
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 24 November 2024 17:12
অমল সরকার
স্থানীয় অশান্তির কারণে বেলডাঙা ক’দিন যাবৎ সংবাদের শিরোনাম। বছরের গোড়ায় লোকসভা নির্বাচনের ভোটের খবর সংগ্রহে এক সন্ধ্যায় মুর্শিদাবাদের এই ব্লকটিতে গিয়েছিলাম। তৃণমূল প্রার্থী ইউসুফ পাঠানের রোড শো দেখতে এলাকার কয়েক হাজার মানুষ সঙ্কীর্ণ রাস্তার দু-পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন। তাদের সত্তর-আশি ভাগই বাড়ির মেয়ে-বউয়েরা। কয়েক কদম পর পর আলাদা করে পুরুষদের জটলা নজরে আসছিল। তাঁদের মধ্যে এক প্রবীণের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘তৃণমূল যতই চুরিচামারি করুক, দিদি আমাদের পাশে আছে। গতমাস (মার্চ, ২০২৪) পর্যন্ত আমরা দেড় হাজার টাকা করে পেয়েছি। এ মাসে সেটা বেড়ে তিন হাজার হয়েছে। আমাদের মতো পরিবারে ওটা অনেক টাকা।’
ভদ্রলোক ‘লক্ষ্ণী ভাণ্ডার’ প্রকল্পের কথা বলছিলেন। প্রাপক তাঁর স্ত্রী, ভাই-বউ এবং অবিবাহিত বোন। এই তথ্য জানিয়ে স্বগতোক্তি করেছিলেন, ‘তবে কী জানেন, মুড়ি-মুড়কির একদর। ওই যে মেয়েটিকে দেখলেন স্কুটি চালিয়ে চলে গেল, ওঁর বাবা-দাদারা ভাল মাইনের সরকারি চাকরি করে। দোতলা বাড়ি। ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এসি, কী নেই।’ সেবার বেলডাঙ্গা, মুর্শিদাবাদ, মহরমপুর, লালগোলা, ডোমকলে বহু মহিলার সঙ্গে দেখা হয়েছিল যারা পাঁচজনের সামনেই বলেছিলেন, ‘ভোট তৃণমূলকে দেব।’
মহিলাদের মুখে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার কথা আমি আগেও বহুবার শুনেছি। বিশেষ করে গরিব ঘরের মহিলারা সবটা বুঝিয়ে বলতে না পারলেও অনুমান করা যেত, তাঁরা আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেন; তাই ভোটটা তৃণমূলকে দেন। নদিয়ার কালিগঞ্জে এক মহিলা বলেছিলেন, ‘আমরা পাড়ার বাইকবাজ ছেলেছোকড়াদের দিকে চোখ তুলে দু’কথা বলতে ভয় পাই, আর উনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে লড়াই করছেন। দিদি আমাদের এখানে ভোট করলে (প্রার্থী হলে) ভাল হত।’
আশ্চর্য হয়েছিলাম, লোকসভা নির্বাচনের সেই মহিলাদের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই-সংগ্রামের কথা না শুনে। তবে লক্ষ্ণীর ভাণ্ডারের টাকা নিয়ে সকলেই বেজায় খুশি। যদিও বেলডাঙার সেই ভদ্রলোকের মতো অনেক মহিলার মুখেই তেলা মাথায় তেল দেওয়ার অনুযোগও শুনেছি। বিজেপি ও বামেরা আবার অন্ধ মমতা বিরোধিতার পথে হেঁটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বাস্তবিক প্রয়োজনকে অস্বীকার করে ভোটের বাক্সে বারে বারে গোল খাচ্ছে।
শনিবার মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা এবং পশ্চিমবঙ্গের ছয়টি ও উত্তর প্রদেশের দশটি বিধানসভা আসনের উপ নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে। চার রাজ্যের ফলই এক অর্থে অভাবনীয়। মহারাষ্ট্রে বিজেপির নেতৃত্বাধীন মহায়্যুতির টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, এমন নয়। লোকসভা ভোটে ভাল ফল করা বিরোধী মহাবিকাশ আগাড়ির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনাও কেউ নসাৎ করেনি। ফলাফলে দেখা গেল প্রত্যাশিত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়নি। বিরোধীদের ধূলিসাৎ করে দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখল ক্ষমতাসীন মহায়্যুতি।
ঝাড়খণ্ডে বরং বিজেপির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা তুলনায় বেশি ছিল। জেএমএমের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনের দুর্নীতির মামলায় জেল খাটা, দলের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রবীণ নেতা চম্পাই সরেনের দলত্যাগ, নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের মুখে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ঘিরে পরিস্থিতি হেমন্তের জন্য ছিল অনিশ্চিয়তায় ভরা। অন্যদিকে, বাংলায় তৃণমূল বিজেপির হাতে থাকা আসনটিও ছিনিয়ে নিয়ে উপনির্বাচনে ছয় আসনই দখল করেছে। আরজি করের ঘটনা নিয়ে তৈরি হওয়া জন-আন্দোলনের কোনও প্রভাব ভোটের বাক্সে ধরা পড়েনি। উত্তর প্রদেশেও ক্ষমতাসীন বিজেপিই বাজিমাৎ করেছে উপনির্বাচনে।
অর্থাৎ দুই রাজ্যে বিধানসভার সাধারণ নির্বাচন এবং দু’টিতে একাধিক আসনে উপনির্বাচনের ফলের অভিন্ন দিকটি হল, ক্ষমতাসীন দল নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে নিয়েছে। ফলাফলে এই অভিন্নতা গড়ে দিয়েছেন মহিলারা। তাঁরা বিজয়ী দলের নারী কল্যাণ প্রকল্পের প্রতি বেশি আস্থাজ্ঞাপন করেছেন। যেমন মহারাষ্ট্রে বিজেপি জোট সরকারের ‘মুখ্যমন্ত্রী লাডলি বহেনা’ যোজনায় গত তিন মাস ধরে প্রায় দু কোটি মহিলা মাসে দেড় হাজার টাকা করে পেয়েছেন। অর্থাৎ দু’কোটি পরিবার উপকৃত। প্রাক্ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অচিরেই টাকার অঙ্ক বেড়ে ২১০০ হবে। বিপরীতে বিরোধী মহা বিকাশ আগাড়ি মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও মহিলারা ক্ষমতাসীন সরকারকে সমর্থন করেছে এমন প্রকল্প চালু করার জন্য।
পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দেখাদেখি কর্নাটকে কংগ্রেস গৃহলক্ষ্মী যোজনা চালু করে গত বছর বিজেপিকে হটিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে। তেলেঙ্গানায় কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফেরার পিছনে তুরুপের তাস ছিল ‘মহালক্ষ্ণী যোজনা’। বিজেপি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নরেন্দ্র মোদী এই সব যোজনাকে যতই ‘রেউড়ি (বাংলার রসগোল্লা, সন্দেশের মতো উত্তর ভারতে বহুল প্রচলিত মিষ্টি) বিলির খয়রাতি বলে কটাক্ষ করুন না কেন, বিজেপি এখন তাঁর উপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারছে না। জনপ্রিয়তারও ‘এক্সপায়েরি ডেট’ থাকে। তিনি যে আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘ভোট ক্যাচার’ নন, লোকসভা নির্বাচনেই মোদী বুঝে গিয়েছেন। তাঁর ভরসায় চারশো আসন দখলের ডাক দিয়ে বিজেপিকে আড়াইশোর নিচে থামতে হয়েছে।
ফলে পদ্মশিবিরও এখন কোথাও ‘লড়কি-বহেনা’, তো কোথায় ‘লাডলি বহেনা’ (আদরের বোন) স্কিম চালু করে বাজিমাত করছে। ক্যাশ টাকার সঙ্গে আছে সস্তায় রান্নার গ্যাস, বাসে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুবিধা ইত্যাদি। মুদ্রার উল্টো পিঠের ছবিটা হল, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যৌন নিপীড়নের ঘটনা। নিখরচায় বাস যাত্রায় কিন্তু নিরাপত্তার গ্যারান্টি নেই।
অথচ, মোদী সরকার সুপ্রিম কোর্টে এই জাতীয় স্কিম বন্ধ করতে জোর সওয়াল করছে। বছর দুই আগেও প্রধানমন্ত্রী সভার পর সভায় বলছেন, এই ভাবে খয়রাতি চললে রাস্তা, সেতু, হাসপাতাল, কলেজ তৈরির টাকা আসবে কোথা থেকে! বাংলায় সিপিএম লক্ষ্ণীর ভাণ্ডারের টাকাকে ভিক্ষার দান বলে কটাক্ষ করলেও কেরলে পিনারাই বিজয়নের সরকারও একই রাস্তায় হাঁটছে। ভোটদান কথাটি এখম অর্থহীন। বেশিরভাগ ভোটার নিজের ভোটটি আসলে বেশি সুবিধা প্রদানকারী দলের কাছে বিক্রি করছে। রাজনীতি, নীতি দুর্নীতি নিয়ে বাছবিচারের বালাই নেই। তৃণমূলের চুরি জোচ্চুরি, বিজেপির সাম্প্রদায়িক বিষ,
ভোটের বাজারে কিছুই পরিত্যায্য নয়।
আশ্চর্যের হল, জনমোহনী সুবিধা প্রদানে কোথাও এ জন্য পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আয়ের কোনও মাপকাঠি রাখা হয়নি। সম্পন্ন মধ্যবিত্ত ঘরেও ঢুকছে সরকারি দান প্রকল্পের টাকা। অথচ শুধু প্রকৃত দরিদ্র মহিলাদের বেছে নেওয়া হলে তাদের আরও বেশি টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল এবং তার প্রয়োজনও আছে। এই জাতীয় প্রকল্পের অন্ধ বিরোধিতাও বাস্তবকে অস্বীকার করা। আবার তেলা মাথায় তেল দেওয়ার জমিদারি বন্ধ হওয়াও সমান জরুরি।
যদিও সেই পথে হাঁটছে না কোনও দল, সরকারই। বিপিএল বা দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারীর তালিকাটিকে প্রায় সব সরকারই বিদায় জানিয়েছে। তারা কল্যাণ প্রকল্পগুলির দুয়ার সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এইভাবে নারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পিছনে অনুচ্চারিত লক্ষ্যটি হল তাদের ভোট কিনে নেওয়া। কে না বোঝে, সুবিধা দিয়ে যত বেশি মহিলাকে খুশি করা যাবে ভোটের বাক্সে তত লাভ। যে কারণে কোনও সরকারই এই জাতীয় স্কিম চালুর জন্য কোনও আইন করেনি। সবটাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হচ্ছে। অর্থাৎ দেওয়াথোয়াটা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর ছেড়ে রাখা হয়েছে। অনেক সময়ই কোষাগারের টানাটানির জন্য মাসের শুরুতে ব্যাঙ্কে টাকা জমা পড়ে না। যেভাবে টাকা বিলনোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তাতে আগামী দিনে কোষাগারে টানাটানির কথা বলে স্কিমগুলি গুটিয়ে নেওয়াও অসম্ভব নয়।
স্বভাবতই যারা এই প্রকল্পগুলিকে দেখিয়ে জনমুখী রাজনীতির জয়গান গাইছেন তাঁরাও আসল সরকারকে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন কোনও সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশে। জনমুখী রাজনীতির ঝাণ্ডাধারীরা বরং সরকারকে পরামর্শ দিতে পারতেন, অর্থ সাহায্য শুধুমাত্র দরিদ্র মহিলাদের দেওয়া হোক এবং সুবিধাভোগীদের আর্থিক সহায়তার একাংশ স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে বিনিয়োগ করে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে সামাজিক ব্যবসায় যোগদান নিশ্চিত করুক সরকার, যাতে তারা স্বাবলম্বি হতে পারে।
আরও একটি বিষয় প্রাসঙ্গিক। নারী কল্যাণই প্রকল্পগুলির উদ্দেশ্য হয়ে থাকলে সব সরকারেরই উচিত ছিল আর্থিকভাবে দুর্বল মহিলাদের জন্য আইন করে পেনশন প্রকল্প চালু করা। যাতে এই খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ সরকারের আবশ্যিক খরচের মধ্যে ধরা থাকে এবং তেলা মাথায় তেল না দিয়ে প্রকৃত দরিদ্রকে আরও বেশি অর্থ দেওয়া যায়।
রাজনীতি নির্বিশেষে কোনও সরকারেরই সে পথে না হাঁটার কারণ, লক্ষ্যটা ভোট, নারী কল্যাণ বা মহিলাদের ক্ষমতায়ন নয়। তা যদি হত, তাহলে সংসদে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিল সাড়ে তিন দশক পড়ে থাকার পর নাটকীয়ভাবে আইন পাশ করিয়েও তা ২০২৯-এর ভোটের জন্য ফেলে রাখা হত না। তৃণমূল কংগ্রেসের মতো হাতে গোনা কতিপয় দল বাদে বাকি পার্টিগুলি সংগঠনে, সংসদে, বিধানসভায় নারীদের সেভাবে স্থান দিচ্ছে না। কংগ্রেসের প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, জিএমকে’র কানিমঝি, এনসিপির সুপ্রিয়া সুলহে, বিআরএসের কে কবিতা, বিজেপির বাঁশুরী স্বরাজ, চলমান রাজনীতিতে আলোচিত মহিলারা পরিবার সূত্রে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন। সিপিএমের মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, দীপ্সিতা ধরেরা ব্যতিক্রম বটে, কিন্তু সংখ্যায় হাতে গোনা।
ঝাড়খণ্ডে জেএমএম-জোটের বিপুল জয়ে বিরাট ভূমিকা আছে কল্পনা সরেনের। স্বামী হেমন্ত সরেন দুর্নীতির মামলায়ে জেলে না গেলে এই নারী রাজনীতিতে আসতেন কিনা সন্দেহ। তাঁর মতো অনেক মহিলাই ‘কম্পেসনেট গ্রাউন্ডে’ রাজনীতির জুতোয় পা গলিয়েছেন।