Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

খাউঙ্গা, খানে নহি দুঙ্গা, মোদী ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল

অধিকাংশ গাড়ির মাথায় আপের পতাকা উড়ছে। অধিকাংশ যাত্রী তরুণ-যুবক। আমাকে যে করে হোক কেজরিওয়ালের সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির হতে হবে। মনে মনে প্রশ্ন তৈরি রেখেছি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনার জেহাদের মেয়াদ কতদিনের? 

খাউঙ্গা, খানে নহি দুঙ্গা, মোদী ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল

শেষ আপডেট: 24 March 2024 15:12

অমল সরকার

১২ বছর আগে সেই দিনটির কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। রবিবার। রাজধানীর রাস্তাঘাট তুলনায় ফাঁকা। বিমানবন্দর থেকে কিছুটা পথ ভালই এগোল গাড়ি। মধ্য দিল্লির আইটিও মার্গের কয়েক কিলোমিটার আগে সপ্তাহের বাকি দিনগুলির থেকেও খারাপ অবস্থা। গাড়ি কিছুতেই এগোয় না। টের পেলাম আশপাশের বেশিরভাগ গাড়ির গন্তব্যও আম আদমি পার্টির সদর দফতর। 

অধিকাংশ গাড়ির মাথায় আপের পতাকা উড়ছে। অধিকাংশ যাত্রী তরুণ-যুবক। আমাকে যে করে হোক কেজরিওয়ালের সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির হতে হবে। মনে মনে প্রশ্ন তৈরি রেখেছি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনার জেহাদের মেয়াদ কতদিনের? 

প্রশ্নটা করা হয়নি। কারণ, ভিড়, যানজট পেরিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে পৌঁছেছিলাম খানিক পর। ছুটলাম কেজরিওয়ালের সরকারি আবাসনে। সেখানে  ততক্ষণে তীর্থ ক্ষেত্রে পুজো দেওয়ার হুড়োহুড়ির অবস্থা। সেই ভিড়েও চেনা ছবি, কালো মাথার ভিড়। গড় বয়সসীমা বিশ থেকে তিরিশ। অনেকে অনাবাসী ভারতীয়। কেজরিওয়ালের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে সাড়া দিয়ে দেশে এসেছেন আপের হয়ে ‘করসেবা’ করতে। তাঁদেরই কয়েকজনের কথার সূত্র ধরে আমার পাঠানো একটি খবরের শিরোনাম ছিল, ‘কেজরিওয়াল এ যুগের গান্ধী, বলছে…।’

অতীতে একাধিক লেখায় বলেছি, তাই এখনও জোর দিয়ে বলতে পারি, কেজরিওয়াল ও তাঁর দলের এমন পরিণতি আমার জানাই ছিল। লোকটিকে কোনওদিনই আমার সুবিধার মনে হয়নি। চটকদার, ফাটকাবাজ যাঁকে বলে তাই। 

আসলে রাজনীতিতে এই ধরনের মানুষেরই কদর বেশি। যাঁরা যে কোনও মিথ্যাকে সত্যের প্রলেপ দিয়ে মানুষকে বিশ্বাস করাতে পারেন। সেই কারণেই আন্না হাজারেকে সামনে রেখে বিজেপির গুরুঠাকুর আরএসএস কংগ্রেসকে নিকেশ করতে অরবন্দি কেজরিওয়ালকে বেছে নিয়েছিল। 

কেজরিওয়ালের সরকারের ১২ বছরের কাজকর্ম থেকে কারও বুঝতে বাকি নেই, বিজেপির সঙ্গে আপের কর্মসূচির তেমন একটা ফারাক নেই। দিল্লির দাঙ্গায় একটি দল দল উসকানি দিয়েছে, আর একটি নীরব থেকেছে। বিজেপি শাসিত সরকারগুলির মতো আপ সরকারেরও নিখরচায় রাম মন্দির দর্শন করানো একটি অন্যতম কর্মসূচি। সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার-আনাচারের ঘটনায় কেজরিওয়ালের গলার জোর কম। 

এই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার কারণ, কেজরিওয়াল বনাম বিজেপির ধারাবাহিক বিবাদ। যে উদ্দেশে আরএসএস তথা বিজেপি পিছন থেকে কলকাঠি নেড়ে আপকে তৈরি করেছিল, তাদের সেই উদ্দেশ্য অনেক আগেই সফল। অর্থাৎ রাজধানীকে সবচেয়ে আগে কংগ্রেস মুক্ত করা। আপ বরং ক্রমে বিজেপির কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তারা একমাত্র আঞ্চলিক দল যারা একটির বেশি রাজ্যে (দিল্লি ও পাঞ্জাব) ক্ষমতায় আছে। 

সেই কেজরিওয়াল এখন দুর্নীতির মামলায় জেলে। মদ কেলেঙ্কারির বিষয়টি সকলের জানা। আবগারি দুর্নীতির সঙ্গে ৩৬-৩৭ বছর আগে দেশ কাঁপানো বোফর্স কেলেঙ্কারির একদিকে মিল আছে। বোফর্সে দুর্নীতির অঙ্কটি ছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। দিল্লির আবগারি নীতি কেলেঙ্কারিতেও ঘুষের পরিমাণ এখনও পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে দেড়-দুশো কোটি টাকা। ভারতে বিগত তিন দশকে যে সব দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দেশ তোলপাড় হয়েছে তার তুলনায় হাতের ময়লা বলা চলে। তারপরও নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কেজরিওয়াল ও তাঁর দলকে টার্গেট করার আসল কারণ, কেজরিওয়ালকে রাজনৈতিকভাবে কোতল করতে পারলে দুর্নীতির প্রশ্নে বাকি বিরোধীদের অন্যায় ভাবে ফাঁসানোটা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সহজ হবে। কারণ আপ সুপ্রিমো দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের মুখ হয়ে রাজনীতিতে এসেছেন। সেই কেজরিওয়ালকে এখন জেলের ভাত খেতে হচ্ছে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে। দেশে এই প্রথম একজন কর্মরত মুখ্যমন্ত্রী জেল বন্দি। 

এখন জানা যাচ্ছে, কেজরিওয়ালকে মদকাণ্ডে ঘুষ দিয়েছেন বলে যে ব্যবসায়ী জেল খেটে এখন জামিনে মুক্ত, বিজেপিকে তিনিও ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে পাঁচশো কোটি টাকা দিয়েছেন। আপের অভিযোগ, ওই ব্যবসায়ী, কেজরিওয়ালকে ঘুষ দিয়েছেন বলে বয়ান দেওয়ার পরই জামিন পান।

হরিয়ানায় যে জমি কেলেঙ্কারিতে প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর স্বামীর নাম জড়ায় এবং পরে বিজেপি সরকার তাঁকে ক্লিনচিট দেয়, জানা যাচ্ছে, সেই কোম্পানিও বিজেপিকে ১৭০ কোটি টাকার ইলেক্টোরাল বন্ড দিয়েছে। এরপরই হরিয়ানার বিজেপি সরকার জমি কেলেঙ্কারি নিয়ে আদালতে জানায়, কোনও অনিয়ম সামনে আসেনি। 

দিল্লিতে দুর্নীতি বিরোধী জমায়েতে কেজরিওয়াল ও আন্না হাজারে

নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ইলেক্টোরাল বন্ড বাবদ জমা পড়া মোট ১৬ হাজার ৫১৮ কোটি টাকার মধ্যে ৫০ শতাংশের সামান্য কম, ৮২৫১ কোটি টাকা বিজেপি পেয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে আছে কংগ্রেস। শতাব্দী প্রাচীন দলটি পেয়েছে ১৯৫২ কোটি টাকা। নরেন্দ্র মোদীর পার্টির তুলনায় কিছুই না। ১৭০৫ কোটি টাকা পেয়ে তৃতীয় স্থানে আছে তৃণমূল কংগ্রেস। 

সপ্তাহখানেক আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছিলেন, ‘ইলেক্টোরাল বন্ডের কুড়ি হাজার কোটি টাকার মধ্যে বিজেপি পেয়েছে মাত্র ৬ হাজার কোটি। বাকি ১৪ হাজার কোটি গেল কোথায়।’ কিঞ্চিৎ হুঁশিয়ারির সুরে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হলে অনেক দলের মুখ পুড়বে।’ এখন দেখা যাচ্ছে, বিজেপিরই হা বড়। তারাই পেয়েছে বেশি, খেয়েছেও বেশি। শাহ প্রশ্ন তুলেছেন, বিজেপির ৩০৩ সাংসদ। সেই তুলনায় বিজেপির প্রাপ্য কি খুব বেশি? ঘটনা হল, বিজেপির সেই ৩০৩ সাংসদ দেশের ৩৩ শতাংশ ভোটারকে প্রতিনিধিত্ব করেন। 

বন্ড নিয়ে এ পর্যন্ত সামনে আসা তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, একাধিক কোম্পানি লোকসান করা সত্ত্বেও ইলেক্টোরাল বন্ড বাবদ মোটা টাকা দান করেছে। সেই তালিকায় আছে কলকাতারও একটি কোম্পানি। কোম্পানির আরও ক্ষতি করে তারা কেন রাজনৈতিক দলকে অর্থ দানে উদারহস্ত হল তার তদন্ত হওয়া জরুরি। কারণ, এই লোকসানের বোঝা শেষ পর্যন্ত কোম্পানির কর্মচারীদের ঘাড়ে চাপবে, বেতন ছাঁটাই, কর্মচ্যুতির মাধ্যমে। 

নরেন্দ্র মোদীর সরকার বলেছিল, ভোটে কালো টাকা ব্যবহার আটকাতেই ইলেক্টোরাল বন্ড চালু করা হল। আজ তদন্ত হওয়া দরকার, বন্ড বাবদ জমা করা টাকা কতটা সাদা কতটা কালো। অভিযোগ উঠেছে, বহু কোম্পানি ইডি-সিবিআই হানার আগে-পরে ইলেক্টোরাল বন্ড কিনে বিজেপিকে দিয়েছে। রাজ্য সরকারের এই জাতীয় এজেন্সির পক্ষেও ভয়ভীতি দেখিয়ে বন্ডদান করতে বাধ্য করা অসম্ভব নয়। অভিযোগ উঠেছে, বন্ডদানের বিনিময়ে সরকারি কাজের মোটা টাকা বরাত পেয়েছে বহু কোম্পানি। 

নরেন্দ্র মোদী স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার ভাষণে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার ডাক দিয়েছেন। ইডি, সিবিআইকে দিয়ে মোদী একটি ধারণা নির্মাণ করেছেন, ভারতে বিজেপি বাদে সব দল চোর। বিজেপিই শুধু ওয়াশিং মেশিন, সুপার সফেদ ডিটারজেন্ট পাউডার। আর বিরোধী নেতা-নেত্রীরা দুর্নীতিগ্রস্থ। 

বাম জমানায় একটা কথা বলা হত, ‘যে কমরেডরা কিনা একটা বিড়ি পাঁচজনে ভাগ করে ফুঁকত তারা এখন ফাইভ ফিফটি ফাইভ খায়।’ অথচ, এখন বিধানসভায় গেলে মনে হয় দেশি-বিদেশি গাড়ির প্রদর্শনী চলছে। যদিও বিধানসভায় এখন বাম-কংগ্রেসের একজনও বিধায়ক নেই। 

দুয়ে দুয়ে চার কী আর সাধে বলে! একদিকে, সন্দেশখালি দেখিয়ে দিল, ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’র অর্থ কেমন আমূল বদলে গিয়েছে। তেমনই ইলেক্টোরাল বন্ড চোখ খুলে দিল নরেন্দ্র মোদীর সরকার দুর্নীতি দমনের নামে কীভাবে এই অনাচারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। 

জাতীয় পতাকা হাতে কেজরিওয়ালের ডাকে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে নেমেছিল তরুণ সমাজ

মোদী বলেছিলেন, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।’ দেশবাসী হাততালি দিয়েছিল। ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ নেই। কিন্তু তাঁর দল? ইডি-সিবিআইকে দিয়ে তিনি বিরোধীদের অনেকটাই অর্থ শূন্য করে দিতে পেরেছেন। কিন্তু দলের খাওয়ার ব্যবস্থাও তাঁর সরকারই করেছে।  

কেজরিওয়ালকেও দেখুন। লোকটা দিনের পর দিন আন্না হাজারেকে সামনে রেখে দিল্লিতে বসে লোক ক্ষেপিয়েছেন। দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করার কথা বলেছেন। আর আজ তিনিই দুর্নীতির অভিযোগে জেল বন্দি। তিনি নির্দোষ কী অপরাধী সেটা আদালত বলবে। কিন্তু দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী নয় নয় করে নয়বার ইডির তলব এড়ালেন কেন? কেন তাঁকে, তাঁর দলকে এই শঙ্কা গ্রাস করল, ইডি দফতরে গেলেই তাঁকে গ্রেফতার করা হবে? 

১২ বছর আগে কেজরিওয়ালের কথাগুলি মনে পড়ছে। হুবহু এক না হলেও তিনিও আসলে বলেছিলেন, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।’ ফারাক, একজন শুধু নিজের দলের খাওয়া নিশ্চিত করেছেন।ইলেক্টোরাল বন্ড নিয়ে তদন্ত হলে আরও অনেক নেতা, মুখ্যমন্ত্রীর কেজরিওয়ালের দশা হওয়া অসম্ভব নয়। যদিও মোদী বা কেজরিওয়াল, কাউকেই দুর্নীতিগ্রস্থ বলছি না। কিন্তু দলের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, এই অভিযোগ কি উড়িয়ে দেওয়ার? 

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ইলেক্টোরাল বন্ড বাতিল হয়ে গিয়েছে। আজকাল সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি এতটাই সরকারের লেজুরে পরিণত হয়েছে যে এই জাতীয় রায়ের পর অনেকেই বলে থাকেন আদালতই শেষ ভরসা। সর্বোচ্চ আদালতের উচিত ভারতের কর্পোরেট দুনিয়ার ইলেক্টোরাল বন্ডের উপুরহস্ত হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে কোর্টের নজরদারিতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া। তাহলেই বোঝা যাবে, রাজনৈতিক দলগুলিতে কেন এত টাকা দিতে গেল কোম্পানিগুলি এবং কেন বিজেপিকেই সকলের প্রথম পছন্দ। নিছক শাসক দল বলে, নাকি সুবিধার বিনিময়ে।


```