
সুব্রত নাথ ও তাঁর বাগান
শেষ আপডেট: 5 June 2024 18:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কতরকম কেনাকাটার নেশাই না থাকে মানুষের। কেউ কেবলই পোশাকআশাক কিনতে ভালবাসেন, কারও বা শখ নতুন নতুন ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের। ওড়িশার বাসিন্দা, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, সুব্রত নাথের কেনাকাটার নেশাটা খানিক বিচিত্র। তাঁর কাছে শপিং মানেই নতুন নতুন নার্সারিতে ছোটা, বিভিন্ন গাছেদের দেখা এবং পছন্দমতো কিনে নিয়ে আসা নিজের বাগানের জন্য। এই কাজে তাঁর উৎসাহের অন্ত নেই। এমনই এক 'শপিং'-এ গিয়ে এক ফুলচাষি তাঁকে একটি চারাগাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমগাছের চারা। তবে যে-সে আম নয়, সেটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দামী আম-- মিয়াজাকি!
জাপানের মিয়াজাকি শহরে উৎপন্ন হওয়া এই আম নিয়ে এ দেশেও চর্চা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। দেশের খুব কম কয়েকটি জায়গাতেই ফলন হয় এই আমের। লালচে বেগুনি রঙের পুরুষ্টু এই আম বিখ্যাত আলফোনসো বা অন্যান্য উঁচু জাতের আমের তুলনায় তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি মিষ্টি, রসালো এবং বড়।

সুব্রত বলেন, "আমি নার্সরিতে এই আমের চেহারা দেখেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমটি দেখতে অনেকটা বড়সড় ডিমের মতো, তাই এটি ‘সূর্যের ডিম’ নামেও পরিচিত। দু'বছর পরিচর্যার পরে সেই চারা এখন ন'ফুট লম্বা গাছে পরিণত হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম ফলও ধরেছে। আমি যে কী খুশি, কী বলব। সব মিলিয়ে আটটা আম, এবার তোলার সময় হয়েছে। এবার আমি বিক্রি করেই আমি লাখপতি হয়ে যাব!"
সুব্রত হাসতে হাসতে এ কথা বললেও, মোটেই তা মিথ্যে নয়। কারণ তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এই মিয়াজাকি আম বিক্রি হয় কেজি প্রতি আড়াই লাখ টাকায়!
এই অত্যধিক দামের কারণ হল, মূলত এই আমের ঔষধি গুণাবলি। গবেষণায় জানা গেছে, এই মিয়াজাকি আম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা শ্রেণির অন্তর্গত। এটি ক্যানসার রোধ করে, প্রদাহ কমায়, সংক্রমণ সারায়। এটিতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ইমিউনোমোডুলেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিয়মিত এই আম খেলে স্তন ক্যানসার সারতেও পারে বলে জানা গেছে।
তবে মজা করে লাখপতি হওয়ার কথা বললেও, সুব্রত আদতে বিক্রি করতে চান না তাঁর শখের গাছের আম। কারণ বিক্রির জন্য তিনি বাগান করেন না। তা করলে আরও অনেক কিছুই বিক্রি করতে পারতেন এতদিনে। কারণ শ'চারেক গাছ নিয়ে ভরে ওঠা তাঁর বাগানে এমন অনেক বিরল ও দুর্লভ গাছই রয়েছে। যেমন হাজার পাপড়ির পদ্ম, সাতরঙা আখগাছ বা হাইড্রেঞ্জার মতো বিরল সব উদ্ভিদ।
বছরের পর বছর ধরে সুব্রত চর্চা করেছেন এইসব বিরল ফুল ও ফল নিয়ে। ওড়িশার উষ্ণ জলবায়ুতে কীভাবে কী কী বিরল গাছের জন্ম দেওয়া যায়, তা নিয়ে রীতিমতো পড়াশোনা করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমি বাগানে বিরল গাছপালা রাখতে পছন্দ করি। এটা আমার কাছে দারুণ এক চ্যালেঞ্জ। গ্রীষ্মকালে এখানে তাপমাত্রা বেড়ে ৪৬ ডিগ্রিও হয়ে যায়, তখন এই চ্যালেঞ্জ খুব কঠিন হয়ে পড়ে। যে কোনও বিরল উদ্ভিদ জন্মানোর জন্যই তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং পাত্রের আকার খুব জরুরি। এই নিয়ে বিশদে পড়াশোনা করা দরকার, আমি সময় পেলেই পড়ি। এভাবেই আমি মাত্র চার ফুট চওড়া এবং দু'ফুট গভীরতার একটি পাত্রে হাজার পাপড়ির পদ্ম ফুটিয়েছি।"

মিয়াজাকি আম গাছের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “এই গাছটি আমি সরাসরি মাটিতেই পুঁতেছি। আড়াই হাজার টাকা দিয়ে চারা কেনার পরে আমি কোনও ঝুঁকি নিতে চাইনি। পোঁতার দু'মাস পরে আমি গাছের গোড়া গোবর, হাড়ের গুঁড়ো, সর্ষের খোল-- এসব সার দিয়েছি। আমি কোনও রাসায়নিক ব্যবহার করি না। প্রাকৃতিক সারই যথেষ্ট।"
সুব্রতর এই বাগানের নেশা ছোটবেলা থেকেই। তাঁর বাবা-মায়ের ফল এবং শাকসবজির বাগান ছিল। সেখানে রোজ তিনি সব গাছে জল দিতেন। ৪৩ বছর বয়সি সুব্রত বলেন, “আমাদের বাড়িতে সব ধরনের মরশুমি আনাজ ফলত। কড়া রোদ থেকে ফুলকপি বাঁচানোর মতো নানা সব দায়িত্ব পালন করেছি আমরা ছোটবেলায়। আমরাও খবরের কাগজ কেটে কেটে টুপি বানিয়ে কপি বাঁচাতাম। এসব আমাদের বড় প্রিয় কাজ ছিল।"

পরবর্তীকালে, সুব্রত ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করতে শুরু করলেও, বাগান করার শখ তাঁর বাড়তেই থাকে। তাই তিনি চাকরির পাশাপাশি, ১০০ জাতের ওয়াটার লিলি এবং পদ্ম, ১০ ধরনের অর্কিড, ২০ ধরনের অ্যাডেনিয়াম এবং 'সহস্রদলা পদ্মম' অর্থাৎ হাজার পাপড়ির পদ্মফুল ও মিয়াজাকি আম-সহ ১০টি বিরল জাতের গাছপালা নিয়ে নিজের বাগান তৈরি করেন। অবশ্য বাগান বললেও, গাছগুলি আদতে বাড়িতেই হয়েছে। বাড়ির নিচতলার খানিকটা জায়গা এবং বারান্দা ব্যবহার করে, সুব্রত গাছগুলির জন্য চার হাজার স্কোয়ারফুটের একটি জায়গা তৈরি করেছেন।

তবে এই বাগানের পিছনে সুব্রতর পরিশ্রম কম নয়। তিনি বলেন, "আমি রোজই নিজের ঘুমের সময় বিসর্জন দিয়ে অনেক ভোরে উঠে পড়ি। কয়েক ঘণ্টা গাছপালা দেখাশোনা করে আটটার সময়ে অফিস বেরোই। কিছু করতে চাইলে তো তা নিয়ে পরিশ্রম করতেই হবে, প্যাশন থাকতেই হবে। আমি রোজ সন্ধেয় বাড়ি ফিরে সেই ছোটবেলার মতোই গাছে জল দিই। আমি আমার ভিতরের শিশুকে এইভাবেই বাঁচিয়ে রেখেছি। গাছেদের পরিচর্যা করে সেই শিশু ভারী আনন্দে থাকে। আমি হয়তো পেশাদার নই, কিন্তু এই গাছগুলোই আমার একমাত্র সম্পদ।"