
শেষ আপডেট: 31 October 2022 13:51
দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: ভারতে পাওয়া যায় মোট ৪৭০ প্রজাতির উভচর (Amphibians)। এর মধ্যে প্রায় ২৯৭ টি প্রজাতি বাস করে পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় (Western Ghats)। যেগুলি বিশ্বের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই কেরালার উভচর বিশেষজ্ঞ ডঃ সত্যভামা দাস বিজু ও বেলজিয়ামের সরীসৃপ বিশারদ ফ্র্যাঙ্কি বসুইটের কাছে বাঁচার রসদ হল পশ্চিমঘাট পর্বতমালা। এই সুবিশাল পর্বতমালার অরণ্য, ঝরনা ও নদীর ধারে ঘুরে বেড়ান দুই জীববিজ্ঞানী। খুঁজে বেড়ান নতুন কোনও উভচর বা সরীসৃপ প্রজাতি। ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে, সেই উদ্দেশ্যেই দু'জনে গিয়েছিলেন কেরালার ইদ্দুকি এলাকার পাহাড়ি অরণ্যে।

অরণ্যে প্রবেশ করার কয়েক ঘণ্টা পর কানে এসেছিল মুরগির ডাক। আওয়াজটি ভেসে আসছিল ছোট একটি ঝরনার পাশ থেকে। বন মুরগির ছবি তোলার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলেন ডঃ বিজু। শব্দের উৎসের কাছে পৌঁছেই চমকে উঠেছিলেন তিনি। ঝরনার ধারে থাকা আধডোবা একটি পাথরকে আঁকড়ে ধরে বসেছিল, দশাসই চেহারার একটি ব্যাঙ। গায়ের রঙ বেগুনি (Purple frog)। এরকম উদ্ভট চেহারার ব্যাঙ জীবনে দেখেননি ব্যাঙ পাগল জীববিজ্ঞানী ডঃ বিজু।

বিজুর চিৎকার শুনে ছুটে এসেছিলেন বন্ধু ফ্র্যাঙ্কি। পৃথিবীতে এরকম ব্যাঙও (purple frog )যে থাকতে পারে, সেটা তিনি কল্পনাই করতে পারেননি। নতুন এক প্রজাতি আবিষ্কারের আনন্দে দুই বিজ্ঞানী প্রায় নাচতে শুরু করেছিলেন। ব্যাঙটির প্রচুর ছবি তুলে, দুই বিজ্ঞানী ফিরে এসেছিলেন ল্যাবরেটরিতে। তখনও বুঝতে পারেননি, তাঁরা গড়েছেন এক ইতিহাস। আবিষ্কার করেছেন অজানা এক জীবন্ত জীবাশ্ম (Living fossil)। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাস।
রাতারাতি বিশ্ববিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন ডঃ বিজু। তাঁর এই আবিষ্কারকে 'শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার' বলে অভিহিত করেছিলেন জীববিজ্ঞানীরা। ডঃ বিজু ও ডঃ ফ্র্যাঙ্কি মেতে উঠেছিলেন সদ্য আবিষ্কৃত নতুন প্রজাতিটিকে নিয়ে। তাঁরা বিশ্বকে জানিয়েছিলেন বেগুনি ব্যাঙের (purple frog)পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।

লম্বায় বেগুনি ব্যাঙ সাত থেকে আট সেন্টিমিটার। ওজন প্রায় আড়াইশো গ্রাম। ফোলা কিন্তু কচ্ছপের মত চ্যাপ্টা শরীর। ফোলা, চওড়া ও চ্যাপ্টা শরীরের জন্যেই এরা জলে ডুবে থাকা পাথর অক্লেশে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে। এমনকি ক্ষরস্রোতা ঝরনাতেও। এদের সামনের পা শক্তিশালী ও পেশিবহুল। পিছনের পা, অনান্য প্রজাতির ব্যাঙদের তুলনায় ছোট। তাই লাফিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে না। হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে হয় বলে চলতে ফিরতে সময় বেশি লাগে। দেহের তুলনায় বেগুনি ব্যাঙের মাথাটা বেশ ছোট। শুয়োরের মত উঁচু নাক। তবে সবথেকে আকর্ষণীয় হল এদের কালচে বেগুনি ত্বক।

বেগুনি ব্যাঙেরা সাধারণত ঝরনা বা অস্থায়ী জলস্রোতের ধারে বাস করে। শক্তিশালী থাবা দিয়ে নরম মাটিতে কুড়ি ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে, সেই গর্তের মধ্যে বাস করে। জীবনের বেশিরভাগ সময় এরা সেই গর্তেই কাটায়। খাবার খোঁজার জন্যেও বের হয় না। কারণ অত্যন্ত ধূর্ত এই ব্যাঙগুলি, গর্ত খুঁড়ে রাখে উঁইঢিপির নিচে। তাই পুষ্টিকর উঁইপোকা খেয়ে তোফা জীবন কাটায় পাতালে। বেগুনি ব্যাঙের আয়ু প্রায় মানুষের মত। ৭৫ থেকে ১০০ বছর বাঁচে এরা।
বর্ষার শুরুতে মাটির ওপর উঠে আসে বেগুনি ব্যাঙের দল। মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য। গর্ত থেকে বেরিয়ে ঝরনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, অবিকল মুরগির মত কঁক কঁক করে ডাকতে শুরু করে পুরুষ ব্যাঙগুলি। মিলনের তাগিদে ছুটে আসে স্ত্রী ব্যাঙের দল। আকারে স্ত্রী ব্যাঙগুলি পুরুষ ব্যাঙের থেকে তিনগুণ বড়। মিলনের পর স্ত্রী ব্যাঙগুলি প্রায় ৩০০০ ডিম পাড়ে। তৈরি হয় ব্যাঙাচি। জলের স্রোত থেকেই খাবার খুঁজে নেয় তারা। পাথরের ফাঁকে জমা জলে প্রায় ১০০ দিন কাটিয়ে পুর্ণাঙ্গ ব্যাঙে পরিণত হয়ে ব্যাঙাচিগুলি।

ডঃ বিজুর চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের পর, বেগুনি ব্যাঙ নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়েছিলেন বিশ্বের তাবড় তাবড় জীববিজ্ঞানীরা। জানা গিয়েছিল কিছু বিস্ময়কর তথ্য। এই বেগুনি ব্যাঙ প্রজাতি নাকি গন্ডোয়ানাল্যান্ড মতবাদের অন্যতম প্রমাণ। এদের নিকটতম আত্মীয় Sooglossidae প্রজাতির ব্যাঙেরা, বাস করে ভারত মহাসাগরের সেসেলস দ্বীপপুঞ্জে। যদিও তাদের গায়ের রঙ বেগুনি নয়।
বেগুনি ব্যাঙের প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম বিজু ও ফ্র্যাঙ্কি রেখেছিলেন Nasikabatrachus sahyadrensis। নামের Nasikabatrachus অংশটির মধ্যে আছে সংস্কৃত শব্দ নাসিকা ( Nasika) অর্থাৎ নাক। কারণ বেগুনি ব্যাঙের উঁচু নাকই প্রজাতিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এবং ল্যাটিন ভাষায় batrachos শব্দটির অর্থ ব্যাঙ।
নামের সঙ্গে থাকা sahyadrensis শব্দটির মধ্যে আছে সহ্যাদ্রি (Sahyadri ) শব্দটি। যেটি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার স্থানীয় নাম। কারণ সারা বিশ্বে একমাত্র পশ্চিমঘাট পর্বতমালাতেই পাওয়া যায় বেগুনি ব্যাঙ। তবে এখন বেগুনি ব্যাঙ বিশ্ববিখ্যাত 'পার্পল ফ্রগ' ও 'পিগ নোজ ফ্রগ' নামে। মহাবলী নামেও বিখ্যাত কেরালায়। কারণ পুরাণের রাজা মহাবলীর মতই এরা বছরে মাত্র একবার, পাতাল থেকে মাটির ওপরে উঠে আসে।

জীববিজ্ঞানের জগতে শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার করেও ডঃ বিজুর মুখে হাসি নেই। কারণ ২০১৫ সালে জানা গিয়েছিল, পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় বাস করা নাদুকানি, মুলামাত্তম, কুলামাভ আদিবাসীরা এই বেগুনি ব্যাঙের ব্যাঙাচিকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ব্যবহার করে ওষুধ হিসেবেও। বর্ষার শুরুতেই বেগুনি ব্যাঙের ব্যাঙাচি ধরার জন্য আদিবাসীরা নেমে পড়ে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ঝরনাগুলিতে। তাই আশঙ্কাজনক ভাবে কমতে শুরু করেছে বেগুনি ব্যাঙের সংখ্যা।

এছাড়া পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় অরণ্যউচ্ছেদ, নতুন কৃষিজমি তৈরি, মেছো পেঁচা, মেছো মাকড়শা ও সাপের আক্রমণ প্রজাতিটিকে বিপন্ন করে তুলেছে। বেগুনি ব্যাঙগুলিকে পোষ্য হিসেবে বাড়িতে রাখার আবদার শুরু করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ। ফলে বেগুনি ব্যাঙগুলিকে ধরে, চোরাপথে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে পশু পাচারকারীরা। তাই এক নতুন যুদ্ধে নেমেছেন, ১০৫ প্রজাতির ব্যাঙ আবিষ্কার করা ভারতের ফ্রগম্যান ডঃ বিজু। তাঁর লক্ষ্য যেকোনও মূল্যে বেগুনি ব্যাঙের প্রজাতিটিকে অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো।

দিল্লি ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিদ্যার সিনিয়ার প্রফেসর ডঃ বিজু তৈরি করেছেন Lost Amphibians of India (LAI) নামে একটি সংগঠন। সেই সংগঠনে আছেন ভারত ছাড়াও দেশ বিদেশের গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রায় ৬০০ জনের দলটি ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে নতুন উভচর প্রজাতি খোঁজার নেশায় মেতে উঠেছে। ইতিমধ্যেই ৪২ টি অভিযান করে ফেলেছে দলটি। কারণ ডঃ বিজু বলে দিয়েছেন, ভারতে লুকিয়ে আছে প্রায় একশো প্রজাতির উভচর, বিজ্ঞান আজও যাদের খুঁজে পায়নি।
নতুন উভচর প্রজাতি খোঁজার পাশাপাশি, নানা বিপন্ন প্রজাতির উভচরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন ডঃ বিজু। তবে তাঁর প্রধান লক্ষ্য বেগুনি ব্যাঙকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ ডঃ বিজু বলেন,"বেগুনি ব্যাঙ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আজ আমাকে যা দেখছেন সবই এই সুন্দর প্রাণিটির জন্য। এই বেগুনি ব্যাঙকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে নিন। এক অতিসাধারণ মানুষকে দেখতে পাবেন।"
