1.webp)
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে কাজে ফেরার।
শেষ আপডেট: 12 September 2024 09:19
আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রতিবাদে জুনিয়র ডাক্তাররা এখনও কর্মবিরতি পালন করে চলেছেন। যে নারকীয় ঘটনা ঘটেছে হাসপাতালের ভিতরে, তার পর ডাক্তারদের নিরাপত্তাহীনতার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ রয়েছে ক্ষোভেরও। শুধু ডাক্তাররা নন, বাংলার সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ এই নির্যাতনের ঘটনাকে তাদের পরিবারের উপর আঘাত বলে মনে করছে এবং দ্রুত বিচার চেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বারবার পথে নেমেছে, নামছে।
কিন্তু এর পরেও প্রশ্ন থেকে যায়— আরজি কর মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে জুনিয়র ডাক্তাররা যেভাবে কর্মবিরতি পালন করে চলেছেন, তা নৈরাজ্যের লক্ষণ নয় কি? আরজি করের ঘটনায় দ্রুত বিচার তথা সুবিচারের দাবি এক জিনিস, কিন্তু যাঁরা জুনিয়র ডাক্তারদের লাগাতার কর্মবিরতিকে সমর্থন করছেন, তাঁরাও কি নৈরাজ্যকেই প্রশ্রয় দিচ্ছেন না?
আগে দেখে নেওয়া যাক গত সোমবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানির পর প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চ কী নির্দেশ দিয়েছিল? তা এ জন্যই ফের দেখে নেওয়া জরুরি কারণ, সুপ্রিম কোর্টের সেই নির্দেশ নিয়েও কেউ কেউ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন, বা নির্বাচিত অংশ উদ্ধৃত করে অযথা জটিলতা বাড়াতে চাইছেন।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জুনিয়র ডাক্তাররা যদি ১০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার মধ্যে কাজে ফেরেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে কোনও ব্যবস্থা নিতে পারবে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে এর পর যদি কোনও অভিযোগ ওঠে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কোনও অফিসারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এই সব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি জুনিয়র ডাক্তাররা লাগাতার অনুপস্থিত থাকেন তাহলে ভবিষ্যতে বিরূপ ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। কারণ, “যাঁদের পরিষেবা দেওয়া রেসিডেন্ট ডাক্তারদের কাজ, তা থেকে তাঁরা বিস্মৃত হয়ে থাকতে পারেন না, তাই উপরে উদ্ধৃত সময়ের মধ্যে তাঁদের কাজে ফেরা উচিত।” (The resident doctors cannot be oblivious of the needs of the general community whom they are intended to serve and they should return to work within the time indicated above.)
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের অর্থ সরল এবং পরিষ্কার। কিন্তু মঙ্গলবারের ডেডলাইন পেরোনোর পরে, বুধবার দেখা গেল, জুনিয়র ডাক্তাররা বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলিতে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার পরিস্থিতি সুনিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। তা এখনও সরকার করতে পারেনি। তাই জুনিয়র ডাক্তাররাও কাজে যোগ দিচ্ছেন না।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, হাসপাতালের নিরাপত্তা পরিকাঠামো দ্রুত বাড়ানোর জন্য সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারকে সাত দিন সময় দিয়েছে। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে আরজি কর মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকারকেও স্ট্যাটাস রিপোর্ট দিয়ে জানাতে হবে অতিরিক্ত আরও কত সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য রেস্টরুম ও টয়লেটের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা হয়েছে কিনা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট কখনওই বলেনি, ততদিন পর্যন্ত জুনিয়র ডাক্তাররা কাজে যোগ না দিলেও চলবে।
এটা ঠিক, সুপ্রিম কোর্টের কোনও নির্দেশ বা রায় নিয়ে সাধারণ মানুষ বা জুনিয়র ডাক্তাররা সন্তুষ্ট নাও হতে পারেন। তার প্রতিকারেরও পথ রয়েছে। আদালতে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা যেতে পারে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা প্রধান বিচারপতির নির্দেশ অমান্য করে কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়া মোটেই যুক্তিযুক্ত কাজ নয়।
আরও একটি বিষয় এখানে প্রাসঙ্গিক। বুধবার স্বাস্থ্য ভবনের সামনে থেকে জুনিয়র ডাক্তারদের এক প্রতিনিধিকে বলতে শোনা গিয়েছে, 'আমরা শিক্ষানবিশ। গোটা রাজ্যের সমস্ত ডাক্তারের তুলনায় আমরা সংখ্যায় নগণ্য। ফলে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আমাদের উপর নির্ভর করে থাকা উচিত নয়। তাহলে বুঝতে হবে, রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হালই বেহাল।'
মনে রাখতে হবে, কমবেশি এই যুক্তি সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতেও দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন চিকিৎসকদের তরফের আইনজীবী। তিনি বলেছিলেন, জুনিয়র ডাক্তাররা কর্মবিরতি পালন করলেও সিনিয়র ডাক্তাররা কাজ করছেন।
তবে তা শোনামাত্রই প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় বলেন, সিনিয়ররা কাজ করছেন বলে জুনিয়ররা কাজ করবেন না এটা কোনও যুক্তিই হতে পারে না। শুধু তাই নয়, জুনিয়র ডাক্তারদের কাজে ফেরার ব্যাপারে ৭২ ঘণ্টা সময়ও চেয়েছিলেন ওই আইনজীবী। তাতেও রাজি হয়নি সুপ্রিম কোর্ট। বরং প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, সময় তো দেওয়া হচ্ছে। সোমবার থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত তাঁরা সময় পাচ্ছেন।
সুপ্রিম কোর্টের এই সব নির্দেশ না মানাকে কেউ কেউ যেমন সমর্থন করছেন, তেমনই এক শ্রেণির মানুষকে দেখা যাচ্ছে সমাজমাধ্যমে ঠারেঠোরে সর্বোচ্চ আদালতকে কটাক্ষও করছেন। এমনকি অনেকে প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় ও তাঁর স্ত্রী, পারিবারিক যোগ নিয়ে ভুয়ো খবর পর্যন্ত রটাচ্ছেন। কোনও সন্দেহ নেই, যে এদের উদ্দেশ্যও নৈরাজ্যের পরিস্থিতি তৈরি করা বা করার চেষ্টা করা।
এটা ঠিক, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবসরের পর যেভাবে বিজেপির অনুগ্রহে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন, তা অনেকেই ভালভাবে নেননি। রঞ্জন গগৈয়েরও আগে পালানিস্বামী সথাশিবম ছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি। মোদী জমানায় তাঁর রাজ্যপাল হওয়ার সৌভাগ্য হয়। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় পদত্যাগ করে যেভাবে বিজেপির খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন, তাও বহু মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক দেশে বিচারব্যবস্থার স্থান অনন্য ও সর্বোচ্চ। আইনসভায় পাশ হওয়া আইনও খারিজ করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের। সংবিধানকে ব্যাখ্যা করার অধিকারও রয়েছে। দেশের রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান বিচারপতিই। এই কাঠামোকে মর্যাদা না দেওয়ার অর্থ দেশের গণতন্ত্রকেই দুর্বল করা। কারণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই হল সবার উপরে। সেই প্রতিষ্ঠানের অমর্যাদা করা হলে বা তাকে অমান্য করা হলে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে নষ্ট করা হয়। যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও দেশের বড় ক্ষতি করে দিতে পারে। তাই নৈরাজ্য কখনওই কাঙ্ক্ষিত নয়।
এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। আরজি করের ঘটনায় অপরাধীদের খুঁজে বের করা ও দ্রুত বিচার খুব স্বাভাবিক ভাবেই চাইছে মানুষ। নির্যাতিতার মাও সঠিক কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, বিচার চাই বললে হবে না। বলতে হবে, বিচার দাবি করছি। উই ডিমান্ড জাস্টিস।
কিন্তু এরই মধ্যে কেউ বা কারা রটিয়ে দিচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট রায় ঘোষণা করছে না বা করতে দেরি করছে। জানিয়ে রাখা ভাল, আদালতের নির্দেশে আরজি কর কাণ্ডের তদন্ত করছে সিবিআই। অতীতে বহু তদন্তের ক্ষেত্রে সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে বারবার দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ উঠেছে। বাংলায় চিটফান্ড মামলার তদন্ত গত দশ বছরেও শেষ করতে পারেনি সিবিআই। কিন্তু সোমবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা এই তদন্তের গতিপ্রকৃতির উপর নজর রাখছে। আর সেই কারণেই সাত দিনের ব্যবধানে সিবিআইয়ের থেকে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে দ্বিতীয় স্ট্যাটাস রিপোর্ট চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সিবিআই দ্রুত তদন্ত শেষ করে অপরাধী বা অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পারলে তার শুনানি নিম্ন আদালতেই হবে।
সুতরাং সিবিআই দ্রুত বিচার করছে না বলে কেউ কেউ যে বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছে তাও ঠিক নয়। আরজি করের নারকীয় অপরাধের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করা এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি যথার্থ। কিন্তু মনে রাখতে হবে তা করতে গিয়ে আমরা যেন নৈরাজ্য ডেকে না আনি। তা কারও জন্যই ভাল হবে না, নিরাপদেরও হবে না।