
শেষ আপডেট: 16 April 2023 15:57
জ্যোতিবাবুর সেই কথাটা মনে পড়ে গেল দেশের প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআইকে (CPI) নিয়ে সাম্প্রতিক খবর প্রসঙ্গে। নয়ের দশকের মাঝামাঝি নাগাদ, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সমাবেশে জ্যোতিবাবু বললেন, ‘আমাদের কৃষক সভার এক কোটির উপর সদস্য। এত বড় সংগঠন চিনের কমিউনিস্ট পার্টিরও নেই।’ তারপর খানিক হতাশার সুরে বললেন, ‘কিন্তু আমরা বামপন্থীরা তো ক’টা মাত্র রাজ্যে আছি। দেশে এখনও কোটি কোটি মানুষ দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান থেকে বঞ্চিত। ঘরে ঘরে বেকার,। আমরা তো এদের কল্যাণের কথা বলে আসছি। তাহলে এই মানুষ আমাদের পাশে নেই কেন?’

সিপিআইকে নিয়ে সাম্প্রতিক খবরটি হল তাদের জাতীয় দলের মর্যাদা হাতছাড়া হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কী, এই দুঃসংবাদের সূত্রেই বহুদিন পর দলটির কথা গোটা দেশের সংবাদমাধ্যমে স্থান পেয়েছে। গত বছর অক্টোবরে ডি রাজার দ্বিতীয়বার পার্টির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার খবরটি মিডিয়ায় জায়গা পায়নি। এখন প্রশ্ন হল, আর এক কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআই (এম) জাতীয় দলের মর্যাদা কতদিন ধরে রাখতে পারবে?
বাকি কথায় যাওয়ার আগে জাতীয় দলের মর্যাদার গুরুত্বের দিকটি খানিক আলোচনা করে নেওয়া যাক। ন্যাশনাল পার্টিগুলি দেশের যে কোনও নির্বাচনে একই প্রতীকে লড়াই করতে পারে। দিল্লিতে দলীয় অফিসের জন্য সরকারি সুবিধা মেলে। এছাড়া, ভোটের সময় আকাশবাণী, দূরদর্শনে প্রচারে বাড়তি সময় পেয়ে থাকে।
দু’ বছরের মাথায়, ২০২৫-এ শতবর্ষে পা দেবে সিপিআই। ওই বছরই একশো ছোঁবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ। নীতি-আদর্শের প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টির একেবারে বিপরীত মেরুর সংগঠন যদি বলতে হয় তো তা হল আরএসএস। শতবর্ষকে সামনে রেখে অনেক বাম মনোভাবাপন্ন মানুষকেও আক্ষেপ করতে শুনি, আজ কোথায় কমিউনিস্ট পার্টি আর কোথায় আরএসএস।
আমি যদিও এই তুলনাকে অর্থহীন মনে করি। কমিউনিস্ট পার্টি একটি রাজনৈতিক শক্তি। যে কোনও রাজনৈতিক দলেরই উত্থান-পতন আছে। অন্যদিকে, আরএসএসের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী সামাজিক শক্তি যারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যপূরণে রাজনীতিকে পরোক্ষে ব্যবহার করে আসছে। কাল যদি রাজনীতিতে বিজেপি মুখ থুবড়ে পড়ে আরএসএসের লক্ষ্যপূরণ হয়তো দীর্ঘায়িত হবে। কিন্তু সংগঠন ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নেই। ধর্মই তাদের সবচেয়ে বড় বর্ম। কমিউনিস্ট পার্টির তা নেই।
জাতীয় দলের মর্যাদা হারানো সিপিআইকে এই সুযোগে এক চোট গাল পেরে সঙ্ঘের মুখপত্র অর্গানাইজার কমিউনিস্ট পার্টিগুলির এই পরিণতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুরনো কথাই বলেছে অর্থাৎ দেশকে বিদেশিদের চোখ দিয়ে দেখাটাই তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ।
কেউ প্রশ্ন তুলতেই পাবেন, তৃণমূল কংগ্রেস এবং এনসিপি-ও জাতীয় দলের স্বীকৃতি হারিয়েছে। তাহলে আলোচনা শুধু সিপিআইকে নিয়ে কেন? জবাব সহজ, বাকি দল দুটি বয়সে নবীন তাই শুধু নয়, আগামী কয়েকটি ভোটেই তারা ফের ন্যাশনাল পার্টির স্বীকৃতি ফিরে পেতে পারে। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির হালের দুরবস্থা দেখে তা বলা যায় না।
১৯৫২-তে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ৫৩টি দলের মধ্যে তারা ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। হতে পারে ৪৮৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৬টি (তৎকালীন মাদ্রাজ থেকে আটটি, পশ্চিমবঙ্গে পাঁচটি, ত্রিপুরায় দুটি, ওড়িশায় একটি) আসনে জয়যুক্ত হয়েছিল, কিন্তু সংসদ ভবনে চার কমিউনিস্ট নেতা—ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, ভূপেশ গুপ্ত, এসএ ডাঙ্গে এবং এ কে গোপালনের মূর্তি সংসদীয় গণতন্ত্রে কমিউনিস্টদের অবদান ও প্রভাবের স্মৃতি বহন করছে। ১৯৫৭-তে কেরলে ক্ষমতায় এসেছিল পৃথিবীর প্রথম নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার। দু বছর পর সেই সরকারকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করার পর পরের নির্বাচনেই দুই-তৃতীয়াংশ আসন হাত ছাড়া হয়ে যায় তাদের। তারপর তো পার্টি ভেঙেই গেল।
নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকেই। অথচ বামপন্থীদের জন্য সেটাই হয়ে উঠছে অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ। কেরল ব্যতিক্রম সে রাজ্যের ভোটারদের বিশেষ অবস্থানের কারণে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় যেখানে বছরের পর বছর বামপন্থী ফ্রন্ট সরকার (CPM) ক্ষমতায় ছিল সেখানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারা আর ভোটারের মনে দাগ কাটতে পারছে না।
২০০৬ যে বাংলায় ২৯৪ আসনের মধ্যে যে বাম জোটের দখলে ছিল ২৩৫ আসন, ২০২১ -এ তারা বিধানসভায় শূন্য হয়ে গেল। শূন্যতে নেমে গিয়েছিল কংগ্রেসও। তারা যদি সাগরদিঘির উপনির্বাচনে হেরেও যেত, আগামী বছর লোকসভা ভোটে মালদা, মুর্শিদাবাদ তাদের খালি হাতে ফেরাবে বলে এখনও মনে হয় না। সিপিএম-সিপিআই সম্পর্কে তা বলার মতো পরিস্থিতি দল দুটি এখনও তৈরি করতে পারেনি। ফলে ২০২৪-এর পর সিপিএমেরও জাতীয় দলের স্বীকৃতি থাকবে কি না সন্দেহ আছে।
অথচ, ২০১৪-র লোকসভা ভোটে বিহারে লালুপ্রসাদের দল আরজেডি একটি আসনেও জিততে পারেনি। পরের বছর বিধানসভায় তারাই বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ইমার্জেন্সির মতো ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে দেশ ও দলকে ঠেলে দেওয়া ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসকে তিন বছরের মাথায় দিল্লির মসনদে ফিরেছিলেন।
বিহারের প্রসঙ্গে ফিরি। ষাট-সত্তর-আশি-নব্বইয়ের দশকে পড়শি রাজ্যটিতে লোকের মুখে মুখে ফিরত ভাকপা (ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি) ও মাকপা (মার্কসবাদী কমিউনস্ট পার্টি)-র কথা। রামো (রাষ্ট্রীয় মোর্চা) বামো (বাম মোর্চার) কথা নয়ের দশকে লালুপ্রসাদ, নীতীশ কুমারদের মুখে প্রায় শুনতাম। ওই সব দিনেই ভুবনেশ্বরে সিপিএমের কৃষক সভার জাতীয় সম্মেলন কভার করতে গিয়ে দেখেছি লালঝাণ্ডা হাতে স্থানীয় মানুষের বিশাল জমায়েত। চেন্নাইয়ে সিপিআইয়ের পার্টি কংগ্রেস উপলক্ষ্যে মেরিনা বিচের সমাবেশের ভিড় দেখে মনে হয়েছিল কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। এলাহাবাদ, বারাণসীতে জ্যোতি বসু, হরকিষেন সিং সুরজিতদের জনসভার ভিড়কে বাংলার থেকে আলাদা করা যেত না।
সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৪-এর লোকসভা ভোটে চার বাম দল সিপিএম, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি মিলে পেয়েছিল ৫৯ আসন। তখনও নির্মম সত্যটি ছিল, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, তামিলনাড়ু ও কেরলের বাইরে গোটা দেশের আরও কোথায় আসন জেতা দূর থাক জমানত রক্ষা হয়নি বামেদের। অনুমান করা যায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাম ভোটাররা এখন নোটায় ভোট দেন। কমতে কমতে সংসদে দুই কমিউনিস্ট পার্টির সাংসদ এখন মাত্র পাঁচ।
অথচ ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িকতা, বেকারি, বঞ্চনা, দারিদ্রের মুখে বামপন্থীদের রাজনীতিই গোটা দেশে বিকশিত হওয়ার কথা। কিন্তু ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন নেই।
জাতীয় দলের মর্যাদা হারানো সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজার কাছে এর কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি জবাবে দুটি কথা বলেছেন। বামেদের প্রভাব বোঝাতে বলেছেন, বুদ্ধিজীবী, তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সিংহভাগ বাম চিন্তার মানুষ, সে তারা যে পার্টিতেই থাকুন না কেন। দুই. ভারতীয় সমাজের বেশ কিছু প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। একটি হল, শ্রেণি বৈষম্য ও শোষণ। অন্যটি হল সামাজিক অসাম্য ও বৈষম্য, অর্থাৎ জাতপাত। তারপর আছে পিতৃতন্ত্র, লিঙ্গ বৈষম্য এবং ক্ষমতাহীনতা। তাই শ্রেণি, বর্ণ ও পুরুষতন্ত্রের মোকাবিলা করতে হবে। বামপন্থীরা এটা করে। কিন্তু অন্যরা জাতি ও ধর্মের দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে। এটি বামপন্থীদের জন্য সত্যিই একটি সমস্যা।
রাজার কথার প্রথম অংশের সঙ্গে দ্বিতীয় অংশের উপলব্ধির ফারাকটিই সম্ভবত ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি-সহ বামদলগুলির মৌলিক সমস্যার একটি। তা হল, ভারতের বাস্তবতায় জাতিগত এবং শ্রেণিগত সংঘাতের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। দলিত, আদিবাসী, মুচি, মেথর, মুশহরদের ৯৯ ভাগের দারিদ্র্যের মূলে আছে সামাজির বৈষম্য নির্দেশিত শোষণ-শাসন ব্যবস্থা। কমিউনিস্ট পার্টি মেহনতি মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে এই বাস্তবতাকে জুড়ে নিয়ে এগলে জাতপাতের রাজনীতির আজকের মতো ঘৃণ্য রূপ নাও নিতে পারত। পরিবর্তে গোড়া থেকেই দুই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব হিন্দু উচ্চ শ্রেণি, উচ্চবর্ণ, উচ্চ শিক্ষিতের খপ্পড়ে পড়ে ক্রমে জন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। নারী, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের সমানুপাতিক ঠাঁই হয়নি। দলেই সমাজের সব অংশের প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে আগে জরুরি।
অন্যদিকে, বামেরা পশ্চাৎপদ অংশের কল্যাণে রাজনীতিকে জাতপাতের রাজনীতি বলে তাচ্ছিল্য করে এসেছে বরাবর। অথচ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশে জাতপাতের রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন দলগুলির সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়ার সুবিধাবাদী রাজনীতি করতে বাধেনি তাদের।
তাদের দ্বিতীয় সমস্যা শৃঙ্খলাপরায়ণতার নামে শৃঙ্খলিত পার্টি শাসনতন্ত্র। প্রতি পদে জবাবদিহি আর ফিতেয় মেপে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না জাতীয় নিয়মতান্ত্রিকতা একবিংশ শতাব্দীতে অচল। এই অনুদার ব্যবস্থায় বামপন্থী নেতা-কর্মীদের মধ্যে অদৃশ্য ঘেরাটোপ তৈরি হয় যা আম আদমির সঙ্গে নৈকট্যের পরিবর্তে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
বিগত কয়েক বছর যাবৎ তারা অবশ্য মহারাষ্ট্রে আম্বেদকরবাদীদের সঙ্গে, তামিলনাড়ুতে পেরিয়ার মতবাদীদের সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, ‘জয় ভীম’ স্লোগানে, দলিত, আদিবাদী, সংখ্যালঘুর ঐক্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হচ্ছে। এতদিনে ধর্ম ও জাতের মিশেলে গোটা দেশ কব্জা করতে গেরুয়া শিবির অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। দুই কমিউনিস্ট পার্টির এখন আশু কর্তব্য সম্ভবত দুই পার্টির মিলন। পার্টি ভাঙনে একটি বড় ইস্যু ছিল কংগ্রেস সম্পর্কে মূল্যায়নে ফারাক। আজ দুই কমিউনিস্ট পার্টিই যদি কংগ্রেসের পাশে দাঁড়াতে পারে, তাহলে তাদের নিজেদের মিলে যেতে আপত্তি কোথায়?
এক যুগ পর ফের চালু নন্দীগ্রাম-দেশপ্রাণ রেল লাইনের কাজ, খুশি স্থানীয়রা