
শেষ আপডেট: 8 November 2018 09:35
অংশুমান কর
চায়ের দোকানের চেয়ে বড় রূপকথা বাঙালির জীবনে আর নেই। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যে, রবীন্দ্রনাথের “কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা” গানটা আসলে ছোট্ট চায়ের দোকানকে নিয়েই লেখা। যারা বোঝার তারা বোঝে। যে রূপকথার কথা ওই গানটিতে বলা আছে, চায়ের দোকানের কল্যাণেই মাঝে মাঝেই সেই রূপকথার ভেতরে আমিও প্রবেশ করেছি বই কি! ব্যাঙ্গমা, ব্যাঙ্গমী আমাকে পথ বলে দিয়েছে। দেখা পেয়েছি রাজপুত্র, রাজকন্যার।
ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী’র সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্পটা আগে বলি। গিয়েছি বোড়োল্যান্ড কবিতা উৎসবে। আমি, মৃদুল দাশগুপ্ত, আর তরুণ কবি পলাশ দে। উৎসবের পরের দিন উদ্যোক্তারা ঠিক করলেন যে, আমাদের একটি জলাশয় ঘিরে তৈরি হওয়া পার্ক দেখাতে নিয়ে যাবেন, মৃদুলদাকে খাওয়াবেন এক স্বর্গীয় সুরা জৌথাং। সেই মতো একটি গাড়িতে করে আমরা চলেছি। দু’পাশে জঙ্গল। তার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে পথ। এমনই পরিবেশ যে, আমার মনে হচ্ছিল ধারে কাছেই কোথাও একটা আছে নন্দনকানন আর পারিজাত পুষ্প। মদ্যে আমার আগ্রহ নেই, মানুষের বানানো পার্কেও তেমনটা না। তাই মন চাইছিল জলাশয়-সংলগ্ন পার্কটিতে না গিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে চলে যেতে ওই নন্দনকানন, কিন্তু পথ বলে দেবে কে? হঠাৎ চোখে পড়ল ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। চারটি খুঁটির মাথায় কালো পলিথিন। আর একটি টেবিলের ওপর চা বানানোর সামান্য সরঞ্জাম। ব্যাস, আর কিছুই নেই। চা বানাচ্ছেন এক পৃথুলা ভদ্রমহিলা, তাঁকে সাহায্য করছেন এক প্রৌঢ়। আমার ওদের দেখেই মনে হয়েছিল আরে, এই তো ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী! নন্দনকাননের পথ তো এঁরা জানেন। বড় ইচ্ছে ছিল ওই দোকানটিতে দু’দণ্ড বসি। এক পেয়ালা চা খাই। আর নন্দনকাননের পথ শুধিয়ে নিই। তা আর হয়ে ওঠেনি। তাড়া ছিল আমাদের। কোন
পথে গেলে পাওয়া যাবে পারিজাত পুষ্পের দর্শন—সে কথা আর জানা হয়নি। দূর থেকে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীকে দেখেই ক্ষান্ত হতে হয়েছিল সেদিন। জীবনের সবচেয়ে বড় বড় না-পাওয়াগুলির মধ্যে এটি একটি। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সঙ্গে কথা বলতে না-পারার সেই দুঃখ আমার আজও যায়নি।
রাজকন্যার সঙ্গে অবশ্য দু’কথা বলতে আমি পেরেছিলাম। রাজকন্যার দেখা পেয়েছিলাম সেই কবিতা পড়তে গিয়েই। সেবার সাহিত্য অকাদেমির অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আমরা অনেকে গেছি গ্যাংটক। আমার রুমমেট শ্রীজাত। আমরা রুমে ঢোকা মাত্র ঘটল এক বিপত্তি। কী এক নাম না-জানা পতঙ্গ হুল ফুটিয়ে দিল শ্রীজাতর আঙুলে। ব্যথায় যখন ছটফট করছে ও, তখন শিবাশিসদা আর পিনাকীদার ঘর থেকে একটি মলম নিয়ে এসে প্রাথমিক শুশ্রূষা করলাম। সাহায্য করলেন হোটেলের স্টাফেরাও। যন্ত্রণা একটু কমলে মুষড়ে পড়া শ্রীজাতকে নিয়ে আমি আর পিনাকীদা বেরোলাম চারপাশটা একটু ঘুরে দেখতে। তখনই দেখা পেলাম রাজকন্যার। আমাদের হোটেলের থেকে প্রায় ঢিল ছোড়া দূরত্বে ছোট্ট এক চায়ের দোকানে। সে নিজেই চা বানাচ্ছে, বিক্রি করছে মোমো। পার্থিব কোন বস্তুর সঙ্গেই তুলনীয় নয় তার রূপ। আমার মনে হয়েছিল ওই রাজকন্যাই নন্দনকাননের পারিজাত পুষ্প। সে পুষ্পের সৌরভ নিতে যে শ্রীজাত কফি আর চায়ের মধ্যে বাছতে গেলে সব সময় বেছে নেয় কফি, সেও যে কত কাপ চা খেয়েছিল ওই ছোট দোকানটিতে তার হিসেব করা মুশকিল। যে আমি দিনে তিন কাপের পর চতুর্থ কাপ চা সামনে ধরা হলে নির্ঘাত ঘুরিয়ে নিই মুখ সেই আমিও যে কতবার হানা দিয়েছিলাম ওই ছোট্ট চায়ের দোকানটিতে কোনও পাটিগণিত সে হিসেব করতে পারবে না! দুঃখের এই যে, ওই রাজকন্যার নামটি জানা হয়নি। অবশ্য রাজকন্যারা তো রাজকন্যাই, নামের খাঁচায় তাদের বন্দী করলে তাঁরা তখন শুধুই ‘কন্যা’ হয়ে পড়েন।