Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেইWeather: পয়লা বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআইWest Bengal Election 2026 | হার-জিত ভাবিনা, তামান্না তো ফিরবেনা!

আমাদের সেনাকর্তারা কি 'আসিম মুনির' হতে চাইছেন? ভুলে যাচ্ছেন, দেশটা ভারত, পাকিস্তান নয়

কথায় আছে, যুদ্ধে ফুলস্টপ বলে কিছু নেই। কথার লড়াই চলতেই থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই গোলা-বারুদের চেয়ে বাকযুদ্ধ বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

আমাদের সেনাকর্তারা কি 'আসিম মুনির' হতে চাইছেন? ভুলে যাচ্ছেন, দেশটা ভারত, পাকিস্তান নয়

ভারতীয় সেনাবাহিনী।

নিশান্ত চৌধুরী

শেষ আপডেট: 5 October 2025 13:12

অমল সরকার

‘সীমান্তে কোনওরকম দুঃসাহস দেখালে প্রতিক্রিয়া হবে মারাত্মক। পাকিস্তানের ইতিহাস ও ভূগোল দুই-ই বদলে যেতে পারে।’

‘অপারেশন সিঁদুরের প্রথম পর্বে ভারত সংযম দেখিয়েছে। এরপর আর সংযম দেখাব না। পাকিস্তানকে মানচিত্র থেকে মুছে দেব।’

‘অপারেশন সিঁদুরে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের অন্তত পাঁচটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে। পাকিস্তানের দাবি করে তারা নাকি ১৫টি ভারতীয় বিমান ধ্বংস করেছে। এ সব মনগড়া কাহিনি।’

শুনে মনে হবে কথাগুলি একজনের। না। একই দিনে তিনজন ভিন্ন ভিন্ন স্থানে মন্তব্য করেছেন। প্রথম উক্তিটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহের। দ্বিতীয় মন্তব্যটি সেনাপ্রধান প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর। পাকিস্তানের বিমান ধ্বংস নিয়ে মন্তব্যটি বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল অমরপ্রীত সিংয়ের। দশেরা উপলক্ষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ গিয়েছিলেন গুজরাতের ভুজে। সেখানেই স্যর ক্রিকে সামরিক পরিকাঠামো তৈরির চেষ্টা নিয়ে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করেছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। স্যর ক্রিক হল, সিন্ধু নদের একটি বদ্বীপ যা ভারতের গুজরাতকে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের থেকে পৃথক করেছে। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বিরোধের একটি স্থান হল স্যর ক্রিক।

কথায় আছে, যুদ্ধে ফুলস্টপ বলে কিছু নেই। কথার লড়াই চলতেই থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই গোলা-বারুদের চেয়ে বাকযুদ্ধ বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান-চিন, যে তিনটি দেশ সীমান্ত বিরোধ নিয়ে নিত্য লড়াইয়ে ব্যস্ত। যদিও সমর বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তারা মনে করেন, একটা যুদ্ধের পর পরবর্তী সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দিতে হয়। তাঁদের দৃষ্টিতে যুদ্ধে বিরতি আছে, সমাপ্তি নেই। ভারতের সেনাধ্যক্ষ, যিনি কিনা তিন বাহিনীর শীর্ষ সামরিক কর্তা, অপারেশন সিঁদুরের ফলাফল নিয়ে প্রথম জনসমক্ষে মুখ খুলে তিনি কার্যত এই কথাটিই বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘যুদ্ধে দু’পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়। অপারেশন সিঁদুর থেকে ভারতের সামরিক বাহিনীর অনেক কিছু শিক্ষা নেওয়ার আছে।’ তিনি অকপটে স্বীকার করেন, অপারেশন সিঁদুরে গোড়ায় বেশ কিছু ভুল হয়েছিল যা দ্রুত শুধরে নেওয়া হয়।

তাঁর কথা শুনে মনে হয়েছিল, সেনাবাহিনী সুনীল গাভাসকারের মতো করে ভাবে। অর্থাৎ জয়-পরাজয়, সাফল্য-ব্যর্থতাকে পাশে ঠেলে ভুল, দুর্বলতাগুলি চিহ্নিত করে সেগুলি শোধরানোর উপায় বের করাই হয় বাহিনীর লক্ষ্য। গাভাসকার যেমন ডবল সেঞ্চুরি করে আউট হলেও গ্রিন রুমে ফিরে শ্যাডো করে বোঝার চেষ্টা করতেন কীভাবে বলটা খেলা উচিত ছিল। কেন আউট হলেন।

কিন্তু অপারেশন সিঁদুর নিয়ে পদাতিক ও বায়ুসেনা প্রধানের লাগাতার মন্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, তাঁরা অর্থহীন বাকযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, যা এতকাল আমরা পাকিস্তানি সেনা-সংস্কৃতি হিসাবেই জেনে এসেছি। আসিম মুনির পাকিস্তানের সেনাপ্রধান নাকি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, নাকি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তা মাঝেমধ্যে গুলিয়ে যায়। পাক প্রধানমন্ত্রী যেভাবে তাঁর সেনাপ্রধানকে সঙ্গে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তা এককথায় অভাবনীয়। দু’জন রাষ্ট্রপ্রধানের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে কী করে সেনাপ্রধান হাজির থাকতে পারেন তা অনেকের কাছেই বোধগম্য হয়নি।

কথাটা ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কেও বলতে হয়। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আশায় তিনি ভুলেই গিয়েছেন ভিন দেশের সেনাপ্রধানকে ঘনঘন হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ, তাঁর সঙ্গে ভোজে অংশ নেওয়াটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিরোধী।  

সেনাপ্রধান মুনিরের কথায় পাকিস্তান সরকার নোবেল কমিটির কাছে ট্রাম্পের নাম শান্তি পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করেছে। ভারত-পাক যুদ্ধ বিরতির পুরো কৃতিত্ব মুনির ট্রাম্পকে দিয়েছেন। আর সেই সংঘাত নিয়ে আমরা যত অনাবশ্যক বড়াই করছি ততই অন্যায্য কৃতিত্বের ওজন বাড়ছে ট্রাম্পের। সেনাপ্রধানের ক্ষমতা নিয়ে পাকিস্তানে রসিকতা করে লোকে বলতে শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বা সাক্ষাৎ করতে চাইলে তিনি আসিম মুনিরকে অনুরোধ করেন। 

মুনিরের এই ভাবমূর্তি গড়ে ওঠার পিছনে ভারতের সরকারি মহলের অবদানও কম নয়। অপারেশন সিঁদুরের সময় সরকারি মহল থেকে বলার চেষ্টা হয় যত নষ্টের গোড়া মুনির। তিনিই আসল কালপ্রিট। আসলে তিনি পাক বাহিনীর সৃষ্টি যারা ধর্মীয় জেহাদকে পুঁজি করে বেড়ে উঠেছে। ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তারা ইসলাম রক্ষার কর্তব্য হিসাবে দেখে।

পাকিস্তানি সেনার এই মানসিকতা অর্থাৎ বকলমে দেশ শাসনের অপসংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের প্রতিরক্ষার সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ আধিকারিকেরা অবগত এবং সযত্নে তা এড়িয়ে চলতেন। ২৭ বছর আগের এক অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৯৮-এ পোখরান-টু বিস্ফোরণের দিন-পনেরো আগে দেশের বহু সাংবাদিকের সঙ্গে আমারও বম্বের অদুরে ট্রম্বেতে ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে সপ্তাহখানেক থাকার সুযোগ হয়েছিল। আমাদের দেখানো হয়েছিল, কীভাবে ভারত কৃষি-বিদ্যুৎ-চিকিৎসা-সহ নানা ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তি কাজে লাগাচ্ছে। 

একদিন ছিল পরমাণ বিজ্ঞানী ডি চিদম্বরম ও অনিল কাকোদকরের ভাষণ। তাঁরা বলেছিলেন, কীভাবে আনুবিক শক্তি মানব জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। আমরা সাংবাদিকেরা জানতে আগ্রহী ছিলাম, পরমাণু বোমায় ভারত কি পাকিস্তানের থেকে এগিয়ে, নাকি সমান সমান। চিদম্বরম প্রথমে খানিক মজা করে বলেছিলেন, ‘আমরা নিরামিষাশী। অনুগ্রহ করে আমিষ খাবারের বিষয়ে আমাদের প্রশ্ন করবেন না।’ তারপর বলেছিলেন, ‘আপনারা মনে রাখবেন, আমাদের দেশটার নাম ভারত। পাকিস্তান নয়। ওদেশে বিজ্ঞানীরাও বোমা নিয়ে কথা বলে। আমরা বলি না।’

দিন পনেরো পরে দ্বিতীয় পোখরান বিস্ফোরণের কারিগর হিসাবে এপিজে আবদুল কালামের (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) সঙ্গে চিদম্বরম, কোকাদকরের নামও সরকারিভাবে জানানো হয়েছিল। তাঁরা কিন্তু বিস্ফোরণের পরও কখনও প্রকাশ্যে এ নিয়ে মুখ খোলেননি। পাকিস্তানকে কথায় কথায় হুমকি দেননি। কারণ, তাঁরা মনে রাখতেন, সেটা দেশের পরিচালকদের কাজ। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীও সেনা কর্তাদের প্রকাশ্যে মুখ খোলা পছন্দ করতেন না।

ফিরে যাই আমাদের বাহিনী প্রধানদের প্রসঙ্গে। ৭ মে গভীর রাত থেকে ১০ মে বিকাল—সাকুল্যে সাড়ে তিন দিনের সংঘাতের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে এতকথা বলার সত্যিই কোনও প্রয়োজন আছে কিনা, এই প্রশ্ন আমি বহুজনের মুখে শুনেছি। বিশেষ করে যেখানে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে নথিপত্র সম্বলিত প্রমাণ দাখিলের তেমন সুযোগ নেই। তার উপর বিমান বাহিনীর প্রধানের লাগাতার বৈমানিকদের সাফল্য দাবি থেকে মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধটা শুধু তাঁর বাহিনীই করেছে। আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান যখন এক সুরে হুঁশিয়ারি দেন তখন আশঙ্কা জাগে আমাদের বাহিনীর মধ্যেও কোনও মুনির তৈরি হচ্ছে না তো। আমাদের বাহিনীও পাক সেনার মতো যুদ্ধ করার চেয়ে যুদ্ধ উন্মাদনা তৈরি করে বকলমে দেশ শাসনের পথে পা বাড়াবে না তো?

পাকি বাহিনীর মতো সক্রিয় অংশগ্রহণ না হলেও ভারতেও কোনও কোনও সেনাকর্তার বিরুদ্ধে রাজনীতিতে জড়ানো এবং নানা কথা বলে সরকার তথা শাসক দলের হাত শক্ত করার অভিযোগ নানা সময়ে উঠেছে। বিহার বিধানসভার ভোটের বড়জোর মাস খানেক বাকি। বিহারে নিকট অতীতের ভোটগুলিতে দেখা গেছে, বিজেপি প্রচারে জোরালোভাবে পাকিস্তানকে টেনে আনে। একটি ভোটের আগে অমিত শাহ মন্তব্য করেছিলেন, ‘বিহারে বিজেপি হেরে গেলে পাকিস্তানে বাজি ফাটবে।’ 

প্রধানমন্ত্রী-সহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব অপারেশন সিঁদুরের সাফল্য দাবির পাশাপাশি এ নিয়ে বিরোধীদের নিশানা করছেন। আমরা সাধারণ দেশবাসী কিন্তু মনে করি, রাজনীতিকেরা তাদের কথা বলুক। সেনাকর্তাদের বিরুদ্ধে যেন এমন অভিযোগ না ওঠে যে তাঁরা শাসক দলের বক্তব্যকেই মান্যতা দিচ্ছেন। তাঁরা বরং, ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধিতেই বেশি সময় দিন। অগ্নিবীরদের সুবিধাদি নিয়ে ভাবুন যে তরুণ-তরুণীরা বাহিনীতে যোগদানের দু-বছরের মাথায় একটা যুদ্ধে অংশ নিয়ে বীরত্ব প্রমাণ করল।

ভারতের শীর্ষ সেনা কর্তারা বেশিরভাগেরাই অবশ্য ক্যান্টনমেন্টের বাইরে কম কথা বলতেন। দুর্ভাগ্যের হল স্বাধীন ভারতের প্রথম সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল কেএম কারিয়াপ্পা ছিলেন উল্টো ঘরানার মানুষ। ক্যান্টনমেন্টের বাইরে প্রকাশ্যে বড্ড বেশি কথা বলতেন। সেটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে প্রধানমন্ত্রী নেহরু তাঁকে চিঠি লিখে সতর্ক করেছিলেন। কারিয়াপ্পা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনে নিয়েছিলেন।

কারিয়াপ্পাকে ‘মরণোত্তর ভারতরত্ন’ ঘোষণার দাবি তুলেছিলেন যিনি সেই অকাল প্রয়াত সেনাধ্যক্ষ বিপিন রাওয়াতও প্রকাশ্যে বড্ড বেশি কথা বলতেন। তিনজন সিনিয়রকে টপকে সেনাপ্রধান করায় এমনীতেই তাঁকে নিয়ে বিতর্ক ছিল। জেনারেল কারিয়াপ্পাকে সর্বোচ্চ অসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশটি ছিল সেনা শৃঙ্খলা বিরোধী কাজ। বাহিনীতে কেউ এক নম্বর পদে থাকেন বটে, কিন্তু সিদ্ধান্ত সর্বদা যৌথ অভিমতের ভিত্তিতে হতে হয়। সেনাকর্তারা প্রকাশ্যে কম কথা বললেই ভাল করবেন।


```