Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে হেরে টেবিলের তলানিতে কেকেআর! গুরুতর বদলের ইঙ্গিত রাহানের নববর্ষের 'শুভনন্দন'-এও মুখ্যমন্ত্রীর SIR তোপ! বাংলায় পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীরইরানের সব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে‌ দেওয়া হয়েছে, দাবি আমেরিকার, চিন্তা ইরানি ল্যান্ডমাইনও Poila Baisakh: দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট, নববর্ষে অগণিত ভক্তের ভিড়, পুজো দিতে লম্বা লাইনপয়লা বৈশাখেই কালবৈশাখীর দুর্যোগ! মাটি হতে পারে বেরনোর প্ল্যান, কোন কোন জেলায় বৃষ্টির পূর্বাভাসমেয়েকে শ্বাসরোধ করে মেরে আত্মঘাতী মহিলা! বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে জোড়া মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ ৩৩ বছর পর মুখোমুখি ইজরায়েল-লেবানন! ওয়াশিংটনের বৈঠকে কি মিলবে যুদ্ধবিরতির সমাধান?

মনোজ মিত্র ও তাঁর নাটক: মঞ্চের মানুষটিকে যেমন দেখেছি বাস্তবে

তাঁর নাটকে ঘুরেফিরে আসে মানুষ, মানুষের সমস্যা, সংকট ও তা থেকে উত্তরণের প্রত্যাশা। বিশেষ কোনও 'ইজম' নয়, নানা মুখচ্ছদে তিনি মানুষের কথা বলেন।

মনোজ মিত্র ও তাঁর নাটক: মঞ্চের মানুষটিকে যেমন দেখেছি বাস্তবে

মনোজ মিত্র।

শেষ আপডেট: 14 November 2024 11:03

জয়ন্ত সিনহা মহাপাত্র

মনোজ মিত্রকে পর্দায় প্রথম কবে দেখেছি, মনে নেই। তবে 'শত্রু' সিনেমায় তাঁকে দেখে খুব রাগ হয়েছিল। তাতেই পরে বুঝেছিলুম, তিনি কত বড় অভিনেতা। তাঁকে প্রথম সামনে থেকে দেখি তেইশ বছর আগে। তার পরে ব্যক্তিগত সম্পর্কও গড়িয়ে গেল প্রায় কুড়ি বছরের। পর্দার মনোজ মিত্র আর মানুষ মনোজ মিত্র যে কত আলাদা, যত দিন গেছে তা তত বেশি করে উপলব্ধি করেছি।

তাঁর মতো হৃদয়খোলা অনুভূতিপ্রবণ মানুষ খুব কম দেখেছি। তাঁদের বেলগাছিয়ার বাড়িতে গেছি, সল্টলেকের বাড়িতে গেছি, গল্প-কথায় কত সময় কেটেছে। সিনেমার কথা, থিয়েটারের কথা, নাটক সৃষ্টির কথা। সে সব আমার জীবনের অমূল্য সময়। বুঝেছি, ভাল সাহিত্যিক, নাট্যকার অথবা অভিনেতা হতে হলে আগে ভাল মানুষ হতে হবে।

ভাল মানুষ মনোজ মিত্র। তিনি মানুষের কথা ভাবেন। তাঁর নাটকেও ঘুরেফিরে আসে মানুষ, মানুষের সমস্যা, সংকট ও তা থেকে উত্তরণের প্রত্যাশা। বিশেষ কোনও 'ইজম' নয়, নানা মুখচ্ছদে তিনি মানুষের কথা বলেন। নিবিড়ভাবে জাগিয়ে রাখেন মানবিক দৃষ্টিকে। দেখি নানা রঙের মানুষ, সমাজ, সমকাল ও সমকালের সমস্যাকে। আবার তিনিই দেন সম্ভাব্য সমাধানের পথ নির্দেশ।

বৃদ্ধ চরিত্র নির্মাণে তিনি অদ্বিতীয়। তাঁদের রাগ, প্রত্যাশা, অসহায়তা—নানা শেডে ধরেছেন নাটকে। বলেছেন তাঁদের অভিমান, অসহায়তার গল্প। 'মৃত্যুর চোখে জল'-এর বঙ্কিম, 'পরবাস' নাটকের গজমাধব, 'সাজানো বাগান' নাটকের বাঞ্ছারাম—সকলেই বেঁচে থাকার জন্য, একটু ভাল থাকার জন্য কত ফন্দিফিকির করে। 'চাক ভাঙা মধু'র জটাও বাঁচতে চায়। সেজন্য অঘোর ঘোষের মৃত্যু হলেও ক্ষতি নেই। আসল হল বেঁচে থাকা। তাঁর নাটক বেঁচে থাকার কথা বলে। মানুষের বাঁচা, প্রকৃতির বাঁচা, সভ্যতার বাঁচা।

মনোজ মিত্রের ভারী ভালবাসার বিষয় ছিল পুরাণ-ইতিহাস। তক্ষক, অশ্বত্থামা, মেষ ও রাক্ষস, রাজদর্শন,   ছায়ার প্রাসাদ, যা নেই ভারতে, ভেলায় ভাসে সীতা—এ সবই বাংলা নাটকের সম্পদ। 'মেষ ও রাক্ষস ' রূপকথা ফ্যান্টাসির মোড়কে সাতের দশকের শেষ পর্বের ভারতবর্ষের রাজনৈতিক চিত্র। 'রাজদর্শন' আটের দশকের ভারতবর্ষের ছবি। নাটকটিতে ইতিহাস-রূপকথার আশ্রয়ে সমকালীন অসঙ্গতি, দুর্নীতি, লোভ, স্বার্থপরতা, নীচতা, শঠতা তুলে ধরেছেন। কথাসরিৎসাগরের উপাখ্যানকে নির্ভর করে এমনভাবে নাটকের চরিত্র ও সংলাপ রচনা করেছেন, পাঠক-দর্শকরা সহজেই রূপকথা থেকে বাস্তবে, বাস্তব থেকে রূপকথায়  যাতায়াত করতে পারেন।

'ছায়ার প্রাসাদ' আবার ইতিহাস নির্ভর নাটক। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের পরে এবং অশোকের আগে যে দ্বন্দ্বক্ষুদ্ধ সময়বৃত্তে মাগধী সম্রাট বিন্দুসার ক্ষমতায় আসীন হন, সেই অস্থির সময়ের নাট্যচিত্র 'ছায়ার প্রসাদ'। মনোজ মিত্র 'যা নেই ভারতে' নাটকে মহাভারতের ইতিহাসকে মিলিয়ে দিয়েছেন সমকালীনতায়।  নির্মাণ করেছেন মহাভারতের ভাষ্য। মহাভারতের সুবিশাল কাহিনিকে অবলম্বন করে দেখিয়েছেন সমকালের রাজনীতির মারপ্যাঁচ, সাম্রাজ্যবাদ, ক্ষমতালিপ্সা, বংশানুক্রমে ক্ষমতা ধারণ, শোষণ, লুণ্ঠণ ও নারীকে ভোগ করার মানসিকতা। এ নাটক এই সময়ের নাটক। চিরকালেরও।

'ভেলায় ভাসে সীতা' রাম কাহিনির পুনর্মূল্যায়ন। এ নাটকে দেখা যায় ক্ষমতা বিস্তারের প্রয়োজনে নারী টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে যুগে যুগে। তবে এ নাটকের সীতা সর্বংসহা নারী নয়, প্রতিবাদিনী সীতা। যে সহজেই বলতে পারে, 'রক্তের বদলে রক্ত চাই'।

'নরক গুলজার' মনোজ মিত্রের পুরাণের মুখচ্ছদে একটি রাজনৈতিক স্যাটায়ার। ১৯৭৪ সালে যখন সারা ভারতবর্ষ জুড়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতা চলছে, সেই সময় লেখা হয় এই নাটক। 'নরক গুলজার' পুরাণের মোড়কে বাস্তব সমাজের সমকালীন দলিল। নাট্যকার স্বর্গের দেব চরিত্রগুলোর মধ্যে সমকালের মানুষের কথা ও আচরণ আরোপ করেছেন।

সে সময়ে ইন্দিরা গান্ধী এমার্জেন্সি জারি করে দেশটাকে নরকে পরিণত করেন, সেই নরক গুলজার করেন কিছু ভণ্ড, ধূর্ত, নির্বোধ, খারাপ মানুষ। এই খারাপ মানুষগুলোর অত্যাচার, শোষণ ও সন্ত্রাসের কথা নাট্যকার  তুলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি সফলও। তাই তো তাঁর 'নরক গুলজার' সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক। হাসির, মজার মধ্যে শেল ছুড়েছেন অব্যর্থ নিশানায়।

রসিক মানুষ মনোজ মিত্র। 'কেনারাম বেচারাম', 'মুন্নি ও সাত চৌকিদার', 'রঙের হাট'—এসব তাঁর হাসির নাটক। কিন্তু তিনটি নাটকেই আছে হাসির আড়ালে কষ্ট, বেদনার সুর।

মনোজ মিত্রর নাটক এককথায় আগে সাহিত্য, পরে নাটক। তার সংলাপ সৃজন চমৎকার। সংলাপে যেমন নাট্যগুণ, তেমনই সাহিত্যের গুণ। কাব্যময় সংলাপ লিখতে সিদ্ধহস্ত তিনি। বিশেষ করে ইতিহাস ও পুরাণ আশ্রিত নাটকগুলির সমকালীনতা ধরার জন্য যেভাবে কাব্যময় সংলাপ ব্যবহার করেছেন, তা মনোজ মিত্রর পক্ষেই সম্ভব।

তাঁর নাটকের গঠন বিন্যাসেও ছিল মনোজ মিত্রীয় ছাপ। নাটকের শরীর গঠনে তিনি প্রচলিত আদর্শের পরিবর্তে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, পুরাতন ও নবীন নাট্যরীতির সংশ্লেষ ঘটিয়ে একেবারে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছিলেন। যেমন স্বতন্ত্র তাঁর জটা, শ্যামা, বাঞ্ছারাম, অলকানন্দারা—যাঁরা বাঁচতে শেখায়,  বাঁচিয়ে রাখতে জানে। প্রতিবাদে মশাল জ্বালে, প্রয়োজনে বুকে আগলে রাখে। 

তাই তো মঞ্চে বা পর্দায় চরিত্রের প্রয়োজনে নুইয়ে যাওয়া বাঞ্ছারাম, আদতে শিখিয়েছেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে। ভালবাসতে। মনোজ মিত্র, আপনার শিরদাঁড়া আমৃত্যু সোজা। স্যালুট স্যার।

(লেখক মনোজ মিত্রের নাটক নিয়ে গবেষণা করেছেন)


```