বর্তমান সময়ে প্রকৃতিকে ধ্বংসের কারণে দিকে দিকে যখন ভূমিকম্প, ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ক্রমেই মানুষের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করছে তখন কেরলের গুরুকুল যেন সারা বিশ্বকে হাতছানি দিয়ে বলছে- ভালভাবে বাঁচতে চাইলে আগে প্রকৃতিকে রক্ষা করো।

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 8 December 2025 18:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাহাড় বেয়ে নেমে আসা নরম কুয়াশা, ভেজা মাটির গন্ধে ম ম করছে বাতাস। চারদিকে শ্যাওলা–ঢাকা পাথর, ঝুলন্ত লতার পাতায় চিকচিক করছে সকালের শিশির। এই নীরব অথচ সম্পূর্ণ জীবন্ত জঙ্গলের মধ্যেই গড়ে উঠেছে এক আশ্চর্য শিক্ষালয়—গুরুকুল বোটানিক্যাল অভয়ারণ্য (Gurukula Botanical Sanctuary)। যেখানে শিক্ষক প্রকৃতি, আর ছাত্র মানুষ। পাঠ্যবই নেই, আছে কচি পাতার কুঁড়ির ভিতর লুকিয়ে থাকা সহস্রাব্দের জ্ঞান (Nature is the teacher here, man is the student)।
কেরলের ওয়ানাড় জেলার বনের গভীরে ১৯৮১ সালে এই গুরুকুলের জন্ম। প্রতিষ্ঠাতা জার্মান পরিবেশরক্ষক ওল্ফগ্যাং থিউরকোফ। তখন এ অঞ্চল চা, আদা আর লেমনগ্রাসের বাণিজ্যিক চাষে ক্ষয়ে যাচ্ছিল। খণ্ডে খণ্ডে কাটা হচ্ছিল প্রাচীন বন। অগণিত উদ্ভিদপ্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছিল চিরতরে। সেই সঙ্কটের মধ্যেই থিউরকোফের স্বপ্ন—বনকে বাঁচানো। কিন্তু বাঁচানো মানে নতুন করে গাছ লাগানো নয়; বরং বাস্তুতন্ত্রকে নিজে থেকে পুনর্জন্ম নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
গুরুকুলের দর্শনে তাই নেই দ্রুত বনায়নের প্রচলিত ছক। এখানে ‘বন তৈরি করা’ হয় না, বনকে নিজের মত করে ফিরে আসতে দেওয়া হয়। মাটির স্বর, আলো–ছায়ার মিশ্রণ, জলপথের প্রাকৃতিক চলন—সবকিছুকে নিজের জায়গায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। তারই ফল, আজ এই অভয়ারণ্যে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে ২,০০০–রও বেশি দেশীয় উদ্ভিদপ্রজাতি। বিরল ফার্ন, মস, লতা, ক্ষুদ্র গুল্ম, নুনোফুল ডেইজি, বিপন্ন অরণ্য–ফুল—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত জিনতত্ত্বের জগৎ।

এখানে বড় গাছ নয়, বরং ক্ষুদ্র উদ্ভিদই বন পুনর্জন্মের আসল নায়ক। কারণ ক্ষুদ্র উদ্ভিদের হাত ধরেই শুরু হয় বনের পুনরুত্থান, তারপর তাতে যোগ হয় নানা স্তরের ঝোপঝাড়, তারপর আসে বৃহৎ বৃক্ষ। বন জন্ম নেয় নিচু থেকে উঁচুতে, ধীরে ধীরে, স্বাভাবিক ছন্দে।

গুরুকুলের আর এক বড় বৈশিষ্ট্য—এখানকার অধিকাংশ দায়িত্ব সামলান স্থানীয় গ্রামের নারী সহায়করা। কারও উচ্চশিক্ষা নেই, কিন্তু বনচেনা, পত্র–ফুলের ভাষা বোঝা, মাটির গন্ধে ঋতুর বদল টের পাওয়া—এই সব জ্ঞানে তাঁরা সিদ্ধহস্ত। তাঁদের কথায়, “আমরা গাছ লাগাই না, আমরা বনের জন্য জায়গা করি।”

এই দর্শনই পালটে দিয়েছে গোটা এলাকা। বন যেমন ফিরেছে, তেমনই ফিরেছে গ্রামের নারীদের আত্মবিশ্বাস। কাজের সুযোগ বেড়েছে, বেড়েছে সামাজিক মর্যাদা। তাঁদের বিশ্বাস, বন আলাদা কোনও সত্তা নয়—এ এক পূর্ণ জগত, যেখানে জল, মাটি, পশুপাখি, মানুষ, গ্রাম ও সংস্কৃতি একে অপরকে ধরে রাখে।
গুরুকুল বোটানিক্যাল স্যাংচুয়ারি তাই শুধু একটি ‘অভয়ারণ্য’ নয়—এ এক জীবন্ত বিশ্ববিদ্যালয়। যার পাঠ, প্রকৃতি যদি শিক্ষক হয়, তবে শেখার শেষ নেই। বর্তমান সময়ে প্রকৃতিকে ধ্বংসের কারণে দিকে দিকে যখন ভূমিকম্প, ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ক্রমেই মানুষের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করছে তখন কেরলের গুরুকুল যেন সারা বিশ্বকে হাতছানি দিয়ে বলছে- ভালভাবে বাঁচতে চাইলে আগে প্রকৃতিকে রক্ষা করো।