
শেষ আপডেট: 18 July 2023 14:56
বাংলায় একটি বাগধারা আছে, ‘প্রদীপের নীচেই অন্ধকার’। ভারতের বর্তমান অবস্থা লক্ষ করলে বাগধারাটির অর্থ পরিষ্কার হয়। একদিকে ভারত যখন চাঁদে মহাকাশযান (Chandrayaan 3) পাঠাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের বিরাট অংশ ডুবে আছে বন্যার জলে। বিজ্ঞানীরা মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছেন। কিন্তু কী করলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তার পথ এখনও বার করা যায়নি। এখানে সরকারের গাফিলতি আছে। সেই সঙ্গে আছে দূরদর্শিতার অভাব। তাই প্রতি বছরই বর্ষার সময় বিপর্যয়ের মুখে পড়া দেশবাসীর নিয়তি।

এবছর রাজধানী দিল্লিও বন্যার কবলে পড়েছে। বর্ষার শুরুতেই উত্তর ভারতে প্রবল বৃষ্টি হয়েছিল। দিল্লিতে প্রতি বছর বর্ষায় মোট যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তার ২০ শতাংশ হয়েছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টায়। এর ফলে যমুনা নদী ফুলে ফেঁপে ওঠে। তার জল বিপদসীমার বহু ওপর দিয়ে বইতে থাকে। পরিণামে ভেসে যায় রাজধানী। তার ঐতিহাসিক স্থানগুলিও জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। ত্রাণকর্মীরা বলেছেন, দিল্লির নিকাশী নালাগুলি জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। সেজন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
অসমে বন্যা শুরু হয়েছিল জুন মাসে। যদিও এখানকার গণমাধ্যমে বিষয়টি দিল্লির মতো কভারেজ পায়নি। কিন্তু সেখানে অবস্থা আরও খারাপ। জুনের মাঝামাঝি উত্তর-পূর্ব ভারতে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি শুরু হয়। বন্যা পরিস্থিতি দেখা যায় অসমের ২২টি জেলায়। রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর থেকে বলা হয়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ। প্রায় ১৪ হাজার মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।
উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে হিমাচল প্রদেশের অবস্থা সবেচেয়ে খারাপ। সেখানে বন্যায় প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিদ্যুতের লাইনগুলি ছিঁড়ে গিয়েছে। অন্যান্য পরিকাঠামোর ক্ষতিও হয়েছে ব্যাপক। রাজ্যের ১ হাজার রাস্তা এখন যান চলাচলের অযোগ্য। ত্রাণে নেমেছে সেনাবাহিনী ও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। প্রায় ৭০ হাজার পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে।
পাঞ্জাবেও বন্যার আশঙ্কায় হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পাতিয়ালা ও ডেরা বাসসি অঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় রাস্তায় ধস নেমেছে।
এরই মধ্যে গত শুক্রবার চাঁদের উদ্দেশে রওনা হয়েছে আমাদের চন্দ্রযান ৩। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে রকেট চাঁদের বুকে নামবে ২৩-২৪ অগাস্ট। শোনা যাচ্ছে, রকেটের সফ্ট ল্যান্ডিং হবে। অর্থাৎ আকাশ থেকে রকেটটি পাখির পালকের মতো নেমে আসবে মাটিতে। মূলত চাঁদের আবহাওয়া ও মাটি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করবে চন্দ্রযান ৩।
চাঁদের আবহাওয়া ও মাটি সম্পর্কে জানা নিশ্চয় জরুরি, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হল আমাদের দেশের আবহাওয়া সম্পর্কে নিখুঁত পূর্বাভাস পাওয়া ও সেইমতো ব্যবস্থা নেওয়া। আমাদের আবহবিদরা অবশ্য এখন আগের চেয়ে ভাল পূর্বাভাস দিতে পারেন, কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয় না। দিল্লি, মুম্বই, কলকাতার মতো মহানগরে জলনিকাশি ব্যবস্থা বিশেষ ভাল নয়। প্রতি বছরই নিকাশির জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু তাতে লাভ হয় সামান্যই। আসলে এসব ক্ষেত্রে প্ল্যানিং-এর অভাব আছে।
আমাদের বিজ্ঞানীরা খুব পরিকল্পনা করে চাঁদে রকেট পাঠিয়েছেন। গতবারের মতো রকেট যাতে চাঁদে নামার সময় ভেঙে না পড়ে তার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। এই প্ল্যানিং ও সতর্কতা যদি বন্যা নিয়ন্ত্রণের বেলায় দেখা যেত, তাহলে এত মানুষের প্রাণ যেত না। এত সম্পত্তিরও ক্ষতি হত না।