
শেষ আপডেট: 27 September 2022 15:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কত কিছুই ঘটে এই পৃথিবীতে। এই যেমন রোজ দুপুরে গুগলকে (Google) নিয়ে গাছের ঝুরি ধরে পুকুরে ঝাঁপ মারে ফেসবুক (Facebook)। খেলতে খেলতে হাইকোর্টের (High Court) ঘাড়ে উঠে পড়ে 'বাস'। ডলারকে নিয়ে বুনো খেজুর পাড়তে যায় হোটেল। সাইকেলের বাড়িতে রোজ বিকেলে খেলতে আসে ট্রেন। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে রোজ মারপিট করে আমির খান। কংগ্রেস (Congress) আবার গভর্নমেন্টকে ফাঁকি দিয়ে একা একাই চলে যায় মাছ ধরতে। ভাবছেন এ আবার কী আবোল তাবোল কথা! কিন্তু কথাগুলো একশো শতাংশ সত্যি।

বেঙ্গালুরু (Bengaluru) শহর থেকে বেঙ্গালুরু-মহীশুর হাইওয়ে ধরে মিনিট কুড়ি গেলেই, এগিয়ে আসবে পাহাড় ও অরণ্য ঘেরা ভদ্রপুর (Bhadrapur) গ্রাম। মাটির রাস্তা ধরে গ্রামে পৌঁছানোর পর, মাথা ভন ভন করতে থাকবে আপনার। কানে ভেসে আসবে অতি পরিচিত বেশ কিছু শব্দ। যেগুলো এই হতদরিদ্র গ্রামে অত্যন্ত বেমানান ঠেকবে। হয়ত কোনও মহিলা রাগত কণ্ঠে চিল চিৎকার করে বলে চলেছেন "কোথায় তুই ক্যালকাটা, আয় আজ বাড়িতে"। মাঠের মাঝখান দিয়ে ছুটতে থাকা এক বালিকাকে কচিকাঁচার দল হাতছানি দিয়ে ডেকে চলেছে, "এই সোনিয়া গান্ধী, শোন একবার।" কোনও কিশোরের নাম জিজ্ঞেস করলে অম্লানবদনে সে তার নাম বলছে অমিতাভ বচ্চন (Amitabh Bachchan)।

আপনার মনে হবে গ্রামটি বুঝি কোনও উন্মুক্ত পাগলা গারদ। কিন্তু তা নয়। এই ভদ্রপুর গ্রামে শিশুদের নাম রাখা হয় বিভিন্ন নামবাচক বিশেষ্য দিয়ে। সেগুলি হতে পারে কোনও বিখ্যাত জায়গা, সরকারি অফিস, যানবাহন কিংবা কোনও খাবার। হতে পারে কোনও সেলিব্রেটি, রাজনৈতিক দল বা বিখ্যাত সোশ্যাল মিডিয়া। সোজা কথায় সন্তান জন্ম নেওয়ার পর যে নাম মনে আসে, সেটাই হয় সন্তানের নাম। তাই তো একসাথে গ্রাম দাপায় গুগল, ফেসবুক, ইংলিশ, কফি, বাস, ট্রেন, মিলিটারি, হোটেল, ডলার, ব্রিটিশ, মাইশোর পাক, হাইকোর্ট, পিস্তল, সাইকেল রানি, গভর্নমেন্ট, ক্যালকাটা, সোনিয়া গান্ধী, অনিল কাপুর, অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, আমির খানেরা।
ভদ্রপুর গ্রামের টালির ছাদ দেওয়া বাড়িগুলিতে বাস করে 'হাক্কি পিক্কি' আদিবাসী সম্প্রদায়ের ১৪০টি পরিবার। কন্নড় ভাষায় 'হাক্কি পিক্কি' শব্দের অর্থ 'পাখি শিকারি'। গুজরাথিওয়া, কালিওয়ালা, মেওয়ারা, পানওয়ারা, এই চারটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত এই সম্প্রদায়। হাম্পি বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ট্রাইবাল স্টাডি' বিভাগের গবেষণার মাধ্যমে জানা গিয়েছে, 'হাক্কি পিক্কি' সম্প্রদায়ের মানুষদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন রাজপুত। রাণা প্রতাপের সেনাবাহিনীর যোদ্ধা। তাঁদের পদবী ছিল সিংহ।

মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর 'হাক্কি পিক্কি' সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষেরা আশ্রয় নিয়েছিলেন দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অরণ্যে। যাযাবরের মত ঘুরে বেড়াতেন অরণ্যের এদিক থেকে সেদিক। খিদের জ্বালায় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন শিকার ও মাছ ধরার মত আদিম পেশা। কিন্তু কয়েক শতাব্দী ধরে অরণ্যের অন্ধকারে নিশ্চিন্তে অজ্ঞাতবাস কাটানোর পর অরণ্যের অধিকার হারিয়েছিলেন তাঁরা।
স্বাধীনতার পর, বন দফতরের আইনে শিকার নিষিদ্ধ হওয়ায়, আরণ্যক পরিবেশ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল সম্প্রদায়টিকে। সরকারের তরফ থেকে অরণ্যের কিনারায় দেওয়া হয়েছিল বসবাসের জমি। প্লাস্টিক ও কাপড় দিয়ে মালা ও বাড়ি সাজানোর শৌখিন সরঞ্জাম তৈরি করাই পেশা 'হাক্কি পিক্কি 'সম্প্রদায়ের বর্তমান পেশা। হস্তশিল্পগুলি গ্রামবাসীরা বিক্রি করেন দীপাবলির সময় ও রমজান মাসে। হস্তশিল্পগুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন মেলাতেও।

অরণ্যের বাইরে আসার পর, আসল পরিচয় গোপন রাখার তাগিদেই 'হাক্কি পিক্কি' সম্প্রদায়ের মানুষেরা সন্তানদের অদ্ভুত নামগুলি রাখতে শুরু করেছিল। সাতচল্লিশ বছরের গ্রাম প্রধান 'হাইকোর্ট' জন্মেছিলেন হাইকোর্টের পাশে ফেলা তাঁবুতে। তাই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল হাইকোর্ট। হাইকোর্টের দাদুর নাম ছিল ব্রিটিশ। কারণ তিনি জন্মেছিলেন ব্রিটিশ আমলে। মিষ্টি কিশোরী মাইশোর পাকের বাবা মা, মাইশোর পাক (দিলখুশ) খেতে ভালোবাসেন। তাই তাঁরা মেয়ের নাম রেখেছেন মাইশোর পাক। হাসিখুশি যুবক মিলিটারি আবার বাহুবলী সিনেমা দেখে অভিভূত হয়ে ছেলের নাম রেখেছেন বাহুবলী।
সবচেয়ে অবাক করার মত ঘটনা, এই ভদ্রপুর গ্রামের সব অদ্ভুত নামগুলি সরকারের মান্যতাও পেয়েছে। কারণ নামগুলি উঠে গিয়েছে আধার কার্ড, সাবালক হলে ভোটার কার্ডেও। ভোটের বুথে নাম ডাকতে গিয়ে প্রতিবারই তাই চমকে ওঠেন ভোট নিতে আসা অফিসারেরা। কারণ ভোট দিতে এসেছেন 'পিস্তল'।
