবং অবান্তর করে তুলবে। আত্মহত্যার হার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে মানুষের মধ্যে।
সুতরাং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সভ্যতার সংকটের কথা বলেছিলেন, তা যেন আজকের সংকটের সভ্যতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। সভ্যতার সংকটের প্রতিটি ইটের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে আজকের সংকটের সভ্যতা। আর এই সংকটের সভ্যতায় আমরা জল থেকে উঠে আসা মাছের মতো হাঁকপাক করে মরছি কী করে বাঁচব! একসঙ্গে বাঁচার জন্য যে একা একা বাঁচার অভ্যেস তৈরি হচ্ছে, তা যেন আমাদের আরও বেশি অন্ধকারে ঠেলে না দেয়। মানুষ যদি মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েই ফেলে আর মানুষের আচার-আচরণের মধ্যে যদি এভাবে থাবা মারে শ্বাসরোধী যাপনের এক ভবিষ্যৎ, তবে তা যে আরও এক সংকটের সভ্যতা তৈরি করবে সে বিষয়ে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু এই বিষয়ে এখন ভাবার সময় সম্ভবত নয়। তাই কেউ ভাবছেন না। কারণ এখন মুখ্য বিষয় হল করোনার দ্বারা যেন আক্রান্ত না হই। যেন করোনার প্রকোপ কমে। তাতে মানুষ এতটাই দিশেহারা যে অন্য কিছু ভাবার তার আর অবসর নেই। এমনকি এও মনে হচ্ছে, করোনায় আক্রান্ত হওয়া ছাড়া আর অন্য কোনও অসুখও নেই। কোনও সমস্যাই তো আর চিরস্থায়ী হতে পারে না। কিন্তু মানুষকে আবার ফিরে আসতেই হবে কালান্তর, সভ্যতার সংকট জাতীয় প্রবন্ধের কাছে। যে জায়গা থেকে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, “মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপমান মনে করি”, সেই ভাবনাকে আয়ত্ত করতে পারলে মানুষ অনেকটাই এই ভয়ংকর পর্যায় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে বলে আশা করাই যায়। কারণ, পরাভব এখন আমাদের হলেও, তা প্রতিকারহীন নয়। আর তা মনুষ্যত্বের পরাভব নয়। আমাদের পরাজয় হলেও আমাদের মনুষ্যত্বের যেন পরাজয় না হয়। আমরা যেন বাঁচার জন্য ডিসটোপিয়ান সময়ের সায়েন্স ফিকশন বর্ণিত অবস্থার মতো করে মানুষকেই আক্রমণ না করি, যেন মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান বজায় থাকে, যেন এ পৃথিবীটা সকল মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠে। কিছু মানুষ বল্গাহীন আনন্দে বেঁচে রইলেন অথচ বেশিরভাগ মানুষ চরম দুঃখে অনাহারে আতঙ্কে অপমানে মারা গেলেন, এই পৃথিবী আমরা চাই না। কারণ এই পৃথিবী মূলত মনুষ্যত্বের প্রতি অপমানের পৃথিবী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায় সত্যের এই আশাবাদই আমাদের প্রেরণা দেয়। কিন্তু এই আশাবাদের সত্য অর্জনের রাস্তাটি কঠিন। তার জন্য স্রোতের বিরুদ্ধে একটু ঝুঁকি তো নিতেই হবে। মানুষ প্রস্তুত তো?
(বেবী সাউ কবি, গদ্যকার ও প্রাবন্ধিক।)