
শেষ আপডেট: 11 August 2022 11:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ভাইয়ের মঙ্গলকামনায় হাতে হাতে রাখি (Rakhi Purnima) পরিয়ে দেয় বোনেরা। হিন্দু ধর্মে এ উৎসবের মাহাত্ম্য অনেক, জনপ্রিয়তাও আকাশছোঁয়া। ভাই-বোনের খুনসুটি, সারা বছরের মান-অভিমান, ভালবাসা — সবটা প্রাণ পায় রাখি পূর্ণিমার (Raksha Bandhan) দিন। এই পূর্ণিমা ঘিরে নস্টালজিয়া একদিনে তৈরি হয়নি। ইতিহাস আর পুরাণের গহ্বরে লুকিয়ে আছে রক্ষাবন্ধনের আরও অনেক কাহিনি (Stories)।

রাখিবন্ধন কিন্তু শুধুমাত্র ভাই আর বোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না কোনওদিন। যে কোনও সম্পর্কেই হাতে একচিলতে সুতো বেঁধে দেওয়ার নাম রক্ষাবন্ধন। মঙ্গলকামনা করে, সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার বিশ্বাসে এই রাখি পরিয়ে দেওয়া হয়। রামায়ণ থেকে মহাভারত, রক্ষাবন্ধনের নজির ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র।
রক্ষাবন্ধন নিয়ে মহাভারতের সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনির কেন্দ্রে আছেন শ্রীকৃষ্ণ এবং দ্রৌপদী। শোনা যায়, চেদিরাজ শিশুপালের একশো অপরাধ ক্ষমা করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেলে সুদর্শন চক্র দিয়ে শিশুপালের মাথা কেটে দেন তিনি। এইসময় সুদর্শন চক্র আহ্বানে কৃষ্ণের হাতের আঙুলও যায় কেটে। ক্ষতস্থান থেকে অঝোরে রক্ত পড়তে শুরু করে। সখা মাধবের এমন অবস্থা দেখে নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে এক টুকরো কাপড় দ্রৌপদী বেঁধে দিয়েছিলেন কৃষ্ণের হাতে।

তারপরেই শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীকে সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। সে প্রতিশ্রুতি পালন করেন অক্ষরে অক্ষরে। দূতসভায় যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণে উদ্যত হয়েছিলেন দুঃশাসন, তখনও ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।
রামায়ণেও রক্ষাবন্ধনের নজির রয়েছে। মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে জন্মগ্রহণ করেন রাম-সীতার সন্তান লব এবং কুশ। জন্মের পর তাঁদের মঙ্গলকামনায় দুজনের হাতেই কুশের অগ্রভাগ এবং নিম্নভাগ বেঁধে দিয়েছিলেন ঋষি বাল্মীকি স্বয়ং। তারপর থেকে জন্মের পর সন্তানের হাতে সুতো বেঁধে দিয়ে থাকেন অনেকেই। মায়েদের বিশ্বাস, এতে সন্তান সমস্ত বিপদ থেকে সুরক্ষিত থাকবে।

পুরাণে আছে সন্তোষী মায়ের কাহিনিও। শোনা যায়, গণেশের কাছে একবার তাঁর দুই ছেলে বোনের জন্য বায়না করেছিলেন। তাঁদের বোন নেই, রাখি পূর্ণিমার দিন তাই রাখি পরিয়ে দেওয়ার মতোও কেউ নেই। অথচ গণেশকে তাঁর বোন রাখি পরিয়েছেন, তাই বাবার কাছে বোন চেয়েছিলেন গণেশপুত্ররা। এরপরই নাকি ছেলেদের মন রাখার জন্য হোমাগ্নি থেকে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন গণেশ। তিনিই মা সন্তোষী। গণেশপুত্রদের হাতে রাখি পূর্ণিমার দিন এই সন্তোষী মা রাখি পরিয়ে দেন।

দৈত্য রাজা বলি একবার নিজের রাজপ্রাসাদে এনে রেখেছিলেন ভগবান বিষ্ণুকে। বৈকুণ্ঠ ছেড়ে দিনের পর দিন বলির প্রাসাদে থাকছিলেন তিনি। কিন্তু বৈকুণ্ঠে মা লক্ষ্মী বিষ্ণুকে ছাড়া মনমরা হয়ে পড়েছিলেন। একা একা তাঁর দিন কাটছিল না। তাই মা লক্ষ্মী ছদ্মবেশে একদিন সোজা গিয়ে হাজির হন বলির প্রাসাদে। কান্নাকাটি করে দৈত্যরাজকে তিনি জানান তাঁর স্বামীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যতদিন না স্বামীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে ততদিন প্রাসাদেই লক্ষ্মীকে থাকতে বলেন বলি। এরপর শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দৈত্যরাজের হাতে রাখি বেঁধে দেন লক্ষ্মী। রাখি পরে বলি লক্ষ্মীর প্রার্থনা জানতে চান। দেবী তখন স্বমূর্তি ধারণ করেন, স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে বলেন। এরপর দৈত্যরাজের প্রাসাদ থেকে আবার বৈকুণ্ঠে ফিরে আসেন বিষ্ণু এবং মা লক্ষ্মী।

পুরাণ, মহাকাব্যের পাতা বেয়ে রাখিবন্ধন নেমে আসে বাস্তবের মাটিতেও। ভারতে রাখিবন্ধনের ইতিহাস প্রায় সকলেরই জানা। পরাধীন ভারতে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ডাক দেয় ব্রিটিশরা। বাংলার এই ভাগ রুখতে রাখিবন্ধনকে হাতিয়ার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলের হাতে বেঁধে দেন হলুদ সুতো। জাতি-ধর্ম ব্যতিরেকে বাংলার মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিল সেদিনের এই রাখিবন্ধন। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গানটিও সেই থেকেই লোকের মুখে মুখে ফেরে আজও।

আরও পড়ুন: বোন নেই, রাখি কে পরাবে! দুজনকে খুঁজে দিল টিন্ডার, আনন্দে ভাসছেন মুম্বইয়ের যুবক