
শেষ আপডেট: 11 December 2019 10:55
একটা ফ্রেম ভেবে ফেলুন চট করে। একজন পরাক্রমশালী রাজার রাজত্বে একটি ছোট পাঠশালা। পাঠশালার পণ্ডিতরা বেশিরভাগই রাজার অনুগত। কিন্তু সমস্যা বাঁধাচ্ছে একঝাঁক কচিকাঁচারা। বয়স হবে ১৮, ১৯ বা ২০। মাথা ভর্তি গিজগিজে প্রশ্ন। জিজ্ঞেস করছে, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ জিজ্ঞেস করছে, যখন লাখো লাখো মানুষ অনাহারে মরে, তোর বাড়িতে রোশনাই হয় কীভাবে?
রাজার বেত, লাঠির বাড়ি চুপ করাতে পারছে না। থামছে না অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো। বরং ৫ থেকে ১০, ২০ থেকে ২৫, ১০০ ছুঁয়ে আরও বাড়িয়ে নিচ্ছে নিজেদের পরিধি। জোরালো হচ্ছে আওয়াজ। রাজা বেগতিক দেখে বন্ধ করে দিচ্ছে পাঠশালা। দেওয়ালে লিখে দিচ্ছে বড় বড় অক্ষরে, 'যে যত জানে, সে তত কম মানে।' আর সেই দেওয়ালেই চক–খড়ি তে কারা লিখে দিয়ে এসেছে, 'শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব।'
এই গল্পটা আপনার চেনা। সত্যজিৎবাবু শুনিয়েছেন এরকমই এক আখ্যান । পশ্চিমবঙ্গের সুদূর মফস্বল থেকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর এই গল্প আপনাকে শুনিয়ে আসছে বিগত কয়েক দশক ধরে।
পতাকার রঙ, স্লোগানের কবিতা অথবা চেনা মুখেরা বদলে গেলেও এই গল্পগুলোর গায়ে বয়সের আঁচ লাগেনি। কেন জানেন? কারণ ওই খেটে খাওয়া পরিবারের প্রথমবার ইস্কুলের মুখ দেখা সইফুদ্দিন মোল্লারা তাদের রক্তের তেজে বারবার নতুন জীবনীশক্তি দিয়েছে এই গল্পগুলোকে। কম পয়সায় ভালো শিক্ষা, সবার জন্য –– জাতপাত নির্বিশেষে শিক্ষার অধিকার, হক কথা সোচ্চারে বলবার অধিকার ছাড়া কিন্তু সুদীপ্ত, তিলক টুডুরা কিছুই চায়নি। তবু তারা শাসকের চক্ষুশূল। কারণ গরীবগুর্বো, চাষার ব্যাটা, মজদুর, আদিবাসী, মুসলমানের মেয়েরা লেখাপড়া করলে সমস্যা বেশি। তারা খালি পেট দেখিয়ে জানতে চায় শাসকের ভুঁড়ির রহস্য। আরও জানলে আরও বুঝলে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যা প্রাপ্য। আর সেখানেই সব গন্ডগোলের শুরু।
রায়বাবুর 'হীরক রাজা' থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদী—ভর্তুকির বিদ্যেকে ভয় পান। যতদিন শিক্ষা কাচের বয়মে আচারের মতো বিকোবে মুদির দোকানে, খালি পয়সাওয়ালা শখের বশে কিনে নেবে দু–তিনটে। তাদের ভর্তি পেট, গায়ে আতরের গন্ধ। ওরা প্রশ্ন করবে না, পথে নামবে না, দেওয়ালে দেওয়ালে ডাক দেবে না দিন বদলের। তাই শেষ করে দাও ভর্তুকি। শিক্ষা হোক বাজারের। ফিরে যাক দলিত কুলির মেয়েটা ওর আলো না আসা বস্তির কুঁড়ে ঘরে। আর এখানেই আজকের সংঘাত।
অনেকেই ছাত্র আন্দোলনকে জেএনইউ, যাদবপুরের ঘেরাটোপে বাঁধতে চান। সস্তা এলিটিজমের আধসেদ্ধ নৈতিক বোধের সামনে হারিয়ে দিতে চান অন্ধ্রপ্রদেশের ভেঙ্কটেশদের– যে মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার চেয়ে পুলিশের মার খেয়ে বাড়ি ফিরল। অথবা মহারাষ্ট্রের খরা অধ্যুষিত গ্রামের ১৫০ জন স্কুল পড়ুয়া আর তাদের অভিভাবকরা। স্কুলে পানীয় জলের দাবিতে ধর্মঘট করেছেন টানা চার দিন। এদের লড়াই আর জেএনইউ'র লড়াইয়ের মিল এক জায়গায়। এরা সবাই শিক্ষার জন্য সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। যে ভর্তুকি তাদের হকের।
কারণ পাঁচ টাকার পার্লে-জি বিস্কুট থেকে ঘরের উঠোন ছাইতে কিনে আনা খড় কিনতেও তারা কর দেয়। তারাও করদাতা। আর তাই তাদের টাকায় তাদের ছেলেমেয়েরা রেলগাড়ি করে আসবে মেদিনীপুর থেকে দিল্লি। শহরের বাবু–বিবিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটবে হোস্টেল থেকে লাইব্রেরিতে। গবেষণাপত্র পেশ করবে অক্সফোর্ডে –– যে ঘর, পরিসর, মঞ্চগুলোতে শুধু পয়সাওয়ালা, পৈতেধারীদের ঠেলাঠেলি ছিল। সাঁওতালিতে গান গাইবে, মৈথিলীতে ভাষণ দিয়ে কেল্লা ফতে করবে।
আর এই স্বপ্ন দেখার, লড়াই করার, এত বছরের জাতি সাম্রাজ্য ভেঙে দেওয়ার অধিকার যদি কেউ কেড়ে নিতে আসে তাহলে পথে নামবে। মিছিল-মিটিং করে বিপর্যস্ত করে দেবে শাসকদের অথবা শাসকের তল্পিবাহকদের পরিশ্রমে ফুলে ফেঁপে ওঠা পুঁজির মালিকদের, মানুষকে যারা ন্যূনতম সম্মান দেওয়া অপ্রয়োজনীয় মনে করে সেই উন্নাসিকদের। মার খাবে, জেলে যাবে, খুন হয়ে যাবে। তবু আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতকে বাঁচাতে ওরা পুরনো গল্পগুলো বলবে নতুন নতুন নামে, নতুন নতুন জায়গায়।
সুভাষচন্দ্র বসু প্রেসিডেন্সি কলেজে ছাত্র থাকাকালীন ই এফ ওটেন সাহেবকে তার জাতিবিদ্বেষ ঘোচানোর মোক্ষম দাওয়াই দিয়েছিলেন। আশা করি আজকের দেশপ্রেমিকরা তাঁর সেই আচরণকে অর্বাচীন এবং দুর্বৃত্তমূলক আচরণ বলে ঠাওরাবেন না।
স্বামী বিবেকানন্দের কাছে একবার গো–সেবকরা চাঁদা চাইতে এলে তিনি জানতে চেয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য সেই সমিতি কী করেছে। সেই বিষয়ে তারা কিছুই করেনি শুনে তিনি ওই গো–সেবকদের মানুষ বলে গণ্য করেননি।
তাই সারা ভারত জুড়ে ছাত্রদের শিক্ষায় ভর্তুকি বাঁচানোর যে আন্দোলন আজ আমরা দেখছি তা আসলে সুভাষচন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চাকি, মাস্টারদা সূর্য সেনদের সংগ্রামের ঐতিহ্য অটুট রাখার লড়াই। শাসকের দমন, ভুড়ি ভুড়ি মিথ্যের চাপে পিছু হঠব না আমরা। উই আর হেয়ার টু স্টে। নট অ্যান ইঞ্চ ব্যাক।
লেখক এসএফআই-এর সর্বভারতীয় যুগ্ম সম্পাদক ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী
মতামত লেখকের নিজস্ব