
শেষ আপডেট: 27 October 2022 13:10
দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: তখন চলছিল ১৮৯৩ সাল। সিমলা থেকে ৪৪ কিলোমিটার দূরে, চেল এলাকায় ছিল পাতিয়ালার মহারাজা ভুপিন্দর সিংয়ের প্রাসাদ। মহারাজা গ্রীষ্মকাল কাটাতেন চেলেই। ক্রিকেটের একনিষ্ঠ অনুরাগী ভুপিন্দর সিং বহু অর্থ ব্যয় করে, ৮০১০ ফুট উচ্চতায় একটি অসামান্য সুন্দর ক্রিকেট মাঠ তৈরি করেছিলেন।
গ্রীষ্মকালে ব্যাট নিয়ে মাঠে নামতেন মহারাজ। সাক্ষী থাকত দুধসাদা হিমালয় ও ঘন সবুজ অরণ্য। মহারাজের ইচ্ছে ছিল হিমালয়ের কোলে গড়ে উঠুক সৌন্দর্য ও উচ্চতার দিক থেকে বিশ্বের সেরা ক্রিকেট স্টেডিয়াম (cricket stadium)। কিন্তু মহারাজ ভুপিন্দর সিংয়ের সে স্বপ্ন সত্যি হয়নি। চেলের ক্রিকেট মাঠ এখন চেল মিলিটারি স্কুলের খেলার মাঠ।

তবে মহারাজের স্বপ্ন আংশিক ভাবে সফল হয়েছিল ২০০৩ সালে। তুষারাচ্ছাদিত হিমালয়কে পটভূমিকায় রেখে, হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় গড়ে উঠেছিল বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ক্রিকেট স্টেডিয়াম (cricket stadium)। কাঙড়া উপত্যকার ৪৩২০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ও ২৩ হাজার আসন বিশিষ্ট স্টেডিয়ামটিতে ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ।
এতদিন এই ধর্মশালার স্টেডিয়ামটি ছিল উচ্চতা ও সৌন্দর্যের দিক থেকে বিশ্বসেরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। কিন্তু সম্প্রতি সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান। ধর্মশালার স্টেডিয়ামের থেকে দ্বিগুণ উচ্চতায়, কারাকোরামের কোলে পাকিস্তান বানাতে চলেছে বিশ্বের সুন্দরতম ও উচ্চতম ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

পাকিস্তানের উত্তরে আছে গিলগিট-বাল্টিস্তান প্রদেশ। অসামান্য সৌন্দর্য ঠাসা প্রদেশটির বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে সুউচ্চ কারাকোরাম ও পশ্চিম হিমালয়। রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ গডউইন অস্টিন বা কেটু (২৮২৫২ ফুট) , নাঙ্গা পর্বত (২৬৬৬০ ফুট), গাসেরব্রুম, মাসেরব্রুম, দিস্তাঘিল, রাকাপোশি সহ অজস্র নামী অনামী শৃঙ্গের দল।
গিলগিট থেকে ১০০ কিমি উত্তরে আছে, পৃথিবীর ২৭ তম উচ্চ পর্বত শৃঙ্গ রাকাপোশি (২৫৫৫১ ফুট)। কারাকোরাম পর্বতশ্রেণীতে অবস্থিত মাউন্ট রাকাপোশির পাদদেশে আছে নাগর নামের এক ছোট্ট শহর। এরই উত্তরে আছে পিসান নামে একটি জনপদ। ২০২১ সালে সেই পিসানে পৌঁছে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের এক সাংবাদিক। সাক্ষী হয়েছিলেন এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫০০ ফুট উচ্চতায় সম্পুর্ণ প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয়েছে একটি বৃত্তাকার মাঠ। সবুজ ঘাসের গালচে পাতা মাঠটিতে ক্রিকেট খেলছে বুরুশাস্কি ও শিনা ভাষায় কথা বলা স্থানীয় আদিবাসী শিশুরা। পুরো মাঠটিই তিনদিকে উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা। উত্তর দিক থেকে মাঠের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে মাউন্ট রাকাপোশি। মাঠটির ঘাসের গালচে উঠে গিয়েছে রাকাপোশির পাদদেশ পর্যন্ত।হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সাংবাদিক। কারণ এরকম ভয়ঙ্কর পরিবেশে এত সুন্দর ক্রিকেট মাঠ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
ধাতস্থ হওয়ার পর মাঠটির ছবি তুলে পোস্ট করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে গিয়েছিল ছবিটি। বরফের মুকুট পরা পর্বত শৃঙ্গের ঠিক নীচে থাকা ক্রিকেট মাঠের ছবি চমকে দিয়েছিল গোটা পৃথিবীকে। ছবিটি নিজেদের টুইটার হ্যান্ডেলে শেয়ার করেছিলেন পাকিস্তানের ক্রিকেট তারকা শোয়েব আখতার ও উমর গুল। বাকিটা ইতিহাস।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গিলিগিট-বাল্টিস্থানের মুখ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ খালিদ খুরশিদ টুইটারে ঘোষণা করেছিলেন, পিসানের এই মাঠে গড়ে তোলা হবে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম (cricket stadium)। সারা পাকিস্তান যখন গ্রীষ্মের দাবদাহে পুড়তে থাকবে, তখন এই মাঠে, ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবেন বাবর আজমেরা।
এরপর স্টেডিয়াম গড়ার কাজে এগিয়ে এসেছিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। পিসান বাজার থেকে উপত্যকার প্রান্তে থাকা ক্রিকেট মাঠ পর্যন্ত বানানো হয়েছিল ঝাঁ চকচকে রাস্তা। নিয়ে আসা হয়েছিল বিশ্বের সেরা পিচ বিশেষজ্ঞদের। দ্রুত বানানো হয়েছিল পিচ ও অনান্য পরিকাঠামো। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা মাঠটির কোনও ক্ষতি না করেই।

পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বলেছিল, পৃথিবীর কোনও ক্রিকেট স্টেডিয়াম পরিবেশ ও সৌন্দর্যে আমাদের আর হারাতে পারবে না। আগামী দশ বছরের মধ্যেই আইসিসি টুর্নামেন্ট হবে এই মাঠে। এই স্টেডিয়াম গড়ে দেবে এলাকার মানুষদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত। আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম গড়ে উঠলে তৈরি হবে হোটেল ও অনান্য আনুষঙ্গিক পরিকাঠামো। ঢল নামবে পর্যটকদের। কারণ এলাকার অরণ্যে আছে দুস্প্রাপ্য মার্কোপোলো ভেড়া, তুষার চিতা, বাদামি ভাল্লুক ও নেকড়ে।
পিসান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ২০২২ সালের ৯ অক্টোবর। স্থানীয় বিধায়ক ফতেউল্লা খানের উপস্থিতিতে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছিল দিয়ামির ও নাগর ক্রিকেট টিম। ম্যাচটি দেখতে হাজির হয়ে ছিলেন রাকাপোশি শৃঙ্গ আরোহণ করতে আসা বেশ কিছু পর্বতারোহী।

রাকাপোশি শৃঙ্গের পাদদেশে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখে তাঁরা উচ্ছ্বসিত হয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলছিলেন," বিশ্ব পেতে চলেছে এক অবিশ্বাস্য ক্রিকেট স্টেডিয়াম। কিন্তু যিনি থার্ডম্যান বা ফাইন লেগে ফিল্ডিং করবেন, পুরো মাত্রায় তাঁর ক্যাচ মিস করার সম্ভাবনা আছে। কারণ লং অন ও লং অফের দিক থেকে, ফিল্ডারটির দিকে হিরের দ্যুতি নিয়ে তাকিয়ে থাকবে মাউন্ট রাকাপোশি। খেলার দিকে আদৌ মন দিতে পারবেন কি সেই ফিল্ডার!"
এ পর্যন্ত পড়ার পর মন খারাপ হতে বাধ্য ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের। কারণ ভারতের ধর্মশালার স্টেডিয়ামকে সৌন্দর্য ও উচ্চতার দিক থেকে টেক্কা মেরে বেরিয়ে গিয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ। কিন্তু একদমই মন খারাপ করবেন না। ২০১৩ সালেই ভারত ফেলে দিয়েছিল তুরুপের তাস।

আমরা অনেকেই জানি না, হিমাচল প্রদেশের লাহুল উপত্যকার নয়নাভিরাম জনপদ সিসুতে ভারত বানাতে চলেছে পৃথিবীর উচ্চতম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। প্রায় ১০০০০ ফুট উচ্চতায় গড়ে উঠবে ভারতের এই স্টেডিয়াম। উচ্চতার দিক থেকে পিছিয়ে পড়বে পাকিস্তানের পিসানের স্টেডিয়াম। তবে শুধু উচ্চতাতেই নয়, নৈসর্গিক শোভাতেও পাকিস্তানের স্টেডিয়ামটির সঙ্গে জোর টক্কর দেবে ভারতের এই স্টেডিয়াম।

লাহুল-স্পিতি ক্রিকেট অ্যাসোশিয়েসনকে ইতিমধ্যেই জমি হস্তান্তর করে দিয়েছে বনবিভাগ। স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পান্না সবুজ চন্দ্রা নদী। ব্যাকড্রপে তুষারাচ্ছাদিত পিরপঞ্জাল পর্বতশ্রেণীর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ দেখবেন প্রায় ১০০০০ দর্শক।
বছরের মে মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, ১৫-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ক্রিকেট ম্যাচ। বছরের অন্য সময় স্টেডিয়ামটি গায়ে জড়িয়ে নেবে বরফের চাদর। যে এলাকায় গড়ে উঠছে পৃথিবীর উচ্চতম ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি, সেটি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল। তাই বৃষ্টির জন্য ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার ন্যূনতম আশঙ্কাও থাকবে না। এখন নিশ্চয়ই আপনার গর্ব হচ্ছে ভারতবাসী হিসেবে। কারণ সবার অগোচরে কিস্তিমাতের চাল দিয়ে রেখেছে ভারত। পাকিস্তানের এক দশক আগেই।
আরও পড়ুন: গিলগিট-বাল্টিস্তানে বাস করে রহস্যময় হুনজা উপজাতি, প্রত্যেকেই নাকি বাঁচেন কমপক্ষে ১২০ বছর