
শেষ আপডেট: 1 December 2023 16:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মহামারী বা অতি মহামারী নতুন নয়। সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যাবে এমন মহামারী সেই সুপ্রাচীনকালেও এসেছিল। মৃত্যু হয়েছিল হাজারে হাজারে। এর আগেও বহু বার হানা দিয়েছে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার মতো আণুবীক্ষণিক শত্রু। পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে সেই সব রোগ। কিছু দিনের জন্য হারিয়ে গিয়ে ফের তারা ফিরে এসেছে ভয়াল চেহারায়। সম্প্রতি গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই নানা মহামারীর উৎসের কারণ। ৪৫০০ বছরের পুরনো কঙ্কালের দাঁত-হাড় থেকে বেরিয়েছে ভাইরাসের ফসিল। এইসব ভাইরাস শুধু প্রাচীনকালে নয়, পরবর্তী নানা সময়েও মহামারীর কারণ হয়ে উঠেছে।
আক্ষরিক অর্থেই মহামারী নিয়ে বহু যুগ ধরে ‘ঘর করছে’ মানুষ। সেই সংক্রান্ত নানা তথ্য তুলে আনছে প্যালিওজিনোমিক্স। কার্যত বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞানের এই অধ্যায়। ব্রোঞ্জ যুগের প্রাচীন মানবের কঙ্কাল পরীক্ষা করে তাজ্জব হয়ে গেছেন বিজ্ঞানী ও জীবাশ্মবিদরা। তাঁরা দেখেছেন, সুপ্রাচীন সেই কঙ্কালের দাঁতে আটকে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের ফসিল। কঙ্কালের হাড় থেকেও পাওয়া গেছে ভাইরাল স্ট্রেন। এই হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (এইচবিভি) একসময় ইউরোপ ও এশিয়ায় ভয়ঙ্কর মহামারী ঘটিয়েছিল। এইচবিভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গিয়েছিল ৮ লাখের বেশি মানুষের।
সম্প্রতি নিউ মেক্সিকোর অনেক পুরনো হাসপাতাল এবং গির্জার নিচে সমাহিত অনেকগুলি কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এইসব মানুষরা ভয়ঙ্কর কোনও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তারপর তাদের কবর দেওয়া হয়। কঙ্কালগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা করে জানা গেছে, আক্রান্তরা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস এবং হিউম্যান বি ১৯ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিল। এই দুই ভাইরাসই প্রাণীর থেকে ছড়ায়। গবেষকরা আরও দেখেছেন- ইউরোপ থেকে নয়, বরং ভাইরাসগুলো সম্ভবত আফ্রিকা থেকে এসেছিল। ন্যাসিওনাল অটোনোমা ডি মেক্সিকোর ইন্টারন্যাশনাল ল্যাবরেটরি ফর হিউম্যান জিনোমের বিজ্ঞানী অধ্যাপক মারিয়া সি আভিলা আরকোস বলেছেন, ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা একসময় আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার আদিবাসীকে ক্রীতদাস বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। জাহাজে ঠাসাঠাসি করে পশুদের মতো নিয়ে যাওয়া হত তাদের। আফ্রিকার সেই আদিবাসীদের থেকেই নানা সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ ও আমেরিকায়। যেখান থেকে এশিয়ার নানা দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকায় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল বিউবনিক প্লেগ। মৃত্যু হয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ব্ল্যাক ডেথ। ইউরোপের মোট জনসংখ্যার ৩০-৬০ ভাগ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এই মহামারীর কবলে পড়ে ১৪’শ শতাব্দীতে বিশ্বের জনসংখ্যা ৪৫০ মিলিয়ন থেকে ৪০০ মিলিয়নে নেমে আসে। মধ্য এশিয়ার সমভূমিতে এই রোগের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। এরপর এটি সিল্ক রুট হয়ে ১৩৪৩ সালের দিকে ক্রিমিয়া অবধি ছড়িয়ে পড়ে। বণিকদের জাহাজে ইঁদুর থেকে রোগ ভূমধ্যসাগর এবং ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়।
জার্মানির বিজ্ঞানীরা ১২৪৮ থেকে ১৩৮০ অব্দের মধ্য়ে কবর দেওয়া মানুষজনের কঙ্কাল খুঁজে বের করেন। ১১৮টি কবর খুঁড়ে প্লেগে মৃত রোগীদের কঙ্কাল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্য়াকটেরিয়ার ডিএনএ পাওয়া গেছে সেই নমুনায় (Bubonic plague)। এই ব্যাকটেরিয়াদের একদম আদিম প্রজাতির খোঁজ মিলেছে যাদের থেকে মহামারী তৈরি হয়েছে। ব্যাকটেরিয়ার সেই অরিজিনের জিনোম সিকুয়েন্স বা জিনের বিন্যাস বের করছেন বিজ্ঞানীরা। এই গবেষণা সফল হলে, আরও অনেক মহামারী রুখে দেওয়া যাবে বলেই দাবি বিজ্ঞানীদের।