
গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 4 March 2025 15:50
"কোলের ছেলেটি সদর দরজায় দাঁড়িয়ে সারা দিন ধরে দেখছে, ভারে ভারে সওগাত চলেছে, সারে সারে দাসদাসী, থালাগুলি রঙবেরঙের রুমালে ঢাকা। দিন ফুরোল। সওগাত সব চলে গেল। দিনের শেষনৈবেদ্যের সোনার ডালি নিয়ে সূর্যাস্তের শেষ আভা নক্ষত্রলোকের পথে নিরুদ্দেশ হল। ছেলে ঘরে ফিরে এসে মাকে বললে, 'মা, সবাইকে তুই সওগাত দিলি, কেবল আমাকে না।' মা হেসে বললেন, 'সবাইকে সব দেওয়া হয়ে গেছে, এখন তোর জন্যে কী বাকি রইল এই দেখ।' এই বলে তার কপালে চুম্বন করলেন। ছেলে কাঁদোকাঁদো সুরে বললে, 'সওগাত পাব না?' 'যখন দূরে যাবি তখন সওগাত পাবি।' 'আর, যখন কাছে থাকি তখন তোর হাতের জিনিস দিবি নে?' মা তাকে দু'হাত বাড়িয়ে কোলে নিলেন; বললেন, 'এই তো আমার হাতের জিনিস।"
বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানকে বড় করতে নিজের সবটুকু উজাড় করে চেষ্টা করেন। তাকে বাঁচাতে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দেন। এটাই যেন সমাজের স্বাভাবিক চিত্র, স্বাভাবিক ভাবনাও। হয়তো প্রত্যাশাও। মা-বাবা করবে না তো কে করবে!
কিন্তু উল্টোটাও ঘটে। বেশ চরম ভাবেই ঘটে। সেক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার মিল খুঁজে পাওয়া যায় বই কি। ‘চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে’... কথা ও কাহিনি-তে ‘দেবতার গ্রাস’ পড়ে চোখে জল আসেনি, এমন মানুষ কমই আছেন। যদিও এতে মিশে ছিল সংস্কার আর কুসংস্কারের সংকট।
তবে তারও আগে, সেই কবে, সদ্যোজাতকে জলে ভাসিয়ে বরাবরের মতো কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক মা, কুন্তী। আধুনিক যুগেও সে ধারা প্রবাহিক হয়েছে। এ শহর দেখেছে শিনা বোরা, আরুষিদের হত্যাকাণ্ড।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আবারও সে সব শিউরে ওঠা কাহিনি মনে করিয়ে দিচ্ছে। প্রথমে ট্যাংরা। স্ত্রী, মেয়ে ও বৌদিকে খুন করে গ্রেফতার হয়েছেন প্রসূন দে। এরই পিঠোপিঠি ঘটনা ঘটে বেহালার শকুন্তলা পার্কে। স্থানীয় একটি দোকান থেকে উদ্ধার হয় বাবা-মেয়ের ঝুলন্ত দেহ। মেয়ে অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন বলেই নাকি দু'জনে চরম সিদ্ধান্ত বেছে নিয়েছিলেন। এরপর মধ্যমগ্রাম। বন্ধ ঘর থেকে উদ্ধার হয় মা-মেয়ের মৃতদেহ। ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করেন তদন্তকারীরা। যেখানে লেখা ছিল 'মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়'।
এর পরে আজ, মঙ্গলবার, আবারও চমকে দেওয়া এমনই এক খবর সামনে এসেছে। কসবার হালতুর একটি বাড়ি থেকে স্বামী, স্ত্রী এবং তাঁদের আড়াই বছরের ছেলের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে।
পরপর এমন মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে, নিজের মাথার ওপরের ছাদটা বাঁচাতে, নিজের দু’বেলার অন্ন সংস্থান করতে কোনও মা-বাবা কি সন্তানের জন্য এত দূর নিষ্ঠুর হতে পারেন? নিজের রক্ত দিয়ে গড়া ছোট্ট প্রাণটার বাঁচা-মরা নিয়ে এমন নিস্পৃহ থাকতে পারেন? না কি এটা গভীর কোনও মানসিক অসুখ?
সবটা জানতেই দ্য ওয়াল যোগাযোগ করেছিল বিশিষ্ট সাইকোলজিস্ট ডক্টর প্রশান্ত রায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, এটা সবসময়ই দেখা যাচ্ছে যে কোথাও কোনও ঘটনা ঘটলে সেটা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মিডিয়া কভারেজ হয়। তখন এই ধরনের ঘটপ্নার পুনরাবৃত্তি হয়। তিনি মনে করিয়ে দেন, এর আগে যখন কোনও সেলিব্রিটি আত্মহত্যা করেছেন, তখনই তার পরপর বেশ কয়েকজন সেলিব্রিটি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
প্রশান্তবাবুর কথায়, ‘এখন একই ভাবে পরিবারে প্রিয়জনদের আত্মহত্যা বা মেরে ফেলার ঘটনা ঘটতেই পরপর একই ধরনের খবর সামনে আসছে। এটাকে আমরা কন্ট্রারিয়ান ফ্যাক্টর বলি। ঠিক যেমন মেট্রোয় কেউ আত্মহত্যা করেন, তখন পরপর ঝাঁপ দিয়ে আত্মহননের ঘটনা সামনে আসে। এটা গোটা বিশ্বে কমন। এর থেকে প্রমাণ হয় না যে সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়ের ভালবাসা কমে যাচ্ছে। অনেক ফ্যাক্টর থাকতে পারে এর পেছনে।’
ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রি-র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক আরও বলেন, ‘হয়তো বাড়িতে কেউ মানসিক অবসাদে ভুগছেন বা বাচ্চা হওয়ার পর অনেক মহিলাদের মধ্যে বিশেষত পোস্টপার্টাম ফেজ দেখা যায়। আর অত্যন্ত ভয়াবহ হল, খবরের শিরোনামও দায়ী থাকেই। ধরা যাক, কোনও হেডলাইনে ঝুলে পড়ে মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া থাকে। এই হেডিংগুলো মানুষকে প্রচণ্ডভাবে আকর্ষণ করে। যে কারণে সংবাদমাধ্যমও পরোক্ষভাবে দায়ী হয়ে যাচ্ছে।’
খোলসা করে ডক্টর রায় জানান, ছেলে-মেয়ের প্রতি বাবা-মায়ের স্নেহ বা ভালবাসা কমে যাওয়ার মতো কোনও বিষয় এই সব কারণের পিছনে দায়ী নয়। বরং এই বাবা-মায়েরা আরও অনেক বেশি অসহায় পরিস্থিতিতে থাকেন। অবসাদে থাকেন। এসব কারণই বারবার এহেন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।
বস্তুত, সমাজের চাপ, আর্থিক টানাপড়েন, মানসিক অবসাদ— এসবের ভারেই যেন গুঁড়িয়ে যাচ্ছেন এই সব বাবা-মায়েরা। হয়তো সন্তানকে রক্ষা করার, আগলে রাখার অক্ষমতাই তাঁদের এমন এক গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে মৃত্যুই একমাত্র মুক্তির পথ হয়ে উঠছে!
তাই সন্তানকে সবচেয়ে বড় সওগাত হিসেবে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কপালে চুম্বন এঁকে দেওয়ার ছবিটিকে দুমড়ে দিয়ে আমাদের এমন এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে বাস্তব পরিস্থিতি, যেখানে মা-বাবা তাঁদের সবচেয়ে প্রিয় সত্তাকে সঙ্গী করে নিয়েই মৃত্যুর দিকে পা বাড়াচ্ছেন।
প্রশ্ন ওঠে, এইসব গল্পের কি তবে এমনটাই ভবিতব্য? নাকি কোথাও একটা আশার আলো আছে, যেখানে এই সব অসহায় বাবা-মায়েদের লড়াই আর একটু বেশি সহমর্মিতা পাবে? তাঁদের মানসিক বিপর্যয়ের পথে নজর থাকবে আপনজনেদের? এই অন্ধকার গহ্বরের তলিয়ে যাওয়ার আগে তাঁদের টেনে তুলে আনা যাবে?
প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি, যাতে আর কোনও নিষ্পাপ, নিরপরাধ শিশুকে এভাবে শেষ হয়ে যেতে না হয় মা-বাবার সঙ্গে।