
শেষ আপডেট: 15 October 2019 07:06
অধ্যাপক রতন খাসনবীশ
এ বছর নোবেল মেমোরিয়াল পুরস্কার পেয়েছেন অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। পেয়েছেন আরও দু’জন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে একসঙ্গে, যাঁর মধ্যে একজন হলেন তাঁর স্ত্রী এস্থার ডাফলো। যে বিষয়টিতে কাজ করে তাঁরা এ বছর নোবেল কমিটির স্বীকৃতি পেলেন সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেন গুরুত্বপূর্ণ সে কথা বলার প্রয়োজন আছে।
আমরা কতগুলো মোটা দাগের তত্ত্ব বুঝি। এই মোটাদাগের তত্ত্বগুলোকে বলে বিগ পিকচার। বিষয়টা অনেকটা এইরকম: বড় ধরনের কোনও বিনিয়োগ হলে তা হবে জোর ধাক্কা বা বিগ পুশ। জোর ধাক্কা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়বে, বড় ধরনের বিনিয়োগ হলে লোকের কর্মসংস্থানও বাড়বে। এগুলোকেই বলে বিগ পিকচার বা বৃহৎ পেক্ষাপট।
অর্থনীতিতে বেশ কয়েকটি এই ধরনের বৃহৎ প্রেক্ষাপট রয়েছে, এর দু’টি মতবাদ। একটি মতবাদ হল জাতীয় আয় বাড়ানোর চেষ্টা করা, তা করা সম্ভব হলে দারিদ্র্য আপনা হতেই চলে যাবে। একে বলে ট্রিকল ডাউন এফেক্ট। আর একটি মত একে সমর্থন করে না, সেই মতবাদ হল – দারিদ্র্যের উপরে সরাসরি আঘাত হানা দরকার। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এই দ্বিতীয় মতবাদের সমর্থক।
যদি অমর্ত্য সেনের মতো কোনও মিশ্র অর্থনীতির সমর্থকের সঙ্গে আলোচনা করা যায় তা হলে দেখা যাবে, তাঁরা বড় মাপের অর্থনৈতিক তত্ত্ব সামনে রেখে চলেন। বড় একটা ছবি সামনে রাখার চেষ্টা করেন। এই ধরনের কাজগুলি তাত্ত্বিক, তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণও বটে। এই তালিকায় কার্ল মার্কসকেও রাখা যেতে পারে।
অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়রা মনে করেন প্রতিটি ছোট ছোট এলাকার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে বৃহৎ প্রেক্ষাপটে বিচার করা যাবে না, তাকে আলাদা ভাবে বুঝতে হবে। ওই জায়গার বিশেষ অবস্থাগুলি বুঝতে হবে, বিচার করতে হবে।
নীতি নির্ধারণের সঙ্গেও এর বিশেষ একটা মিল রয়েছে। ধরা যাক দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য কেন্দ্রীয় ভাবে দিল্লি থেকে কোনও নীতি স্থির করা হল, তবে এই নীতিতে সর্বত্র কাজ নাও হতে পারে। কারণ রাজস্থানের যেমন কয়েকটি বিশেষত্ব আছে, পশ্চিমবঙ্গেরও তেমন আলাদা বিশেষত্ব আছে। তাই দু’টি রাজ্যের ক্ষেত্রে নীতি আলাদা হওয়ার কথা। এই বিষয়টি অর্থনীতিতে ওঁরা এনেছেন।
ওঁর তত্ত্ব হল: তথ্যগুলি বিচার করার জন্য একটি কৌশল রপ্ত করা হয়েছে যাকে বলা হয় ব়্যান্ডমাইজ রেসপন্স টেকনিক বা ব়্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল টেকনিক। এই টেকনিকে, প্রাপ্ত তথ্যগুলি সাজানোর চেষ্টা করা হয়। একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
কোনও দু’টি স্কুলের মধ্যে একটিতে পার্শ্বশিক্ষক যাচ্ছেন, আর একটিতে যাচ্ছেন না। যে স্কুলে পার্শ্বশিক্ষক যাচ্ছেন সেই স্কুলে কি পঠনপাঠনের উন্নতি হচ্ছে? এই ভাবে প্রশ্ন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পার্শ্বশিক্ষকরা হলেন এক্সপেরিমেন্টাল ভেরিএবল। যে স্কুলে পার্শ্বশিক্ষক রয়েছেন সেগুলি নজরে রয়েছে বা সেই স্কুলগুলি এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে রয়েছে। এবার যে স্কুলে এই ভেরিএবল প্রয়োগ করা হল সেই স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে তুলনা করতে হবে যে স্কুলে পার্শ্বশিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি, সেই স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে। দেখতে হবে যে স্কুলে পার্শ্বশিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে সেই স্কুলের পড়ুয়ারা বেশি শিখেছে কিনা। এটা বিচার করে বোঝা যাবে পার্শ্বশিক্ষক প্রয়োগ করার প্রয়োজন আছে কিনা। অর্থনীতিতে এই তত্ত্ব ১৯৯০-এর দশক থেকে আসতে শুরু করেছে। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এ ব্যাপারে অনেক কাজ করেছেন।
ওঁরা যে পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন করে এই কাজ করছেন, নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় তার একটা স্বীকৃতি পাওয়া গেল।
অভিজিৎ প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক, আমি নিজেও সেই কলেজেরই ছাত্র। এই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের দু’জন ছাত্র নোবেলজয়ী। এটি খুব সহজ ব্যাপার নয়। প্রাক্তনী হিসাবে উনি আছেন এটি আমাদের কাছে খুব বড় ব্যাপার।
আর একটি ব্যাপার কিছুটা ব্যক্তিগত। ওঁর বাবা অর্থনীতিশাস্ত্রের একজন অত্যন্ত ভালো অধ্যাপক ছিলেন, উনি আমাদের শিক্ষকও। আমাদের শিক্ষকপুত্র, যিনি আমার চেয়ে কিছুটা কণিষ্ঠ, তিনি এত বড় মাপের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন, এতেও আমরা খুবই আনন্দিত।