
শেষ আপডেট: 21 June 2022 14:18
যে কোনও দেশের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনীর (Agneepath) ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সৈনিকরা সীমান্তে পাহারা দেন। শত্রু দেশের হাত থেকে নাগরিকদের রক্ষা করেন। দেশের অভ্যন্তরে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলেও তাঁদের ডাক পড়ে। সেই সেনাবাহিনীতে নিয়োগ নিয়ে আমাদের দেশে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সেই সঙ্গে চলছে হিংসাত্মক আন্দোলন। একটার পর একটা ট্রেনে আগুন লাগানো হচ্ছে, সড়কপথ অবরোধ করা হচ্ছে। আন্দোলনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি।
অশান্তির কেন্দ্রে আছে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘অগ্নিপথ প্রকল্প’ (Agneepath)। গত ১৪ জুন ওই প্রকল্প ঘোষিত হয়। তাতে বলা হয়, পদাতিক বাহিনী, নৌবাহিনী ও বায়ুসেনায় চার বছরের মেয়াদে সেনা নিয়োগ করা হবে। এর ফলে সেনাবাহিনীতে কর্মীদের গড় বয়স কমবে। বর্তমানে সৈনিকদের গড় বয়স ৩২। অগ্নিপথ প্রকল্পের মাধ্যমে ছয়-সাত বছরের মধ্যে তা কমে হবে ২৪ থেকে ২৬। তরুণরা সাধারণত বয়স্কদের তুলনায় বেশি ‘টেক স্যাভি’ হন। অর্থাৎ উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বেশি। কমবয়সিরা আরও বেশি সংখ্যায় সেনাবাহিনীতে স্থান পেলে আগামী দিনে যুদ্ধে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সুবিধা হবে।
সরকারের যুক্তি, চার বছর সেনাবাহিনীতে (Agneepath) চাকরি করে তরুণরা দেশপ্রেমিক হওয়ার শিক্ষা পাবেন। পরবর্তীকালে তাঁরা প্রশাসনের নানা ক্ষেত্রে ও সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবেন। সবচেয়ে বড় কথা, চুক্তিতে সৈনিক নিয়োগ করলে বেতন ও পেনশন বাবদ সরকারের অনেক খরচ কমবে। সেই অর্থে সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ করা যাবে।
এর বিরোধী যুক্তিরও অভাব নেই। বিরোধীদের বক্তব্য, কোনও পাইলট প্রজেক্ট ছাড়াই অগ্নিপথ প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। অর্থাৎ তাঁদের বক্তব্য, প্রথমে অল্পসংখ্যক তরুণকে চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ করে দেখা উচিত ছিল তার ফল কী হয়। ফল ভাল হলে পরে চুক্তিতে বেশি সংখ্যায় নিয়োগ করা যেত।
আরও পড়ুন: সেনা নিয়ে কু-কথা: কৈলাশকে বহিস্কার করুক বিজেপি, দাবি অভিষেকের
বিরোধীদের আশঙ্কা, চার বছরের জন্য সেনা নিয়োগ(Agneepath) করলে তার পরিণাম ভাল নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে হয়তো সৈনিকদের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি দেখা দেবে। তাছাড়া চুক্তিতে যাঁরা চাকরি করবেন, তাঁরা হয়তো কোনও ঝুঁকিবহুল কাজে যেতে চাইবেন না।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষ দিকেই অগ্নিবীর প্রকল্পে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার তরুণকে নিয়োগ করা হবে। তাঁদের বয়স হবে সাড়ে ১৭ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। তবে ২০২২ সালের জন্য বয়সের উর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে ২৩ করা হয়েছে।
অগ্নিবীরদের বেতন হবে মাসিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। চার বছর বাদে অগ্নিবীরদের ২৫ শতাংশকে সেনাবাহিনীতে স্থায়ী চাকরি দেওয়া হবে। বাকি ৭৫ শতাংশকে ‘সেবা নিধি’ প্যাকেজ অনুযায়ী দেওয়া হবে ১১.৭১ লক্ষ টাকা ও স্কিল সার্টিফিকেট। কিন্তু তাঁদের কোনও পেনশন বা গ্র্যাচুইটি দেওয়া হবে না।
সরকার অগ্নিপথ প্রকল্প ঘোষণা করার দু’দিনের মধ্যে শুরু হয় বিক্ষোভ। দেশের বেকার তরুণদের ধারণা হয়, চুক্তিভিত্তিক চাকরির নামে সরকার তাঁদের সঙ্গে বঞ্চনা করছে।
সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি নামে এক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী গত মে মাসে ভারতে বেকারত্বের হার ছিল ৭.২ শতাংশ। সরকার অবশ্য এই তথ্য মানতে রাজি নয়। কিন্তু সরকারের নিজস্ব সংস্থা ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস অফিস জানিয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে দেশে বেকারত্বের হার ছিল ৮.২ শতাংশ।
দেশের বহু তরুণের কাছেই সেনাবাহিনীর চাকরি লোভনীয়। উত্তরাখণ্ডের মতো কোনও কোনও রাজ্যে বিরাট সংখ্যক ছেলে ছোটবেলা থেকে নিজেদের সেনাবাহিনীর চাকরির জন্য তৈরি করে। বহু গরিব পরিবারের তরুণ ভাবে, সেনাবাহিনীতে চাকরি পেলে সুখী, স্বচ্ছল জীবন কাটাবে। অগ্নিপথ স্কিমের কথা শুনে তাঁদের ধারণা হয়েছে, সরকার সেই সুযোগ কেড়ে নিতে চায়। তাঁরাই অশান্তি করছেন।
এই আন্দোলন কতদিন স্থায়ী হবে সন্দেহ আছে। কারণ সাময়িক উত্তেজনা কেটে গেলে তরুণরা অনেকেই হয়তো ভাববেন, একেবারে বেকার হয়ে বসে থাকার চেয়ে কিছুদিনের জন্য চাকরি করাও ভাল। এর মধ্যে সরকার ঘোষণা করছে, চার বছর বাদে যাঁরা সেনাবাহিনীতে স্থায়ী নিয়োগ পাবেন না, তাঁদের অন্যত্র চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আনন্দ মাহিন্দ্রার মতো শিল্পপতিও অগ্নিপথ প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছেন। এর ফলেও অনেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে উৎসাহী হবেন।
বেকারদের ক্ষোভ সামাল দেওয়ার জন্য সরকার কার্যত চাকরি বিলোনর রাস্তা নিয়েছে। এই বিলিয়ে দেওয়া চাকরির বেতন বা অন্যান্য সুবিধা স্থায়ী চাকরির মতো হওয়ার কথা নয়। হয়ওনি। সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষিত তরুণরা যাতে পরবর্তীকালে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারেন, তার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। না হলে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে প্রশিক্ষিত বেকার তরুণরা কী অনর্থ ঘটাবেন কে বলতে পারে।