
শেষ আপডেট: 21 March 2022 07:49
দেবাশিস ভট্টাচার্য
লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর দু-খেপে ষোল বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এর মধ্যে তিন বছর তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন। ১৯৬৯ সালের মাঝ থেকে ১৯৭২ সালের মাঝ পর্যন্ত। এই সময়কালে তিনি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করেন, প্রাক্তন শ্রমিক নেতা ভি ভি গিরিকে প্রগতিশীল প্রার্থী বলে কংগ্রেস প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে তাঁকে জেতান। বিমা ও কয়লা খনি জাতীয়করণ করেন। রাজন্যভাতা বিলোপ করেন। সবচেয়ে বড় কথা, ইন্দিরা গান্ধীর মদত ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তি সফল হত কিনা সন্দেহ। (Book Review)
এইসব কঠিন কাজে ইন্দিরা গান্ধীকে পরামর্শ দিতেন সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সচিব পরমেশ্বর নারায়ণ হাকসার। আমলা মহলে তিনি পি এন বলে পরিচিত ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে পাঁচজন আমলার গুরুত্ব ছিল খুবই বেশি। এরা সবাই কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ। ছিলেন ডি পি ধর, পি এন ধর, টি এন কল এবং আর এন কাও। কাও ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল উইং-এর প্রতিষ্ঠার দিন থেকে প্রধান।

প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের এই পাঁচজনের মধ্যে পি এন হাকসার ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী। তাঁর জন্ম ১৯১৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। লন্ডনে পড়তে গিয়ে তিনি পরিচিত হন ইন্দিরা গান্ধী, ফিরোজ গান্ধী, জ্যোতি বসু, ভূপেশ গুপ্ত, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে। ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন লন্ডন মজলিস-এ যুক্ত হন। তারপর গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সাহচর্যে এসে কমিউনিস্ট হয়ে যান। দেশে ফিরে তিনি নাগপুরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতেন। সেটা ১৯৪২ সালের গোড়ার কথা। তখন তাঁর বয়স ২৯ বছর। তাঁর সহযোগী ছিলেন ১৮ বছরের যুবক এ বি বর্ধন, যিনি ১৯৯৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সিপিআই-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু সিপিআই নেতারা মস্কোর নির্দেশে চলতেন বলে হাকসার সিপিআই ছেড়ে দেন। তারপর চার বছর এলাহাবাদ হাইকোর্টে ওকালতি করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রকের অফিসার হন। এই দফতরে কাজের সুবাদে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি নিউইয়র্ক, অস্ট্রিয়া, জেনিভা, কোরিয়া, লন্ডন— এমন সব শহরে ভারতীয় দূতাবাসে চাকরি করেন। অবশেষে ১৯৬৭ সালের ৬ মে তিনি দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সচিব হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। এই কার্যভার গ্রহণের ১৮ দিন পরেই উত্তরবঙ্গে নকশালবাড়িতে কৃষক বিদ্রোহের খবর আসে। তখন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এ বিষয়ে পি এন হাকসারের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি রিপোর্ট তৈরি করতে বলেন। হাকসার ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে সেই রিপোর্ট জমা দেন। তাতে তিনি ভূমি সংস্কারের কাজের ওপর জোর দেন এবং এর ফলেই পরের বছর থেকে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয়।

পি এন হাকসার প্রধানমন্ত্রীকে ইন্দুজি বলতেন। সঞ্জয় গান্ধী যখন মারুতি গাড়ি তৈরির ব্যবসার কথা বলেন, তখন পার্লামেন্টে বামপন্থী সাংসদ জ্যোতির্ময় বসু সঞ্জয় গান্ধীকে কারখানা গড়ার লাইসেন্স দেওয়া ও জমি অধিগ্রহণ করার ব্যাপারে আপত্তি করেছিলেন। হাকসার বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে এমন কাজ করলে লোকে ভাল চোখে দেখবে না। পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়েরও তেমন মত ছিল।
১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই ইন্দিরা গান্ধী ১৪টি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করেন। তখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায় সঞ্জীব রেড্ডিকে। শ্রমিক নেতা ভি ভি গিরি নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে যান। ইন্দিরা গান্ধী তখন ভি ভি গিরিকে প্রগতিশীল প্রার্থী মনে করে সারা দেশের কংগ্রেসের সাংসদ ও বিধায়কদের বিবেক মতো ভোট দিতে বলেন। সেই রাষ্ট্রপতি ভোটে ভি ভি গিরি জয়ী হন। এর জন্য জাতীয় কংগ্রেস প্রথম ভেঙে যায়। তখন জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নিজলিঙ্গাপ্পা। এর জেরে ১৯৬৯ সালের ১২ নভেম্বর কংগ্রেস দল থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ১৯৭১ সালের মার্চে লোকসভার অন্তর্বতী নির্বাচনের অবস্থা সৃষ্টি করেন ইন্দিরা গান্ধী। এর পিছনে পি এন হাকসারের বুদ্ধি। সেই লোকসভা ভোটে 'গরিবি হঠাও' স্লোগান দিয়ে তখনকার লোকসভার ৫২২টি আসনের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন গ্রুপ তথা নব কংগ্রেস দল ৩৫২টি আসন পায়।

এরপর বেসরকারি বিমা কোম্পানি ও কয়লা খনি জাতীয়করণ করেন ইন্দিরা গান্ধী । রাজা-মহারাজারা তখন বছরে একটা বিরাট পরিমাণ টাকা ভাতা পেতেন। সেটাও বন্ধ হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা দেখে তদানীন্তন বিরোধী নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী পর্যন্ত লোকসভায় দাঁড়িয়ে ইন্দিরা গান্ধীর প্রশংসা করেন।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্ঠিয়ার একটি আমবাগানকে মুজিবনগর চিহ্নিত করা হয়। সেখানে তাজউদ্দিন আহমেদ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তারপরেই তাজউদ্দিন আহমেদ কলকাতায় এসে ভারতের সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগদীপ সিং অরোরার সঙ্গে আলোচনা করেন। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে মুক্তিবাহিনী কীভাবে লড়বে তা নিয়েও আলোচনা হয়। একসঙ্গে কলকাতায় স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এইসব কাজে এক নম্বর পরামর্শদাতা ছিলেন পি এন হাকসার। এমন সব কাজ মসৃণভাবে করার জন্যই ১৯৬৮ সালে নতুন গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল উইং(র) তৈরি করা হয়ে। এর মাথায় বসানো হয় আর এন কাও-কে। তখন কেন্দ্রীয় সরকারে অবসরের বয়স ছিল ৫৮ বছর। ১৯৭১ সালে ৪ সেপ্টেম্বর হাকসারের অবসর নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ছাড়তে চাননি। তিনি তাঁর কাজের মেয়াদ বাড়াতে চান। কারণ ইন্দিরা গান্ধী শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, তাঁর পরিবারের সমস্যা সমাধানেও পি এন হাকসারের পরামর্শ নিতেন।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি ইন্দিরা গান্ধী হাকসারকে এক চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে ইন্দিরা গান্ধী লেখেন, “আমি খুব একটা কুসংস্করাচ্ছন্ন নই। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই কেন জানি না আমার মন কু গাইছিল। আর এইরকম হলেই আমার সন্তানদের জন্য খুব উদ্বেগ হয়। আমার সামান্য কিছু কোম্পানির শেয়ার ছাড়া ওদের আর কিছুই দিয়ে যাওয়ার নেই। তাও শুনেছি ওই শেয়ারগুলোর দাম খুবই সামান্য। গয়না যা সামান্য কিছু ছিল তা আমি দুই পুত্রবধূর জন্য ভাগ করে রেখেছি। আর কিছু পুরোনো জিনিসপত্র ও ছবি আছে। ওগুলো ছেলেরাই ঠিক করবে কী করবে। রাজীবের চাকরি আছে। সঞ্জয়ের তাও নেই। তার উপর সঞ্জয় একটা ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিয়ে বসে আছে। ভবিষ্যতে ওদের কী যে হবে জানি না। ওরা যদি ওদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াবার কাউকে পেত তাহলে আমি নিশ্চিন্ত হতাম।”
১৯৯৮ সালের ২৭ নভেম্বর পি এন হাকসার প্রয়াত হন। যৌবনের কমিউনিস্ট, সরকারি আমলাদের মতো উচ্চপদে থাকলেও মানসিকভাবে প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ পি এন হাকসারের মতো আমলা আজকের যুগে প্রায় দেখা যায় না। এই ধারণা হল ‘ইন্দিরা সারথী পি এন হাকসার’ বইটি পড়ে।
ইন্দিরা সারথী পি এন হাকসার
লেখক: জয়রাম রমেশ
অনুবাদ: অভিজিৎ কুমার দত্ত
প্রকাশক: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড
মূল্য: ২৫০ টাকা