যখন ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়, সমাজের দরিদ্রতম মানুষ পর্যন্ত খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারে, শ্রমিকরা ভাল মজুরি পায় এবং রাজা সাধারণ মানুষকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন, তখন ধরে নিতে হবে দেশে সুদিন এসেছে।
আজ থেকে দু’হাজার বছরেরও বেশি আগে চাণক্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’ বইয়ের শুরুতে এই কথাগুলি লিখেছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য তখনই বৃদ্ধি পেতে পারে যখন সাধারণ মানুষ খেয়েপরে বেঁচে থাকে ও শ্রমিকরা ভাল মজুরি পায়। মানুষের হাতে যদি পয়সা না থাকে, তাহলে শিল্পপতিরা যে জিনিস উৎপাদন করবেন, তা কিনবে কে? আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি যে ২০ লক্ষ কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করলেন, তাতে এই জায়গাতেই একটা মস্ত বড় ফাঁক রয়ে গেল। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে শিল্পপতিরা যাতে দ্রুত পণ্য উৎপাদন শুরু করতে পারেন, সেজন্য তিনি উৎসাহ দিচ্ছেন। কিন্তু দেশের বিপুল সংখ্যক গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাঁরা লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য প্যাকেজে বিশেষ কিছু নেই। তাহলে শিল্পপতিদের উৎপন্ন কিনবে কে?
অর্থনীতির বিকাশ মূলত দু’টি ফ্যাকটরের ওপর নির্ভর করে। ডিমান্ড আর সাপ্লাই। চাহিদা ও যোগান। মোদীর প্যাকেজে যোগান বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। চাহিদা বাড়ানোর চেষ্টা নেই। তাহলে নানা পণ্যের যোগান বাড়িয়ে লাভ কি? কেনার লোক না থাকলে জিনিসপত্র তো গুদামে পড়ে পড়ে নষ্ট হবে। অথবা দোকানে সাজানোই থাকবে থরে থরে।
তথ্য বলছে, লকডাউনের সময় কর্মহীন হয়েছেন ১১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ। তাঁদের মধ্যে ৯ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ ছিলেন দিনমজুর। অর্থাৎ তাঁরা কাজের বিনিময়ে দৈনিক মজুরি পেয়ে থাকেন। কাজ হারানোদের মধ্যে ১ কোটি ৭০ মানুষ মাস মাইনে পেতেন। তাঁরা বেকার হয়ে যাওয়ায় বাজারে চাহিদার বিপুল ঘাটতি অবশ্যম্ভাবী। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন প্রতি মাসে আগের চেয়ে ১০ হাজার কোটি টাকার কম পণ্য বিক্রি হবে।
মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তও এই আকালের বাজারে বেশি কিছু কেনাকাটা করতে চাইছেন না। কারণ তাঁরাও রয়েছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাঁদের কারও চাকরি যেতে পারে। ব্যবসায় ক্ষতি হতে পারে। সুতরাং তাঁরা খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য অতি প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া আর কিছুর পিছনে খরচ করতে নারাজ।
গত দু’মাসে গাড়ি আর মোটর বাইকের বিক্রি নেমেছে শূন্যে। হোটেল, বিনোদন, ট্রেন ও বাস পরিবহণের অবস্থাও খুব একটা আলাদা কিছু নয়। হাফ ডজন এয়ারলাইন্স, একাধিক শিপিং কোম্পানি, ২ লক্ষ ৭১ হাজারের বেশি বড় কোম্পানি, সাড়ে ছয় থেকে সাত কোটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংস্থা লকডাউনে বন্ধ হয়ে আছে। বেশিরভাগ সংস্থার কর্মীই বেতন পাননি।
করোনা সংকটের মোকাবিলায় সব দেশই প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও করেছেন। তাঁর প্যাকেজে জনসংখ্যার একটি অংশের হাতে এককালীন ১২০০ ডলার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কানাডার সরকার ঘোষণা করেছে, আগামী চার মাস ধরে গরিবদের দু’হাজার ডলার করে দেওয়া হবে। বাজারে চাহিদা বাড়ানোর জন্যই ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের প্যাকেজে তেমন কিছু নেই।
মোদীর প্যাকেজের আর একট বড় অংশ জুড়ে আছে বেসরকারিকরণ। কোভিড ১৯ অতিমহামারীর সময় ওই ঘোষণা কি না করলেই চলত না? অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন অনেকগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেছেন। মনে হচ্ছে যেন, বেসরকারি হাতে তুলে দিলেই সংস্থাগুলি লাভজনক হয়ে উঠবে।
অর্থনীতিতে নব্য উদারনীতির মূল কথাই হল সবকিছু প্রাইভেট প্লেয়ারের হাতে ছেড়ে দেওয়া। বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া। এই তত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক আছে যথেষ্ট। ১৯৯১ সাল থেকেই দেশ বেসরকারিকরণের পথে হাঁটছে। কিন্তু তাতে দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের কতদূর উন্নতি হয়েছে তা ভাবনার বিষয়। প্রাইভেটাইজেশনের কথা বললে সেনসেক্স চড়চড় করে বাড়ে বটে, কিন্তু তার সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সম্পর্ক নেই।
মোদীর স্টিমুলাস প্যাকেজের মধ্যে চটকদার অনেক কিছু আছে। ’২০ লক্ষ কোটির প্যাকেজ’, ‘বাজেটের ১০ শতাংশ অর্থের প্যাকেজ’, ‘আত্মনির্ভরতা’ ইত্যাদি শব্দ দিয়ে খবরের কাগজের হেডলাইন হয় ভাল। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর পুরো বক্তব্য খতিয়ে দেখলে আশাহত হতে হয়। কোভিড পরবর্তী অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার সুযোগ মোদীর সামনে ছিল। কিন্তু তিনি সুযোগ হারিয়েছেন।