জেন জি যখন কর্মক্ষেত্রের মানচিত্র নতুন করে আঁকছে, তখন একটা বিষয় পরিষ্কার - সাফল্য বলতে কত উঁচুতে উঠতে পারলাম তা নয়, বরং জীবনে কতটা বাঁচা যেতে পারে, সেটাই আসল।

শেষ আপডেট: 7 February 2026 19:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দীর্ঘদিন ধরেই ‘অ্যাম্বিশন’ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটা নির্দিষ্ট মানে ছিল - দ্রুত পদোন্নতি, বেশি আয়, বড় টিমের দায়িত্ব, নতুন পোস্ট আর কর্পোরেট সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা (Career trends)। সে এক ইঁদুর দৌড় বললেও কি ভুল হবে? কিন্তু আজকের দিনে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা তরুণ প্রজন্মের কাছে সেই সংজ্ঞাটাই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে (Gen Z anti-ambition)।
বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, জেন জি কর্মীরা চিরাচরিত কেরিয়ার দৌড় (Gen Z career mindset) থেকে সরে আসছেন। এর কারণ কিন্তু আলস্য বা উদ্যমের অভাব নয়, বরং তাঁরা আর এই দৌড়ে কোনও বাস্তব লাভ দেখতে পাচ্ছেন না।
সম্প্রতি একাধিক আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র (Workplace culture) নিয়ে একাধিক সমীক্ষা এই বদলের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্তত প্রচলিত কেরিয়ার ধারণার নিরিখে প্রায় অর্ধেক তরুণ কর্মী আর নিজেদের ‘অ্যাম্বিশাস’ (quiet ambition) বলে ভাবছেন না। বরং অধিকাংশই বলছেন, পদোন্নতি বা কর্নার অফিসের চেয়ে তাঁদের কাছে মানসিক স্থিতি, মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বড় বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৪৭ শতাংশ কর্মী কর্পোরেট সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার আগ্রহই হারিয়েছেন। তাঁরা হায়ারার্কির বদলে বেছে নিচ্ছেন ভারসাম্য ও অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি।
অনেকে কর্পোরেট কর্মীর কাছেই এটা একটা প্রচলিত ধারণা যে, এই সেক্টরে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং উপরে ওঠার তাগিদে বয়স ৩০ পেরোতে না পেরোতেই বার্নআউটের শিকার হয়ে পড়েন অধিকাংশ আইটি কর্মী। তাই যেন জি-র মতে, যদি অ্যাম্বিশনের মানে হয় সারাক্ষণ স্ট্রেসে থাকা, সেটা তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বের বিষয় হতে পারে না। এই মানসিকতাকেই এখন বলা হচ্ছে ‘অ্যান্টি-অ্যাম্বিশন’। তবে এর মানে এই নয় যে তরুণ কর্মীরা কাজের প্রতি উদাসীন। বরং এটি সাফল্যের সংজ্ঞা নিয়ে এক গভীর পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত, বিশেষ করে মহামারির পরের সময়, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি আর ছাঁটাই-প্রবণ অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে।
কী বলছে 'অ্যাম্বিশন'-এর নতুন সংজ্ঞা?
জেন জি কর্মীদের নিয়ে হওয়া একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা জানাচ্ছে, ৫২ শতাংশ তরুণ-তরুণী কেরিয়ার গ্রোথের চেয়ে মানসিক স্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ৪১ শতাংশ স্পষ্টই বলেছেন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও মানসিক নিরাপত্তার জন্য তাঁরা কম বেতনেও রাজি। পোস্ট, সিনিয়রিটি, দীর্ঘ সময় একই সংস্থায় থাকা - এই প্রচলিত সাফল্যের মাপকাঠিগুলো দ্রুত গুরুত্ব হারাচ্ছে।
অ্যাম্বিশনের নতুন মানে হয়ে উঠেছে কাজের বাইরেও নিজের জন্য বেশ খানিকটা সময় বার করতে পারা। কাজ জীবনের একটা অংশ, কিন্তু গোটা জীবন যেন না হয়ে ওঠে। কাজের সময়ের বাইরে কাজ নিয়ে মেতে থাকাকে 'মাথায় উঠতে দেওয়া যাবে না' - এই তাদের স্পষ্ট ধারণা হয়ে উঠেছে।
গ্লোবাল এইচআর সংস্থা র্যান্ডস্টাডের সাম্প্রতিক কর্মক্ষেত্র সংক্রান্ত তথ্যও একই ছবি দেখাচ্ছে। এখনও অর্ধেকের বেশি কর্মী নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলেন ঠিকই, কিন্তু সেই ধরনেও বদল এসেছে - উপরে ওঠার বদলে এখন লক্ষ্য স্বাধীনতা, নমনীয়তা আর কাজের অর্থবোধ খুঁজে পাওয়া।
ভারতে এই বদল সবচেয়ে স্পষ্ট আইটি, মিডিয়া, স্টার্টআপ ও কনসাল্টিং সেক্টরে - যে ক্ষেত্রগুলো একসময় 'হাসল কালচার'কে গৌরবের সঙ্গে তুলে ধরত।
কেন কেরিয়ার দৌড় থেকে সরে আসছেন তরুণ প্রজন্ম?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেন জি প্রজন্মের কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে মূলত তিনটি অভিজ্ঞতা -
১. মহামারির সময়ের মোহভঙ্গ
অনেক তরুণ দেখেছেন, বছরের পর বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেও বাবা-মা বা সিনিয়ররা চাকরি হারাচ্ছেন, বেতন কাটছাঁট হচ্ছে বা ভয়াবহ বার্নআউটে ভুগছেন। বার্তাটা স্পষ্ট, পরিশ্রম করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত, এমনটা নয়।
২. স্থায়ী অর্থনৈতিক উদ্বেগ
ছাঁটাই, অটোমেশন আর লাগামছাড়া জীবনযাত্রার খরচ তরুণদের স্ট্যাটাসের বদলে স্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 'সাইড হাসল', ফ্রিল্যান্সিং বা স্বল্পমেয়াদি চাকরি আজ উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব নয়, বরং নিরাপত্তার বেষ্টনী।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা
আগের প্রজন্মের তুলনায় জেন জি খোলাখুলি কাজের পরিবেশের সঙ্গে অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন ও বার্নআউটের যোগসূত্র নিয়ে কথা বলেন এবং প্রয়োজনে এমন কাজ ছেড়ে দিতেও প্রস্তুত তাঁরা।
‘ড্রিম জব’-এর ধারণা আজ অতীত
একটাই আজীবনের স্বপ্নের চাকরি - এই ধারণাটাও ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। একটি ভারতীয় শিল্প-সমীক্ষা বলছে, জেন জি প্রজন্মের অংশগ্রহণকারীদের পাঁচজনের মধ্যে একজনেরও কম নামী সংস্থায় ধাপে ধাপে উন্নতিকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখেন। বরং অনেকেই চাইছেন এমন কেরিয়ার, যেখানে চাকরির সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েশন, উদ্যোগপতি হওয়া বা ফ্রিল্যান্স কাজ মিলিয়ে সময় বার করে নেওয়া যায়।
এই কারণেই জেন জি কর্মীদের প্রাথমিক কেরিয়ারে গড় চাকরির মেয়াদ মাত্র এক বছরের একটু বেশি - আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক কম। তবে হিউম্যান রিসোর্স বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাকে অধৈর্য বলা ভুল।
“জেন জি এক স্থির হয়ে থাকাকে লয়্যালটি বা আনুগত্য ভাবে না, এটা তাঁদের কাছে ঝুঁকির সমান,” বললেন এক সিনিয়র এইচআর কনসালট্যান্ট। “ওরা আটকে যাওয়ার আগে সরে যেতে চায়।”
অফিসে 'অ্যান্টি-অ্যাম্বিশনে'র চেহারা
বাস্তবে এই মানসিকতা দেখা যাচ্ছে কয়েকটি স্পষ্ট আচরণে -
সতর্ক সংকেত, নাকি সময়মতো জাগরণ?
নিয়োগকর্তাদের কাছে অ্যান্টি-অ্যাম্বিশনের উত্থান এক বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে। পোস্ট, ভবিষ্যতের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি বা ‘গ্রোথের সুযোগ’ - এসব আর তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে না।
তাহলে কোন ভাবনা এগিয়ে নিয়ে চলেছে জেন জি-কে?
স্পষ্ট সীমারেখা। স্বচ্ছ বেতন কাঠামো। ফ্লেক্সিবল গ্রোথের ধরন। আর এমন নেতৃত্ব, যেখানে কাজের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, কাজ দেখানো-কে নয়।
অ্যান্টি-অ্যাম্বিশন মানে কাজকে অস্বীকার করা নয়, বরং এর মানে এমন কোনও কাজকে প্রত্যাখ্যান করা, যা জীবনকে গ্রাস করে কিন্তু বিনিময়ে কিছু পাওয়ার নেই।
জেন জি যখন কর্মক্ষেত্রের মানচিত্র নতুন করে আঁকছে, তখন একটা বিষয় পরিষ্কার - সাফল্য বলতে কত উঁচুতে উঠতে পারলাম তা নয়, বরং জীবনে কতটা বাঁচা যেতে পারে, সেটাই আসল।