মেয়ের জন্য সেলাই করা একটি পুতুল থেকেই শুরু, এখন ‘Tara's Doll House’ হয়ে উঠেছে ব্যাঙ্গালোরের জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড। জেনে নিন বীণা পিটারের হাত ধরে কীভাবে তৈরি হ এই টেকসই ও সাংস্কৃতিক পুতুলের দুনিয়া।

বীণা পিটার। ছবি: বেটার ইন্ডিয়া।
শেষ আপডেট: 27 May 2025 16:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৫ সালে কর্পোরেট দুনিয়ার জাঁতাকল ছেড়ে নিজের জীবনের নতুন পথ খুঁজছিলেন চেন্নাইয়ের তরুণী বীণা পিটার। সেই সময়েই জীবনের নতুন এক বাঁকে এসে দাঁড়ান তিনি, জন্ম দেন সন্তানের। স্বাভাবিকভাবেই, মা হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে অনেক পরিবর্তন আনে, জীবনের পথও খানিক বদলে যায়। তবে সেদিন বীণা নিজেও জানতেন না, সেই পথে হেঁটেই তিনি পৌঁছবেন পুতুলের এক ছোট্ট দুনিয়ায় যা বেঙ্গালুরুর বুকে দাঁড়িয়ে মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা উপার্জনের পথ খুলে দেবে তাঁকে!
হাতে বানানো সে পুতুলের দুনিয়া ‘তারা ডল হাউস’-এর শুরুটা অবশ্য একেবারেই পরিকল্পনাহীন ছিল। চেন্নাইয়ের উইমেন’স ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে ডিগ্রি অর্জনের পর ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, লুফথানসা ও ক্যারাটলেন-এর মতো বড় বড় সংস্থায় প্রায় এক দশক ধরে চাকরি করেছিলেন ভীণা। কিন্তু কর্পোরেট জীবনের যান্ত্রিকতা আর ভাল লাগছিল না তাঁক। তাই স্বামীর এডু-স্টার্টআপে সাহায্য করতে করতে তিনি অপেক্ষা করছিলেন নিজের পথ খোঁজার।
এমনই সময়ে মেয়ে তারা হওয়ার পরে, তাকে ঘুম পাড়ানোর সময় বীণার মনে হয়েছিল, একটি নরমসরম পুতুল হলে ভাল হয়। কিন্তু তিনি যেমনটা চাইছিলেন, তেমনটা পাচ্ছিলেন না বাজারে। সবই ছিল সিনথেটিক, প্লাস্টিকের ও ঠুনকো মানের। তাই পুরনো কাপড় ও উলের সাহায্যে নিজেই একটি পুতুল তৈরি করেন তিনি। ছোট্ট মেয়ে তারাও সেটা ভীষণ ভালবেসে ফেলে।
এই ছোট্ট পুতুল থেকেই বড় হতে থাকে এক নতুন স্বপ্ন। হঠাৎই একদিন, স্থানীয় একটি বাজারে এরকমই হাতে বানানো ৩০টি পুতুল নিয়ে গিয়েছিলেন বীণা। তাদের না ছিল কোনও নাম, না ছিল ঠিক করে রাখা কোনও দাম, না ছিল সেগুলি বিক্রি করার কোনও ব্যবসায়িক কৌশল। কিন্তু কোনও কিছু ছাড়াই সেদিন বীণার সব পুতুল বিক্রি হয়ে যায়। তাতেই প্রথম আত্মবিশ্বাস জাগে বীণার, যা থেকে জন্ম নেয় ‘Tara’s Doll House’।

একটি পুতুল তৈরির গল্প
মাকে জড়িয়ে ধরে, মায়ের চুলে মুখ গুঁজে ঘুমোতে যেত বীণার মেয়ে তারা। তখনই মায়ের মাথায় আসে, চুলওয়ালা, নরম ধরনের একটি পুতুল তৈরি করলে হয় না? সেই ভাবনা থেকেই নিজের হাতে সেলাই করা প্রথম পুতুল। বন্ধুবান্ধব যখন সেটা দেখে তাদের সন্তানদের জন্যও চাইতে শুরু করে, তখনই বোঝা যায়, এই চাহিদা শুধু নিজের সন্তানের নয়।
কয়েক বছর পরে, ২০২৩ সালের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠে ‘Tara’s Doll House’। ডিজাইনের কোনও পূর্বঅভিজ্ঞতা ছিল না বীণার। তাই ইউটিউব, পিন্টারেস্ট ঘেঁটেই শিখে নেন পুতুল তৈরির কৌশল। প্রতিটি পুতুল তৈরি হয় হাতে কাটাকাটি করে, হাতে সেলাই করে, তুলো ভরে, উলের চুল বসিয়ে ও মুখ এঁকে।

এক শুরু করলেও, এই কাজে তিনি একা ছিলেন না বেশিদিন। এতটাই ভাল সাড়া পাচ্ছিলেন ব্যবসায় যে, পরে তিনজন মহিলা নিয়োগ করেন কাজে। তাঁদের তিনি নিজেই ট্রেনিং দেন। কারও কোনও কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না। দরকারও ছিল না তেমন। একটা সেলাই মেশিন চালাতে পারলেই কাজ শুরু করা যেত। এখন সেই কর্মীরা স্বনির্ভর এবং বীণার পরিবারের সদস্যের মতো।
কাপড়-তুলো-উল দিয়ে এক একটি পুতুল তৈরি করতে বীণার সময় লাগে ৪৫ মিনিট। আগে এগুলোই বানাতে এক-দু’দিন লাগত। এখন সময় কমে যাওয়ার ফলে প্রতি সপ্তাহে ২০০টি পুতুল তৈরি হয়। প্রতিটি পুতুলের কাপড় হাতে কাটা হয়, সেলাই করা হয়। এর পরে কটন ও পলিয়েস্টার মেশানো তুলো ভরা হয়, যাতে পুতুলটি ধোয়ার পরেও নষ্ট না হয়ে যায়। সব শেষে তার মুখ আঁকা হয় ফ্যাব্রিক মার্কার দিয়ে, বসানো হয় উলের চুল।
তবে পুতুলের চুল, জামাকাপড়, ত্বকের রঙ কাস্টমাইজ করা যায়। শিশুরা নিজের পছন্দ মতো পোশাক পরাতে পারে পুতুলকে। এই খেলাই বাড়িয়ে দেয় তাদের কল্পনাশক্তি ও সংবেদনশীলতা।
/30-stades/media/media_files/2025/03/25/o78nMSOIMy1agwrQrZgD.jpg)
ঐতিহ্যের সঙ্গেও যোগ পুতুলের
এই পুতুলগুলো শুধু টেকসই নয়, সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অনন্য। বীণার বানানো কিছু পুতুলের সঙ্গে দু’টি করে পোশাকও থাকে। একটি আধুনিক, আরেকটি ঐতিহ্যবাহী। যেমন পাঞ্জাবি পুতুলের জন্য ঘাগরা, বাঙালি পুতুলের জন্য শাড়ি—এরকম। এইভাবে শিশুরা নিজের শিকড়ের সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারে খেলনার মধ্যেই।
বীণার বানানো ছোট পুতুলের দাম শুরু ৫০০ টাকা থেকে। এক ফুট বড় পুতুল, বাড়তি পোশাকসহ, ১০০০ টাকা দাম। আর সম্পূর্ণ পুতুলঘর সেটের দাম ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত। ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ বিজনেসের মাধ্যমেই চলে বেশিরভাগ বিক্রিবাটা। তবে বীণা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন, ফ্লি মার্কেট ও পপ-আপ ইভেন্টে ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন।
এক মায়ের মমতা, অনেক শিশুর শৈশব
বীনা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে তাঁর বানানো ১৫০–২০০টি পুতুল বিক্রি হয়, যা থেকে আয় হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। এই পুতুলগুলি যেন শুধু খেলনা নয়, শিশুদের এক সঙ্গীও হয়ে ওঠে। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসার স্পর্শ যে একটা ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে, বীণা যেন তারই দৃষ্টান্ত। তাঁর কথায়, ‘এটা তো আমার ব্যবসা হওয়ার কথাই ছিল না। আমি শুধু মেয়ের জন্য বানিয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, অনেক বাবা-মা আসলে এমনই কিছু খুঁজছিলেন।’