সকাল, দুপুর কিংবা রাত - পড়াশোনাকে ফাঁকি দিয়ে টিভির সামনে বসে থাকা, এমটিভির গান শোনা, সেই যুগের টিনেজারদের কাছে ছিল এক রোমাঞ্চ।

গ্রাফিক্স - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 18 October 2025 18:43
'ভুলে যেও আমাকে... কী আমার নাম, কে ছিলাম...'
৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫। তারিখটা যেন ক্যালেন্ডারে শুধু একটি দিন নয়, বরং এক প্রজন্মের শৈশবের জানালা বন্ধ হওয়ার দিন। ঘোষণা হয়েছে, এমটিভির জনপ্রিয় মিউজিক (MTV Music Channel) চ্যানেলগুলি বন্ধ হতে চলেছে। যাঁরা নাইন্টিজ কিড (90's Kid), তাঁদের কাছে এই খবর নিছক এক সম্প্রচার বন্ধের নয়, বরং নিজের বেড়ে ওঠার একটা অংশ হারানোর মতো। কারণ এমটিভি ছিল তাঁদের প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধু, সেই রঙিন পৃথিবী, যেখানে বিদ্রোহ মানে ছিল সঙ্গীতের ছন্দে নিজেকে চিনে নেওয়া।
১৯৮০ আর ৯০-এর দশকে জন্মানো ছেলেমেয়েদের কাছে এমটিভি ছিল কেবল একটি টিভি চ্যানেল (TV Channel) নয় - একটা জানালা, যেখান দিয়ে তারা প্রথমবার বাইরের বিশ্বের স্রোত টের পেয়েছিল। তখন ভারতীয় টেলিভিশনের মানে ছিল দূরদর্শনের (Doordarshan) গাম্ভীর্য। সেই নিরস সময়ের মাঝেই এমটিভি ঢেলে দিয়েছিল রঙ, শব্দ, আর এক নতুন বিদ্রোহের বীজ।
সকাল, দুপুর কিংবা রাত - পড়াশোনাকে ফাঁকি দিয়ে টিভির সামনে বসে থাকা, এমটিভির গান শোনা, সেই যুগের টিনেজারদের (Teenagers) কাছে ছিল এক রোমাঞ্চ। অনেকের পরিবারের চোখে সেটা ছিল ‘অপরাধ’, কারণ সেই চ্যানেলের মাধ্যমেই প্রথম পরিচয় হয়েছিল মাইকেল জ্যাকসন, মাডোনা, নিরভানা, ব্রিটনি স্পিয়ার্স, লেডি গাগার মতো এমন সব তারকার সঙ্গে, যাঁরা প্রথা, নিয়ম, বারণ সব ভেঙে দেখিয়েছিলেন অন্য এক জীবনদৃষ্টি।
তাদের নাচ, ফ্যাশন, অ্যাটিটিউড - সব মিলিয়ে এমটিভি খুলে দিয়েছিল এক নতুন পৃথিবী। স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে প্রতিদিনের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠত, “আজ কোন গানটা বাজবে?”, “কে কাকে অনুকরণ করছে?” - এই ছিল প্রতিদিনের রীতি।
১৯৯৬ সালে এমটিভি ইন্ডিয়া (MTV India) শুরু হলে সেটা আর শুধু পাশ্চাত্যের অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হয়ে উঠেছিল ভারতীয় তরুণদের নিজেদের কণ্ঠস্বর। সাইরাস ব্রোচা, নিখিল চিনাপ্পা, রঘু-রাজীব - এই ভিডিও জকিরা তখন হয়ে উঠেছিলেন যুবপ্রজন্মের মুখপাত্র। একই সময়ে দেশ প্রথম পেয়েছিল ইউফোরিয়া, কলোনিয়াল কাজিনস, পারিক্রমার মতো ভারতীয় ব্যান্ড যাদের গান সমানভাবে বাজত আন্তর্জাতিক তারকাদের পাশে।
শুধু গান নয়, এমটিভি দিয়েই ভারত চিনেছিল রিয়্যালিটি শোয়ের আসল স্বাদ। ‘রোডিস’, ‘স্পিল্টসভিলা’, ‘বাকরা’, ‘আনপ্লাগড’, ‘গার্লস নাইট আউট’ - এই নামগুলি সেই সময় তরুণ প্রজন্মের (Millennials) কথায় ঘুরে বেড়াত। এমটিভি ছিল শুধু বিনোদন নয়, নতুনকে আপন করে নেওয়ার এক জীবন্ত প্রতীক।
কিন্তু সময় বদলায়, মাধ্যমও বদলায়। ইউটিউব, স্পটিফাই আর শর্ট ভিডিওর দুনিয়ায় এখন কোনও গান খুঁজে নেওয়া এক ক্লিকের ব্যাপার। তাই ‘প্রিয় গানটা কবে বাজবে’ - এই অপেক্ষার রোমাঞ্চ আজ হারিয়ে গেছে।
তবুও ভারতের এক প্রজন্মের কাছে এমটিভি কেবল এক চ্যানেল নয় - পরিচয়, স্বাধীনতা, প্রতিবাদের প্রতীক। হয়তো Gen Z বা Alpha প্রজন্মের কাছে এমটিভি শুধু একটি মিউজিক ব্র্যান্ড হয়ে থাকবে, কিন্তু যারা একদিন টিভির পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে সেই সুরে নিজেদের খুঁজে পেয়েছিল, তাঁদের কাছে এমটিভি আজও জীবন্ত ইতিহাস। যে হয়তো খুব আদর করে গেয়ে চলেছে -
'আর একবার যদি তোমার দলে নাও খেলায়... বন্ধু তোমায়, এ গান শোনাব বিকেলবেলায়...'