
শেষ আপডেট: 12 May 2024 19:29
অমল সরকার
জোসেফ গোয়েবলসকে নিয়ে সম্প্রতি একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। ব্রিটেনের ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার খবর অনুযায়ী উত্তর বার্লিনে গোয়েবলসের বাড়িটি স্থানীয় প্রশাসন আর নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে না। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাড়তে থাকায় তারা সেটি বেসরকারি হাতে তুলে দিতে চায়।
বাড়িটির পরিণতি শেষ পর্যন্ত যাই হোক না কেন, মিথ্যার স্বর্গ তৈরির কারিগর তথা হিটলারের প্রচারমন্ত্রীর কু-কীর্তির কাহিনি যেমন ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে, তেমনই তাঁকে অনুকরণ, ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও থেমে যাবে না। যিনি কিনা বিশ্বাস করতেন কোনও মিথ্যা বারে বারে প্রচার করা হলে মানুষ একটা সময় তা বিশ্বাস করতে শুরু করবে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নির্বাচনী ভাষণগুলি শুনলে মনে হবে তিনি যেন গোয়েবলসকেও ছাপিয়ে যেতে চাইছেন। ভোটের প্রচার তুঙ্গে ওঠার পর নরেন্দ্র মোদী-সহ গোটা বিজেপি পরিবারের সুর বদল নতুন খবর নয়। তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভোটের দফা যত ফুরিয়ে আসছে, মোদীর নেতৃত্বে ততই মিথ্যার স্বর্গ নির্মাণ করে চড়া সুরে মুসলিমদের টার্গেট করছেন বিজেপি নেতারা।
রবিবার বাংলায় প্রচারে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের হরেক কৌশল ব্যবহার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ফের বলেছেন, বাংলায় হিন্দুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা হয়েছে। আরও বলেছেন, বিরোধী জোট সরকার গঠন করলে তফসিলি জাতি, উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হবে। ওরা চায় পুরো সংরক্ষণ মুসলমানদের দেওয়া হোক।’ এরপর জনতার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন ছুড়ে দেন ‘আপনারা এটা মেনে নেবেন? দেশের দলিত, আদিবাসী, অনগ্রসর শ্রেণি এই অন্যায় সহ্য করবে?’
দিন কুড়ি যাবত প্রতিটি সভাতেই মোদী-বাহিনী ‘মুসলিম জুজু’ দেখিয়ে হিন্দুদের মনে ভয় ধরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত শুক্রবার অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বাংলায় এসে বলে গিয়েছেন, ‘ভারত হিন্দুরা তৈরি করেছে। এই দেশে থাকতে হলে হিন্দু হয়েই থাকতে হবে।’
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছেন, ‘কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মুসলিমদের গরুর মাংস খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। তার মানে আবার গো-মাতাকে হত্যা করা হবে।’ অমিত শাহের কথায়, ‘বিরোধীরা সরকার গড়তে পারলে অযোধ্যার রাম মন্দিরে বাবরি নামের তালা ঝুলিয়ে দেবে।’
অন্যদিকে, কংগ্রেসের ইস্তাহার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ওই দল ক্ষমতায় এলে দেশের সম্পদ মুসলিমদের বিলিয়ে দেবে। হিন্দু নারীর মঙ্গল-সূত্র কেড়ে নেওয়া হতে পারে। সব মিলিয়ে গেরুয়া বাহিনী প্রচারে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, একমাত্র বিজেপি হিন্দুর কল্যাণ কামনা করে। মুসলিমদের ভাল চায় কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা, যা বিজেপি একেবারেই চায় না।
ঘটনা হল, কংগ্রেস কেন, কোনও বিরোধী দল মুসলিমদের স্বার্থে এমন কোনও কথা বলেনি যা হিন্দুদের স্বার্থহানির কারণ হতে পারে। কিন্তু গোয়েবলসিয় কায়দায় প্রধানমন্ত্রী ও তার অনুচরেরা মিথ্যার স্বর্গ নির্মাণে নেমেছেন। আশি শতাংশ হিন্দুকে তারা বিশ্বাস করাতে ব্যস্ত যে কুড়ি শতাংশ সংখ্যালঘুর জন্য তাদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেবে বিরোধীরা। এইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ঐক্যমত গড়ে তুলতে চাইছে বিজেপি, যার গোড়ার কথা হল মুসলিম বিদ্বেষ। প্রধানমন্ত্রীর দরদী ভাষণে হিন্দুত্ববাদীদের দলিত, তফসিলিদের সংরক্ষণের সুবিধাদানের বিরোধিতার দীর্ঘ ইতিহাস চাপা পড়ে যাচ্ছে।
মুসলিম বিদ্বেষ নিয়ে বছর দুই আগে গুজরাত বিধানসভার নির্বাচনের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কথাটি স্মরণ করা যাক। তিনি বলেছিলেন, ‘২০০২-এ ওদের উচিত শিক্ষা দেওয়ায় রাজ্যে পাকাপাকিভাবে শান্তি এসেছে।’ অর্থাৎ নাম না করে গুজরাত দাঙ্গাকে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসাবে তুলে ধরেন পদ্ম-শিবিরে হিন্দুত্বের দ্বিতীয় জাগ্রত মুখ। যে দাঙ্গায় শত শত নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন, সর্বস্ব হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে কয়েক হাজার পরিবার, যাদের সিংহভাগই ছিলেন মুসলিম। আসলে গুজরাত দাঙ্গার নেপথ্যে যে বিবাদ, সেই বাবরি ধ্বংসের ঘটনায় বিচারের প্রহসন দেখে সাধারণ সংখ্যালঘু জনতা উপলব্ধি করেছে, লাথিঝাঁটা খেয়েও মুখ বুজে থাকাই শ্রেয়; কারণ জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ চলে না।
প্রাক্ নির্বাচনী সমীক্ষার ফলাফল, মোদীর সভায় উপচে পড়া ভিড়, শাহের বিভাজন, ঘৃণা উসকে দেওয়া ভাষণ, বিলকিস বানোর ধর্ষক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া, কংগ্রেসের দিশাহীনতা সত্ত্বেও গুজরাতের মতো রাজ্যে বিজেপি নিশ্চিত থাকতে পারেনি সেবার। ঝুলি থেকে শেষে পুরনো অস্ত্রটি বের করে। ধর্মের সুড়সুড়ি আর ভয় ধরানোর থেকে ভোট কেনার ভাল ‘অস্ত্র’ কমই আছে।
দু-বছর আগের সেই নির্বাচনই ছিল ‘আমরা’ থেকে মোদীর পুরোদস্তুর ‘আমি’-তে উত্তরণের সূচনা। সেবার হিমাচলপ্রদেশে ভোটের প্রচারে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। আমাকে দেখে ভোট দিন।’ নিজের রাজ্যে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এই গুজরাত আমি গড়েছি।’
প্রধানমন্ত্রীর সেই আত্মসর্বস্বতাই ফুটে ওঠে ‘মোদীর গ্যারান্টি’ স্লোগানে, যা তাঁর দলও গ্রহণ করেছে। বিজেপির ইস্তাহার তথা সংকল্পপত্রে মোদীর তরফে পঁচিশটি গ্যারান্টির উল্লেখ আছে। কিন্তু স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী এখন আর বলছেন না, ‘ইয়ে মোদী কা গ্যারান্টি হ্যায়।’
অথচ, বছরের গোড়ায় ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধনের আগে মোদী তাঁর প্রশাসনকে পথে নামিয়ে দিয়েছিলেন। উন্নয়নের রথ ছুটিয়ে ছিলেন দেশের প্রতিটি কোণায়। দেশব্যাপী ‘বিকশিত ভারত সংকল্প যাত্রা’র আয়োজন দেখে মনে হয়েছিল, উন্নয়ন এবং হিন্দুত্বকে সামনে রেখেই তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রিত্বের কুর্সি দখলে নামবেন তিনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কথাবার্তায় স্পষ্ট ‘হিন্দুত্বের সিঙ্গল ইঞ্জিন’-ই তাঁর একমাত্র গ্যারান্টি। দশ বছরের প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের গ্যারান্টি গেলাতে না পেরে শেষে পুরোপুরি হিন্দুত্বের আশ্রয়প্রার্থী হয়েছেন, যা আসলে দল ও আরএসএসের সেই অংশের কাছে মোদীর হার, যাঁরা তাঁর আত্মম্ভরিতা মেনে নিতে পারছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে মোদী দলের মুখ রক্ষা করতে পারলে আগামী বছর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের শতবর্ষের অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে তাঁর হিন্দু ‘হৃদয় সম্রাট’ শিরোপা পাওয়া অসম্ভব নয়।