
সংগৃহীত ছবি
শেষ আপডেট: 25 December 2024 17:52
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই তেরোর মধ্যে একটি অবশ্যই ক্রিসমাস। দুর্গাপুজোর পরে কালীপুজোকে বা চন্দননগরের দৌলতে জগদ্ধাত্রী পুজোকে দুর্গাপুজো পরবর্তী বড় ফেস্টিভ্যাল বলা হলেও ক্রিসমাস বলে বলে গোল দিতে পারে এই দুই উৎসবকে। বর্ষবরণের সঙ্গে ক্রিসমাস মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এবং বঙ্গবাসী পাঁচ-ছয় দিনের উৎসবে মাতে। কলকাতার পার্কস্ট্রিট বা বো ব্যারাকে মানুষের ঢল সামলাতে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনীও মোতায়েন করা হয়। 'যিশু পুজো'-এ মাতে আম জনতা। অনেককেই বলতে শোনা যায়, কলকাতায় ক্রিসমাসের রমরমা সোশ্যাল মিডিয়ার জমানা থেকেই বেশি হয়েছে। আদতে এই কথাটা ঠিক নয়। কলকাতার দুর্গাপুজোর যেমন শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে, ক্রিসমাসেরও তাই। ইংরেজদের হাত ধরে এই উৎসব বাঙালির মননে প্রবেশ করে এবং সেই থেকে একইভাবে ক্রিসমাস রাজ্যের বিশেষ করে কলকাতার সর্বত্র পালিত হয়।
আজ ২৫ ডিসেম্বর, বড়দিন। ডাউন দ্য মেমোরি লেন দ্য ওয়ালের হাত ধরে।
কলকাতায় প্রথম ক্রিসমাস উৎযাপিত হয় ১৬৬৮ সালে। জোব চার্নক তখন প্রাণের ভয়ে পালাচ্ছিলেন হুগলি ছেড়ে। পিছনে তাড়া করেছেন মোগল সেনা বাহিনী। তাঁর যাওয়ার কথা বালেশ্বরে। যেতে যেতে মাত্র ২৭ মাইল পেরোতেই তাঁর চোখে পড়ল বন জঙ্গলে ঢাকা একটা গ্রাম। ঘরবাড়ি- দোকানপাট নেই। আছে শুধু হাট, নাম সুতানুটি। মোগলদের থেকে পালিয়ে গা ঢাকা দিলেন এই জায়গায়। এক-দু'দিন নয়, টানা দুই মাস থাকলেন। এমন সময় চার্নকের মাথায় আসে, বড়দিনের কথা। সামনেই ছিল বড়দিন। সেই সুতানুটিতে লুকিয়ে থাকার সময় বড়দিন পালন করেন তিনি। সেই কলকাতায় প্রথম বড়দিন পালিত হয়।
প্রায় ২০ বছর কেটে গেছে মাঝে। জোব চার্নক পাকাপাকিভাবে সুতানুটিতে আসলেন ১৬৯০-এ। সুতানুটি, গোবিন্দপুর, কলিকাতা মিলে হল কলকাতা শহর। ধীরে ধীরে বিলেতের লোকজন আসতে শুরু করলেন। ক্রিসমাস পালিত হতে লাগল প্রায় প্রতি বছর শহরের নানা প্রান্তে। দুর্গাপুজোর মতো করেই ক্রিসমাস মহাসমারহে পালিত হওয়া শুরু হল। কলকাতায় যে মারাত্মক গরম ও বৃষ্টির ফলে প্যাচপ্যাচে আবহাওয়া, তারপর ক্রিসমাসের সময় হালকা ঠান্ডা মেমসাহেব বা সাহেবদের মন ভাল করে দিত।
১৮৮১ সালে এলিজা ফে নামে এক মহিলার চিঠি থেকে জানা যায়, দুর্গাপুজো আর বড়দিনের মাঝে মাত্র দুমাস সময় পাওয়া যেত। ফলে পুজোর পরই শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। আজকাল অনেকেই আগেভাগে প্রস্তুতি শুরু হলে আদিখ্যেতা বলে কটাক্ষ করেন। কিন্তু তখনও তাই হত। শহরের ইংরেজটোলা নামে খ্যাত এলাকার প্রায় সমস্ত বাড়ি মেরামত করে চুনকাম করা হত। ফটক আর দরজার দুই পাশে কলাগাছ, ফুলের তোড়া আর মালা দিয়ে সাজানো থাক খানিকতা যিশু পুজোই বটে।
কলকাতার প্রথম আর্চ বিশপ রেজিনাল্ড হেবার ১৮২৩-এ তাঁর এক বিখ্যাত জার্নালে উল্লেখ করেন, সেই সময় ডালহৌসি এবং চৌরঙ্গি অঞ্চলের প্রত্যেক সাহেব বাড়িতেই দেবদারু গাছের ডাল, ফুল লতাপাতা, রুপোলি ও নানা রঙের কাগজের চেন দিয়ে, স্টার ও কোথাও কোথাও আলো দিয়ে সাজানোর রীতি ছিল।
আজকের যেটা ক্রিসমাস পার্টি, বলা যায় তখনও সেটা ছিল। গ্রিটিংস কার্ডের প্রচলন হয় ১৮৬০-এ। কলকাতায় সাহেবরা ওই গ্রিটিংস কার্ড দিয়ে আমন্ত্রণ জানাতেন প্রিয়জনদের। খানিকটা বিজয়ার চিঠির মতো ওই কার্ডে জানাতেন শুভেচ্ছাও।
এখন যেমন পার্ক স্ট্রিট, নিউ মার্কেট বড়দিনের আগে থেকেই সেজে ওঠে, তখনও চিনাবাজারের দোকান আর ইউরোপীয় শপগুলি আলোর মালায় সেজে উঠত। সাহেব-মেমরা ঘোড়ায় টানা গাড়িতে করে বেরোতেন কেনাকাটা করতে। বড়দিনের বড় দোকান ছিল হোয়াইট অ্যাওয়ে লেইডল বা হল অ্যান্ড্যারসনের মত দোকানগুলি।
পার্কস্ট্রিট প্রসঙ্গ উঠলেই ওঠে সেখানকার ক্রিসমাসের বর্তমান অবস্থার কথা। বো ব্যারাক, বিভিন্ন চার্চ, বেকারি তো রয়েছেই কিন্তু কলকাতার ক্রিসমাস মানেই পার্কস্ট্রিটে মানুষের ঢল। তা সে ছবি বা রিল বানানোর জন্যই হোক বা নিখাদ ভিড় চাক্ষুস করার জন্য, পার্কস্ট্রিটে বড়দিন উদযাপনের ইতিহাসও খুব নতুন নয়। এর সঙ্গে কিছু গল্প রয়েছে। এখন যেখানে এত আলো দিয়ে যিশুর জন্মদিন পালন করা হয়, সেখানে একসময় হরিণ চড়ত। সাহেবদের গোরস্থানে যাওয়ার রাস্তা ছিল এটি। পরে হয় বারিয়াল গ্রাউন্ড রোড। ১৭৬০ সাল নাগাদ গর্ভর্নর হেনরির বাসভবন ছিল এখানে। হরিণ খেলত বলে নাম হয়েছিল ডিয়ার পার্ক। মনে করা হয় সেখান থেকেই পার্ক স্ট্রিট হয়েছে পরে।
কলকাতার বড়দিনের একটা বিশেষ ব্যাপার ছিল, যা সারা পৃথিবীতে কোথাও ছিল না। ইংরেজরা তাকে বলত 'ডলি।' হিন্দি শব্দ 'ডালি' থেকে এসেছিল। দুর্গাপুজোতে যেমন ডালা দেওয়া হয়, তেমনই সাহেববাড়ির বেয়ারা ও অন্য কাজের লোকজন বড়দিনে সাহেবদের ডালা পাঠাতেন। তাতে থাকত ফল-মূল, কেক, মিষ্টি, মাছ-মাংস। কথিত ছিল, মনিবদের খুশি করতে, অনুগত্য প্রকাশ করতে এগুলি দেওয়ার রীতি ছিল। ফ্যানি পার্কস এদের কিশমিশ- বকশিশ (ক্রিসমাস বক্সেস) নাম দিয়েছিলেন। এই বকশিশ নিয়ে কর্মচারীদের ডালার মূল্যের অর্থ বা তার থেকে বেশি অর্থ ফেরত দিতে হত।
কলকাতায় বড়দিন বরাবর শুরু হয় আগেরদিন মাঝরাতে গীর্জায় উপাসনা দিয়ে। যারা সারা বছর গীর্জার দিকে পা-ও দিতেন না, সেই সব সাহেবরাও এইদিন প্রার্থনায় উপস্থিত হতেন। বড়দিন উৎসবের আসল আকর্ষণ ছিল পারিবারিক মহাভোজ। সে ভোজের মেনুতে কী না থাকত। যেটা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ছিল তা হল 'বোরস হেড' বা শুয়োরের মাথা। যা রোজমেরি, তেজপাতা, আপেল-সহ অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করা হত। এছাড়াও টার্কি, ডাক রোস্ট, পুডিং, ক্রিসমাস পাই, খেজুর, বাদাম-সহ ড্রাই ফ্রুটস, চকোলেট থাকত।
ভাল রান্না করলে, খাবারের স্বাদ পছন্দ হলে বেয়ারা বা রান্নার লোকজনের জন্য উপহার বরাদ্দ থাকত। জুটত বকশিশ।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন বাড়িতে ক্রিসমাস উদযাপন করলেও একটা সময় গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের একতলার বিরাট হলঘরকে বড়দিনের সন্ধেয় পৃথিবীর সব দেশের পতাকা দিয়ে করে সাজানো হত। নাম দেওয়া হয় 'হল অফ অল নেশনস'। মজুত থাকত নানা খাবার ও পানীয়। সাহেবরা তাঁদের মেমসাহেবদের নিয়ে সেখানে এসে বড়দিন উদযাপন করতে পারতেন।
তবে, বিভিন্ন বই থেকে জানা যায়, পুরনো কলকাতার বড়দিনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভোজ হত বড়লাটের প্রাসাদে। নিমন্ত্রিত থাকতেন বহু মানুষ। উৎসব শুরু হত ব্রেকফাস্ট দিয়ে আর শেষ হত ডিনার সঙ্গে বলড্যান্স দিয়ে।
মাঝে লর্ড কর্নওয়ালিশের সময় এই উৎসব কিছুদিন বন্ধ ছিল কারণ তিনি উদযাপন পছন্দ করতেন না। কিন্তু তিনি এদেশ ছেড়ে চলে গেলে ১৭৭৫-এ ফের শুরু হয়।
ক্রিস্টান ছাড়াও সে যুগের অনেক সম্ভ্রান্ত বাঙালিবাবুরা নিজেদের বাগানবাড়িতে বড়দিন উপলক্ষ্যে খাওয়া-দাওয়া করতেন। লোকজন আসত, আজকের আমাদের কথায় পার্টি যাকে বলে। অপেরা, থিয়েটার, বোটরেস, পিকনিক, ক্রিকেট সব কিছুরই ব্যবস্থা ছিল। আর ছিল ঘোড়দৌড়। সে সময় কেকের সঙ্গে বাঙালি বাড়িগুলিতে পায়েসও রান্না হত।
সময় বদলেছে, পরিস্থিতি পাল্টেছে, শহরে একাধিক পবরিবর্তন এসেছে কিন্তু বড়দিন উদযাপনের চিত্রটা একই থেকে গেছে। আজও বাঙালি বাড়িতে ক্রিসমাস পালিত হয়। মুসলিম মালিকের বেকারিতে ক্রিস্টানরা কেক কিনতে যান। নাহুমসের লাইনে দাঁড়িয়ে গল্পে মাতেন। আসলে উৎসবটাই সব, বাকিটা বাঙালিয়ানা। এখানে ধর্ম মিলিয়ে যায় উদযাপনের আলোয়।