বাংলার এই উৎসবে লাভবান হয় গোটা ভারত। দুর্গাপুজোকে তাই বাংলার বৃহত্তম বাণিজ্য উৎসব হিসাবেও দেখা দরকার। দেবীর আগমন এবং বিদায়ে যত মঙ্গল-অমঙ্গলের আশা-আশঙ্কা জড়িয়ে থাক না কেন, পুজোর ব্যবসার তাতে হেরফের হয় না।

শেষ আপডেট: 4 October 2025 19:26
পুজোর চারদিনের আবহাওয়া নিয়ে মাস খানেক আগে থেকেই সাধারণ মানুষের কৌতূহল বা়ডতে থাকে। মানুষ জানতে চায় পুজোর সময়টা, বিশেষ কবে সপ্তমী থেকে চারটে দিন আকাশ রৌদ্রজ্বল নাকি মেঘলা থাকবে। এমনীতেও মানুষ দিন দিন আবহাওয়া সক্রান্ত খবরে উৎসাহী হয়ে উঠছে। এটা ভাল লক্ষণ। পুজোর আবহাওয়ার সঙ্গে শুধু তো আনন্দ-বিনোদন নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যেরও গভীর সম্পর্ক। বছর বিশ আগে ফিকি এবং কলকাতার ব্রিটিশ কাউন্সিল যৌথ সমীক্ষা চালিয়ে জানিয়েছিল, পুজোর চারদিন এবং আগের একমাস মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এতদিনে অঙ্কটা এক লাখ কোটি ছুঁয়েছে বলে আমাদের বাণিজ্য বিষয়ে খবরাখবর করা সাংবাদিক বন্ধুদের কারও কারও অনুমান। বাংলার এই উৎসবে লাভবান হয় গোটা ভারত। দুর্গাপুজোকে তাই বাংলার বৃহত্তম বাণিজ্য উৎসব হিসাবেও দেখা দরকার। দেবীর আগমন এবং বিদায়ে যত মঙ্গল-অমঙ্গলের আশা-আশঙ্কা জড়িয়ে থাক না কেন, পুজোর ব্যবসার তাতে হেরফের হয় না।
এবার আবহাওয়া রিপোর্ট থেকে বিস্তর আশঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত উৎসব ভেসে গিয়েছে বলা যাবে না। শরৎকালে বৃষ্টি স্বাভাবিক ব্যাপার। পুজোয় বৃষ্টিও নতুন কিছু নয়। এবার পুজোয় প্রবল বৃষ্টিপাত হবে ধরে নিয়ে বিগত বছরগুলির তুলনায় অনেক বেশি মানুষ আগাম প্যান্ডেল সফর সেরে নিয়েছিলেন। হয়তো সেই কারণে নবমীর রাতে অনেক প্যান্ডেলেই শেষ মুহূর্তের চেনা ভিড় তেমন একটা দেখা যায়নি।
এবারের পুজোর আরও কয়েকটি প্রাপ্তি আছে। পুজো ছিল ঘটনা-দুর্ঘটনাবিহীন। মারামারি, দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেনি। অন্যান্যবার যে এসব লেগেই থাকে তা নয়। তবে কয়েক বছর আগে পুজোর দিনগুলিতে সাম্প্রদায়িক উসকানি মারদাঙ্গা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এবার সম্প্রীতির পরিবেশ বিষিয়ে তোলার চেষ্টা গোপনে কেউ যদিও করেও থাকে, সফল হয়নি। নাগরিকদের পাশাপাশি পুলিশ-প্রশাসনের অজন্য প্রশংসা প্রাপ্য। নেতা-নেত্রীরা যে উৎসব নিয়ে রাজনীতিতে সংঘাতের স্তরে নিয়ে যাননি সে জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য। বিশেষ করে বিগত বছরগুলিতে যারা এই ব্যাপারে মুখ-গন্ধ, হাত-নোংরা করেছেন।
এবারের আরও একটি ভাল দিক ছিল মাইক। পুজোর চারদিন জীবন অতীষ্ট করে তোলা মাইকের তাণ্ডব এবার ছিল না বললেই চলে। কলকাতা, মফস্বল, সর্বত্র বহুজনের একই অভিজ্ঞতা। অন্যন্যবার পুজোর মন্ত্রও বিরক্তিকর ঠেকেছে মাইকের তাণ্ডবে। অনেকেই এটাও বললেন, গান বাছাইয়েও নতুন ভাবনার আঁচ পেয়েছেন। উৎসবের সঙ্গে মানানসই রুচিশীল গান বেশি বেজেছে প্যানেলগুলিতে। শব্দবিধি মেনে রাত দশটা-এগারোটা থেকে মাইক বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হয় বেশিরভাগ প্যান্ডেলে। ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা কারও নিশ্চয়ই থাকতে পারে। তবে অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, মাইক বাজানোয় আশার আলো লক্ষ্য করেছেন তারা। এই প্রবণতা বজায় থাকবে নাকি, এবারটা ব্যতিক্রম, এই প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই ব্যাপারে ভূমিকা থাকতে পারে। মাস কয়েক পর বিধানসভার নির্বাচন। দশমীর শুভেচ্ছা বিনিয়ম এবার বৃহত্তম রাজনৈতিক জনসংযোগ হয়ে উঠছে। তৃণমূল ভবন থেকে পার্টি চ্যানেলে ক্লাবগুলিকে মাইক বাজানোয় সতর্কবার্তা দেওয়া হয় বলে খবর। আর এ কথাও সত্য বেশিরভাগ ক্লাবের উপর তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ আছে। মানুষ চায় পুজোর দৃষ্টান্ত রাজনৈতিক সভা-সমাবেশেও অনুসরণ করা হোক। আশাকরি আগামী বিধানসভা ভোটের প্রচারে এবারের পুজোর শব্দ সংস্কৃতি অনুসরণ করবে দলগুলি।
ক’দিন পর কালী পুজো, দীপাবলি। আলোর উৎসবকে মাটি করে দেয় শব্দবাজির তাণ্ডব। তিন-সাড়ে তিন বছরের চেষ্টায় তাতে খানিকটা লাগাম দেওয়া গেছে। কিন্তু আরও পথ পেরনো বাকি। শব্দ বাজির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে কি না তা অনেকাই সাধারণ নাগরিকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে। সেই সঙ্গে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা তো আছেই। কালী পুজোও নির্বিঘ্নে কাটবে, দুর্গাপুজোয় প্রশাসন সেই আশআ জাগিয়েছে।
কথা হচ্ছিল বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি এক সময় পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্যদের ল’ অফিসার ছিলেন। তাঁর উদ্যোগে দূষণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে একটা সময় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমকেও পরিবেশ এবং দূষণ বিষয়ে সচেতন করেছেন। বাংলার পত্র-পত্রিকা, টিভি-রেডিও থেকে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সর্বত্র পরিবেশ সংক্রান্ত খবরকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে। বছর পনেরো আগে এই ব্যাপারে বাংলার সংবাদমাধ্যমের কাছে বিশ্বজিৎবাবুই ছিলেন পথপ্রদর্শক, অভিভাবক। মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় প্রকাশ্য স্থানে মাইক বাজানো নিষিদ্ধ করে আদালতের রায় ছিল তাঁরই আইনি লড়াই এবং সংবাদমাধ্যমকে দিয়ে জনমত তৈরির সুফল। সেই বিধি আজও বহাল আছে। ‘শব্দ শহিদ’ কথাটিও তিনিই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। বাজি ফাটানোকে কেন্দ্র করে গোলমাল, অসুস্থতা জনিত কারণে মৃতের পরিবারকে এককালীন অর্থ সাহায্য দেওয়াতেও তিনিই ছিলেন উদ্যোক্তা।
দুর্ভাগ্যের হল রাজনীতির প্রভুরা সব কিছুতেই ষড়যন্ত্র খোঁজেন। পরীক্ষার আগে মাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত রায় আদায়ের লড়াইয়ের কারণেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বছর বারো-তেরো আগে চাকরি থেকে আগাম অবসর নিতে হয় তাঁকে। সেই থেকে নিজের সংগঠন গড়ে পরিবেশ রক্ষা এবং দূষণ নিয়ে সচেতনতা প্রসারের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বিশ্বজিৎবাবুরও উপলব্ধি করেছেন, এবার পুজোয় শব্দ যন্ত্রণা কম ছিল। তিনি অবশ্য বলছেন, ইতিবাচক প্রবণতাটা শুরু হয়েছে কয়েক বছর যাবত। তবে কলকাতা-সহ শহর এলাকায় মাইকের শব্দ যন্ত্রণা হ্রাস পেতে শুরু করলেও গ্রামের ছবিটা আগের মতোই আছে। তিনি আশা করছেন ধীরে ধীরে গ্রামের পুজোতেও মাইকের তাণ্ডব কমবে।
সেই সঙ্গে তিনি পুজো, উৎসবকে ঘিরে এক ভয়ঙ্কর বিপদের দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন। সেটা প্লাস্টিক। বলছিলেন, পুজোর দিনগুলিতে বিপজ্জনক প্লাস্টিকের ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তিনি আক্ষেপ করছিলেন, এই ব্যাপারে সরকার, পঞ্চায়েত, পুরসভা থেকে যে জনসচেতনতা প্রসারের কাজ শুরু হয়েছিল তা গতি হারিয়েছে। ১২০ মাইক্রনের কম ঘনত্বের প্লাস্টিকের ব্যাগ তৈরি, বিক্রি, ব্যবহার—সবই আইনত নিষিদ্ধ হয়েছে ২০২১-এর আইনে। আইন ভাঙলে জরিমানার বিধান আছে। কিন্তু প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ক্লাব-সংগঠনের তরফেও এই বিপদ নিয়ে তেমন একটা প্রচার নেই। প্রবীণ এই পরিবেশ সংঘঠক বলছিলেন, ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসাবে কিছু প্যান্ডেলে তিনি অস্থায়ী ডাস্টবিন লক্ষ্য করেছেন। কিন্তু দর্শনার্থীদের সেগুলি তেমন একটা ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। তাঁর কথায়, ইদানীং প্লাস্টিকের খালি বোতল কেনা শুরু হয়েছে পুনর্ববহারের জন্য। সব ধরনের প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে তা চালু না করলে ঘোর বিপদ।
আইন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ছাই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থার উপর চাপানো হয়েছে। ব্যাটারির ক্ষেত্রেও উৎপাদকদেরই অকেজো ব্যাটারি কিনে নিয়ে পরিবেশ দূষণ মুক্ত রাখার কথা। যদিও আইন কার্যকরের কোনও পরিকাঠামোই গড়ে ওঠেনি দেশে। প্লাস্টিকের ক্ষেত্রেও একইআইনি বিধান আছে। আইনের ব্যবহার নেই।